সিলেট ৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:০৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৩০, ২০২৬
“আমি তোমার মতের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারি; কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকারের জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি।”– ভলতেয়ার
ভলতেয়ারের যে উক্তি আজকের এই ঘুনে ধরা পঁচা-গলা সমাজেও সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
কিংবদন্তি ফরাসী সাহিত্যিক ও মহান দার্শনিক ভলতেয়ারের ২৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
পুরো নাম ফ্রঁসোয়া-মারি আরুয়ে। যিনি ভলতেয়ার নামেই বেশি পরিচিত। তাঁকে বলা হয়, ফরাসি আলোকময় যুগের একজন মহাকবি ও লেখক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক। খ্রিস্টান ধর্মের (বিশেষ করে রোমান ক্যাথোলিক চার্চের) বিভিন্ন বিষয়ের কঠোর সমালোচনা করায় সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। দার্শনিক মতবাদ, সৃজনশীল সাহিত্যিক কাজের মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক রাখার পক্ষে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
১৬৯৪ সালের ২১ নভেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ভলতেয়ারের জন্ম। চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বকালে তার পরিবার রাজনৈতিকভাবে অনেক সুবিধা পেয়েছিল।
দুর্ভাগ্যক্রমে তার বয়স যখন মাত্র সাত বছর, তখনই তার মা মারা যান। এই ঘটনাটি বাবা ও বড় ভাই-বোনদের প্রতি তাকে বিদ্রোহী করে তোলে। পরিণামে বিদ্রোহী এই বালকটি আশ্রয় পায় ধর্মপিতা অ্যাবের কাছে, যিনি নিজেও একজন মুক্ত-চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত।
লেখাপড়া শেষ করার পর তিনি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্বপ্ন ছিল একজন নাট্যকার হবেন, কিন্তু তার ধর্মপিতা বিরোধিতা করেন এবং একজন সরকারী কর্মকর্তা হতে চাপ দেন। তাই ধর্মপিতার ইচ্ছে অনুযায়ী প্যারিসে নোটারি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু, তিনি তার অধিকাংশ সময়ই বিদ্রূপাত্মক কবিতা লিখে ব্যয় করেছেন। পরে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সচিব হিসেবে নেদারল্যান্ডে চলে যান।
প্যারিসে ফিরে আসার পর ১৭১৭ সালে তিনি ফরাসি সরকারকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক লেখা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ডিউক অব অর্লিন্সকে নিয়ে উপহাস করেছেন। ফলস্বরূপ তিনি কেবল প্যারি থেকেই বিতাড়িত হননি, সেইসঙ্গে তাকে ১১ মাস জেল খাটতে হয়েছে। কারাগারে থাকার সময় ‘হেনরিয়ের্ডে’ নামে একটা মহাকাব্য রচনা করেন তিনি।
অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে পরের বার ১৭২৬ সালে বিনা বিচারে তাকে ইংল্যান্ডে নির্বাসন দেয়া হয়। সেখানে তিন বছর নির্বাসনে থাকাকালে তিনি জন লোক, নিউটন ও ব্রিটিশ সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অধ্যয়ন করেন।
প্যারিসে ফিরে আসার পর ১৭৩৪ সালে তিনি ‘ফিলোসফিক্যাল লেটার্স অন ইংলিশ’ নামে একটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধগুলোতে তিনি ব্রিটিশ সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেন, যা ছিল ফরাসি সমাজ ব্যবস্থার বিপরীত। ফলে তার বইগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং জনরোষানলে পড়ে আবারও তিনি শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
১৭৩৪ থেকে ১৭৪৯ সময়ে নির্বাসনে থাকাকালে তিনি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন করেন। একই সঙ্গে তিনি লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। বিভিন্ন ধরণের দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক বিষয়বস্তু তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন।
১৭৪৯ সালে তিনি পটসড্যাম চলে যান। সেখানে তিনি বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সাইন্সের সভাপতিকে আক্রমণ করে লেখা প্রকাশ করেন। ফলে আবারও তিনি জনরোষানলে পড়েন। গ্রেফতার এড়াতে তিনি সেই শহর ছেড়ে চলে যান। এদিকে ফ্রান্সের শাসক পঞ্চদশ লুই তাকে প্যারিসে নিষিদ্ধ করে দেন। এমতাবস্থায় তিনি এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে থাকেন এবং একপর্যায়ে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে আশ্রয় নেন।
বিভিন্ন সময়ে নির্বাসনে থাকাকালে তিনি প্রায় ২১ হাজার বই সংগ্রহ করেছেন এবং অধ্যয়ন করেছেন। অতঃপর তিনি রাষ্ট্র থেকে চার্চকে পৃথক রাখার জন্য আহবান জানান। অর্থাৎ তিনি ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখার পক্ষে ছিলেন।
নির্ভুলভাবে বলতে গেলে তিনি তার ব্যতিক্রমধর্মী লেখনীর মাধ্যমে নতুন ধারণা ও চিন্তাসমূহকে ফলপ্রসূভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি তার বিখ্যাত ‘CANDIDE’ (১৭৫৯) গ্রন্থে গটফ্রিড উইলহ্যাম লিবনিজ এর অতি আশাবাদী দর্শনের স্পষ্ট সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ব্লেইস প্যাসক্যাল কর্তৃক মানব অমঙ্গলতা নিয়ে অতি নৈরাশ্যবাদী দর্শনেরও বিরোধিতা করেছেন তিনি।
একজন দার্শনিক হিসেবে ১৭৬৪ সালে তিনি বিখ্যাত ‘Philosophical Dictionary’ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়া ১৭৫১-১৭৭২ সালে লেখা তার প্রবন্ধগুলো তিনি ‘Encyclopedia’ শিরোনামে প্রকাশ করেন। এসব লেখায় তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে ফরাসি সমাজ, ধর্ম ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেছেন।
ইতিহাসে ভলতেয়ারের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কেননা কিভাবে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে, তার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ধারণা দিয়েছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
তিনি খ্রিস্টান, ইসলামসহ প্রায় সব ধর্মেরই সমালোচনা করেছিলেন। তাই অনেকের কাছেই তিনি একজন নাস্তিক হিসেবে পরিচিত। মূলত তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন একেশ্বরবাদী। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে যারা একেশ্বরবাদ নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের অন্যতম একজন ছিলেন ভলতেয়ার।
তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে পর্যবেক্ষণ ও যৌক্তিক বিচারের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ‘Treatise on Toleration’ (১৭৬৩) গ্রন্থে তিনি সব মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, সব মানুষেরই ঈশ্বর একজন। সুতরাং ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা উচিত নয়।
তার কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার সমালোচনা করেছেন। বরং একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক রাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন তিনি। তার মতে, জনগণকে শিক্ষিত করলে কেবল জনগণেরই উপকার হবে তা নয়, রাজার জন্যও এটা প্রয়োজন। এভাবেই তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে অভিজাত বর্গের সমালোচনা করেছেন এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন।
২৫ বছর পর প্রথমবারের মতো ১৭৭৮ সালে তিনি তার প্রিয় জন্মভূমি প্যারিসে ফিরে আসেন। এক সময় যাকে বার বার প্যারিসবাসী তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ তারা তাকে বুকে আলিঙ্গন করে গ্রহণ করেন। ওই সময় বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সঙ্গে দেখা হলে তিনি ভলতেয়ারকে একজন মুক্ত স্থপতি হিসেবে ঘোষণা করেন।
অবশেষে ১৭৭৮ সালের ৩০ মে এই মহান দার্শনিক মারা যান।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন সাহিত্যিক, যার অসাধারণ লেখনী শক্তি তার সময়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় তুলে দিত। এমনও হয়েছে, সেই ঝড়ের আঘাতে কখনো কখনো অনেক প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত দার্শনিক মতবাদ কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের ভীত নড়ে যেত। তার অধিকাংশ কর্মই ছিল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনাকে কেন্দ্র করে। ফলস্বরূপ তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে, এমনকি নির্বাসনেও যেতে হয়েছে।
তার লেখনি সাধারণ মানুষকে এতটাই প্রভাবিত করত যে, কখনো কখনো শহরের পর শহর লোকজন উত্তপ্ত হয়ে যেত এবং তার রচিত গ্রন্থগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত। সমাজ ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করার সুবাদে তার শত্রুর সংখ্যা ছিল অগণিত। তিনি সরকারের অকার্যকারিতা, সাধারণ মানুষের মূর্খতা, চার্চের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা এবং দুর্নীতিবাজ ও পরজীবী স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন।
তাই আঠারো শতকের ওই সময়ে রোমান ক্যাথোলিক চার্চ, ফরাসি সরকার, এমনকি সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি শত্রুতে পরিণত হয়ে পড়েন। এতদসত্ত্বেও তিনি ছিলেন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এক অন্যতম অগ্রসেনানী। যিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, নাটক, ইতিহাসসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই কাজ করেছেন। যেখানে কেবল চিঠির সংখ্যাই ছিল ২১ হাজার এবং বই-পুস্তকের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজারেরও বেশি।
কিংবদন্তি ফরাসী সাহিত্যিক ও মহান দার্শনিক ভলতেয়ারকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—
আজও পৃথিবীর বুকে ধ্বনিত হয় সেই বাণী,
মতের ভিন্নতায়ও যেন না থামে মানবের জয়ো গান।
“তোমার সাথে দ্বিমত করি”—বলেন যিনি দৃপ্ত,
“তবু তোমার বলার অধিকারে জীবন দেব নিঃশর্ত।”
শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, বদলেছে কালের রথ,
তবু সেই উচ্চারণে জেগে ওঠে সত্যের পথ।
অন্ধকারের গহ্বর ভেদে জ্বলে যে দীপশিখা,
ভলতেয়ার সেই নাম, ইতিহাসে অমল লেখা।
প্যারিস নগরীর কোলে মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান,
শৈশবেই দেখেছিলেন জীবনের কঠিন অবসান।
মায়ের মৃত্যু রেখে গেছে হৃদয়ে গভীর ক্ষত,
সেই বেদনাই হয়তো পরে করেছে তাঁকে অবনত
অন্যায়ের কাছে নয়, বরং করেছে বিদ্রোহী,
শৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্নে জাগ্রত এক তরুণ মহীয়সী।
ধর্মপিতার আশ্রয়ে তিনি খুঁজে নেন নতুন দিশা,
মুক্ত চিন্তার আলো পেয়ে প্রসারিত হয় দৃষ্টি-দিগন্তবিশ্ব।
কাগজ-কলম হাতে নিয়ে গড়েন শব্দের তরবারি,
যেখানে মিথ্যার দুর্গ ভাঙে, সত্য দাঁড়ায় স্বমহিমাধারী।
তিনি দেখেছেন রাজপ্রাসাদের অলঙ্কৃত অহংকার,
দেখেছেন চার্চের নামে কত বিভেদের অন্ধকার।
দেখেছেন ধর্মের ছদ্মবেশে মানুষের উপর শাসন,
দেখেছেন ক্ষমতার লোভে কেমন বিকৃত হয় বিবেক-ভাষণ।
তাই তিনি কলম ধরেছেন, তাই লিখেছেন নির্ভয়ে,
সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন সকল রোষের মধ্যমণিয়ে।
ব্যঙ্গের আগুন ছুঁড়ে দিয়ে কাঁপিয়েছেন রাজদরবার,
শব্দের ঝড়ে কেঁপে উঠেছে ক্ষমতার উঁচু প্রাকার।
কারাগারের অন্ধ কক্ষে বন্দী হয়েছে তাঁর দেহ,
কিন্তু চিন্তার আকাশখানি হয়নি কোনোদিন গেহ।
লোহার শিকল রুখতে পারেনি মনের অবাধ উড়ান,
কারাগারেই রচিত হয়েছে অমর কাব্যের গান।
নির্বাসনের পথ ধরেও থামেননি সেই পথিক,
জ্ঞান ছিল তাঁর সম্বল, সত্য ছিল তাঁর সহচর চিরনিক।
ইংল্যান্ডের মাটিতে গিয়ে দেখলেন নতুন আলো,
নিউটনের বিজ্ঞান যেন খুলে দিল দিগন্ত ভালো।
জন লকের যুক্তিবাদী চিন্তা করল তাঁকে সমৃদ্ধ,
স্বাধীনতার ধারণাগুলি হলো আরও সুস্পষ্ট।
তিনি বুঝলেন—মানুষ শুধু প্রজাই নয়, নাগরিক,
বাকস্বাধীনতা ছাড়া সভ্যতা হয় না মহিমান্বিত।
ফিরে এসে লিখলেন তিনি ইংরেজ সমাজ নিয়ে,
ফরাসি সমাজের বিপরীতে নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে।
প্রশ্ন শুনে ভীত হলো যারা সিংহাসনের প্রহরী,
বই পুড়ল, তবু জ্বলেনি তাঁর অন্তরের আলোকধারী।
এক শহর থেকে অন্য শহর, নির্বাসনের দীর্ঘ পথ,
তবু তিনি বহন করেছেন চিন্তার অমর রথ।
বইয়ের পরে বই পড়েছেন, জ্ঞানের পরে জ্ঞান,
এক জীবনে সংগ্রহ করেছেন সহস্র আলোর দান।
তিনি বললেন—রাষ্ট্র যেন ধর্মের হাতে না বাঁধা,
মানুষ যেন মানুষ থাকে, না হয় বিভেদের কাঁধা।
চার্চ আর ক্ষমতার জোট যখন করে মন অধিকার,
তখন সত্যের কণ্ঠস্বর হয় বারবার অপমানিত আর।
তাই তাঁর আহ্বান ছিল—ধর্ম থাকুক হৃদয়ের ঘরে,
রাষ্ট্র থাকুক ন্যায়ের পথে, সকল মানুষের তরে।
কেউ কারও বিশ্বাস নিয়ে না করুক রক্তক্ষয়,
সহনশীলতার আলোয় মানবসমাজ হোক জয়ময়।
‘কঁদিদ’-এর পাতায় পাতায় তিনি প্রশ্ন ছুড়েছেন,
অতিরিক্ত আশাবাদের মুখোশ টেনে খুলেছেন।
আবার নৈরাশ্যের কালো মেঘকেও করেননি প্রশ্রয়,
মানুষের সংগ্রামেই দেখেছেন সম্ভাবনার পরিচয়।
‘ট্রিটাইজ অন টলারেশন’-এ উচ্চারিত সেই বাণী,
আজও মানবাধিকারের মর্মবাণী, প্রাণের টানি।
সব মানুষের বিশ্বাসের অধিকার আছে সমান,
ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো সভ্যতার অপমান।
তিনি ছিলেন ঈশ্বরবিশ্বাসী, তবে অন্ধ নন কখনো,
যুক্তির আলোয় খুঁজেছেন সত্য, অনুসন্ধানী মন অনন্ত।
প্রার্থনার চেয়ে প্রশ্নকে দিয়েছেন অধিক মর্যাদা,
কারণ প্রশ্নের ভিতরেই জাগে জ্ঞানের প্রথম সাধা।
তিনি বলেছিলেন—মানুষকে বিচার কোরো না উত্তর দিয়ে,
তার প্রশ্ন দেখো, বুঝবে কত দূর সে গেছে জ্ঞানে নিয়ে।
এই বাণী আজও শিক্ষালয়ে, চিন্তার প্রতিটি দ্বারে,
মুক্ত মনের আহ্বান হয়ে বাজে নতুন উচ্চারণে।
ভলতেয়ার ছিলেন না কেবল একজন লেখক মহান,
ছিলেন নাগরিক অধিকারের এক নির্ভীক অধিনায়ক প্রাণ।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাঁর কলম ছিল অগ্নিশলাকা,
যার ভাষায় জেগে উঠত নিপীড়িত মানুষের ডাক।
তিনি দেখেছেন মূর্খতার গর্ব, কুসংস্কারের জাল,
দেখেছেন কেমন করে মানুষ হারায় বিবেকের কাল।
তাই তাঁর প্রতিটি বাক্য যেন যুক্তির দীপ্ত মশাল,
যেখানে ভয় পিছু হটে, সামনে আসে সত্যের জোয়ার।
আজও যখন মতের কারণে মানুষ হয় নির্যাতিত,
আজও যখন প্রশ্ন তোলায় কণ্ঠ হয় অবরুদ্ধ, অবহেলিত,
আজও যখন ধর্মের নামে জ্বলে ওঠে বিভেদের আগুন,
তখন ভলতেয়ারের নামটি হয়ে ওঠে বিবেকের ধ্বনিগুণ।
আজও যখন রাষ্ট্র চায় নাগরিকের চিন্তা বাঁধতে,
আজও যখন ক্ষমতা চায় ইতিহাসকে নিজের মতো গাঁথতে,
তখন তাঁর জীবন শেখায়—প্রতিরোধই মানবধর্ম,
সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই সভ্যতার চিরন্তন কর্ম।
তিনি ছিলেন ঝড়ের মানুষ, বিতর্ক ছিল তাঁর সাথী,
তবু তিনি থামেননি কোনোদিন, হননি কখনো ক্লান্ত পথিক।
কারণ তিনি জানতেন ভালো—সত্য যদি থাকে বন্দী,
সভ্যতার ভবিষ্যৎ তবে হয়ে যাবে অন্ধ।
তাঁর চিঠির সংখ্যা হাজারে হাজার, বিস্ময়ের ইতিহাস,
শব্দের ভিতর গড়ে তুলেছেন জ্ঞানের মহাবিশ্বাস।
নাটক, প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাসের ধারা,
প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখে গেছেন অনন্য দীপ্তি সারা।
পঁচিশ বছর পর যখন ফিরলেন জন্মভূমির কোলে,
যে নগর একদিন তাঁকে তাড়িয়েছিল অবহেলে,
সেই নগরই এবার তাঁকে বরণ করল শ্রদ্ধায়,
ইতিহাসের চাকা যেন নত হলো তাঁর মহিমায়।
মৃত্যু এলো, কিন্তু মৃত্যু কি পারে আলো নিভাতে?
চিন্তার দীপ জ্বলে থাকে যুগের পরে যুগের রাতে।
১৭৭৮-এর সেই মে মাসের শেষ প্রহরে,
দেহ থেমেছে, কিন্তু তিনি রয়েছেন মানব-অন্তরে।
আজকের পৃথিবী যদি সত্যিই হতে চায় মহান,
তবে প্রয়োজন ভলতেয়ারের সেই মুক্তির আহ্বান।
ধর্ম থাকুক হৃদয়ে, রাষ্ট্র থাকুক সকলের,
বাকস্বাধীনতা হোক অধিকার প্রতিটি মানুষের।
প্রশ্ন করার সাহস থাকুক, থাকুক যুক্তির দীপ্তি,
ভিন্নমতের প্রতি থাকুক সম্মানের সুদীর্ঘ নীতি।
কারণ সভ্যতা এগোয় না নিষেধের কঠিন প্রাচীরে,
সভ্যতা এগোয় মুক্ত চিন্তার অবারিত সমুদ্রে।
হে ভলতেয়ার, তোমার নাম আজও জাগায় আলো,
অসহিষ্ণুতার বিপরীতে দাঁড়াবার অটল বল।
যতদিন মানুষ খুঁজবে স্বাধীনতার অর্থ,
ততদিন তোমার বাণী থাকবে ইতিহাসের রথ।
যতদিন কলম লড়বে মিথ্যার বিরুদ্ধে নির্ভীক,
যতদিন সত্যের পথে চলবে কোনো এক পথিক,
যতদিন মানবমুক্তির স্বপ্ন জাগবে হৃদয়জুড়ে,
ততদিন ভলতেয়ার বেঁচে থাকবেন পৃথিবীর প্রতিটি সুরে।
তোমার সেই অগ্নিবাক্য যুগে যুগে দিক উচ্চারণ—
মতের ভিন্নতা নয়, মানুষের অধিকারই হোক সম্মান।
ঘৃণার বদলে সহনশীলতা, বিভেদের বদলে প্রীতি,
এই হোক মানবসভ্যতার চিরন্তন অঙ্গীকার-গীতি।
আর সেই গানের অন্তরালে, আলোর অনির্বাণ ধারায়,
ভলতেয়ার তুমি জেগে থাকো বিশ্বমানবের মর্মমাঝায়।
সত্য, স্বাধীনতা, যুক্তি, ন্যায়—এই চার স্তম্ভ ধরে,
তোমার স্বপ্নের মানবসভ্যতা এগিয়ে যাক অনন্ত ভোরে।
—(ভলতেয়ার,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
পুরো একটি জীবন বিতর্কে জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও, আজ তাকে ইতিহাসের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক এবং দার্শনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভলতেয়ারের কিছু বিখ্যাত উক্তি-
“পড় এবং নাচ কর, এই দুটি কর্ম কখনো বিশ্বের কোনো ক্ষতি করবে না।”
“জবাব দিয়ে নয়, একজন মানুষকে বিচার কর তার প্রশ্ন দিয়ে।”
“জীবন হচ্ছে একটি ডুবন্ত জাহাজ, তাই বলে নৌকায় থাকার সময় গান গাইতে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।”
“যদি ঈশ্বর নাই বা থাকেন, আমাদের কর্তব্য হবে ঈশ্বরকে আবিষ্কার করা।”
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি