তুমি নেই, তবু তুমি আছো

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২৬

তুমি নেই, তবু তুমি আছো

Manual3 Ad Code

দীপংকর ভট্টাচার্য লিটন |

মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক সময়ের সীমারেখা অতিক্রম করে যায়। মৃত্যু সেখানে শেষ কথা নয়; বরং স্মৃতি, শিক্ষা, আদর্শ ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক নতুন এক অস্তিত্ব লাভ করে। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক তেমনই এক চিরন্তন বন্ধন। শারীরিকভাবে তারা একদিন অনুপস্থিত হয়ে যান, কিন্তু তাঁদের আদর্শ, জীবনদর্শন ও স্নেহের ছায়া সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপে বেঁচে থাকে।

আজ আমার পিতার দশম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। ক্যালেন্ডারের হিসাবে দশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আমার কাছে তিনি কখনোই অনুপস্থিত নন। বরং জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে, প্রতিটি সংকটে এবং প্রতিটি অর্জনের মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি।

Manual7 Ad Code

সময়ের সঙ্গে মানুষের অনেক স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু পিতার কিছু ছোট ছোট অভ্যাস আজও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। গভীর রাতে বাড়ি ফিরে দরজায় কড়া নাড়ার পর তাঁর কণ্ঠস্বর শোনার সেই অনুভূতি আজও মনে জাগে। মনে হয়, তিনি এখনও অপেক্ষা করছেন। পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও সন্তান ঘরে না ফেরা পর্যন্ত তাঁর ঘুম আসত না। একজন পিতার নিঃশব্দ দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার এমন প্রকাশ হয়তো কোনো অভিধানে লেখা থাকে না, কিন্তু সন্তানের হৃদয়ে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকে।

Manual6 Ad Code

আমার পিতা ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের মানুষ। লবণ ছাড়া এক কাপ চা এবং সঙ্গে একটি নিমকী—এতেই তিনি তৃপ্তি খুঁজে পেতেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা ও মনন ছিল অসাধারণ। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের কল্যাণে, পরোপকারে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধে। নিজের সুবিধার চেয়ে অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন, সেটিই আজ তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

মৃত্যুর এত বছর পরও যখন তাঁর সমসাময়িক বন্ধু, রাজনৈতিক সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর প্রসঙ্গ তোলেন, তখন একটি কথাই বেশি শুনতে পাই—“তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।” এই কয়েকটি শব্দ আমার হৃদয়কে একই সঙ্গে আবেগাপ্লুত ও গর্বিত করে। কারণ একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সম্পদ বা পদ-পদবি নয়; মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করাই প্রকৃত সফলতা।

Manual5 Ad Code

আমাদের সমাজে আজ নৈতিকতার সংকট, সহমর্মিতার অভাব এবং অসহিষ্ণুতার প্রবণতা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। এমন সময়ে আমার পিতার জীবনাদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। তিনি শিখিয়েছেন পরমতসহিষ্ণু হতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সততা কখনো তাৎক্ষণিক লাভ নাও এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

পিতার কাছ থেকে পাওয়া এই মূল্যবোধগুলোই আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের পথচলার ভিত্তি। একজন সাংবাদিক হিসেবে সত্যের অনুসন্ধান, সমাজের পক্ষে কথা বলা এবং দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষাই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। যখনই কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হই, মনে মনে তাঁর কাছেই ফিরে যাই। মনে হয়, তিনি যেন নীরবে বলে চলেছেন—“সত্যের পথেই থেকো।”

আসলে একজন পিতা শুধু একটি পরিবারের অভিভাবক নন; তিনি একটি প্রজন্মের নির্মাতা। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ সন্তানদের মাধ্যমে সমাজে প্রবাহিত হতে থাকে। তাই মৃত্যু কোনো মানুষের সমাপ্তি নয়, যদি তাঁর আদর্শ পরবর্তী প্রজন্ম ধারণ করে।

আজ পিতার দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁর জন্য প্রার্থনা করছি। একই সঙ্গে নিজেকেও মনে করিয়ে দিচ্ছি—তিনি যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথ থেকে যেন কখনো বিচ্যুত না হই। কারণ সত্যিই, তিনি নেই—তবু তিনি আছেন। আছেন আমার প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি ভালো কাজে এবং প্রতিটি মানবিক মূল্যবোধে।

একজন পিতা তাঁর সন্তানের জীবনে কতটা গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন, আমার পিতা তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।

#
দীপংকর ভট্টাচার্য লিটন
সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি,
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি,
দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’।

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ