ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে কমলগঞ্জে বন্যা: পানিবন্দি ১৫ হাজার মানুষ, কৃষি ও যোগাযোগে ব্যাপক ক্ষতি

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২৬

ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে কমলগঞ্জে বন্যা: পানিবন্দি ১৫ হাজার মানুষ, কৃষি ও যোগাযোগে ব্যাপক ক্ষতি

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার), ০৯ জুলাই ২০২৬ : টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে উপজেলার অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ, তলিয়ে গেছে সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত একর কৃষিজমি এবং একটি কালভার্ট ধসে পড়ায় ব্যাহত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যার পানি নিম্নাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) রাতের দিকে ইসলামপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ উজানের প্রবল স্রোতে ভেঙে যায়। বাঁধ ভেঙে নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করলে ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে মখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, কোনাগাঁও, বেরিগাঁও, শ্রীপুর, পাতারিগাঁও, কালায়েরবিল, আধকানী, ছনগাঁও, বন্দেরগাঁও, তেঁতইগাঁও, ভানুবিল ও ঘোরামারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের অন্ধকারে হঠাৎ করে পানি প্রবেশ করায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি। অনেক বাড়িঘর, রান্নাঘর ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল পানিতে তলিয়ে গেছে। নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় মানুষকে নৌকা কিংবা বিকল্প পথ ব্যবহার করে চলাচল করতে হচ্ছে।

বন্যার পানিতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়রা দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, নিরাপদ পানি এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

Manual6 Ad Code

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানিয়েছে, মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। তবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর আপত্তির কারণে সীমান্তসংলগ্ন ওই অংশে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে সেখানে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং এবার তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, বাঁধ ভেঙে প্রবেশ করা পানি ধীরে ধীরে নিম্নাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে শমশেরনগর, পতনউষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাতেও পানি বাড়ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে প্রবল স্রোত ও জলাবদ্ধতায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের রোপণ করা আউশ ধান, সবজি ক্ষেত এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক জানান, কয়েক মাসের শ্রম ও বিনিয়োগ মুহূর্তেই হুমকির মুখে পড়েছে। পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, “টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে অনেক কৃষিজমি পানির নিচে থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। পানি নেমে গেলে বিস্তারিত জরিপ করা হবে।”

Manual6 Ad Code

বন্যার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে মাধবপুর-ভায়া-শ্রীমঙ্গল সড়কের নুরজাহান চা-বাগানের গোয়াবাড়ি এলাকায় একটি কালভার্ট ধসে পড়েছে। এছাড়া আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ইউনিয়নের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের দুর্ভোগ বেড়েছে এবং জরুরি সেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Manual7 Ad Code

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৯১ মিলিমিটার, বুধবার বিকেল ৬টা পর্যন্ত আরও ৭৯ মিলিমিটার এবং বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ধারাবাহিক এই ভারী বর্ষণ এবং উজানের ঢল মিলেই বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, “ধলাই নদীর মখাবিল এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় ভারতীয় বিএসএফের আপত্তির কারণে ওই অংশে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারকাজ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পানি কমলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “টানা বৃষ্টি ও ধলাই নদীর ভাঙনের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল বলছেন, ধলাই নদীর সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টেকসইভাবে সংস্কার না করা হলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তারা সংশ্লিষ্ট দুই দেশের কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

Manual1 Ad Code

এদিকে পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন। তবে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত বা উজানে বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আবারও অবনতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ