সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামান: মানবিকতা, সততা ও ঐতিহ্যের এক আলোকবর্তিকা

প্রকাশিত: ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২৬

সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামান: মানবিকতা, সততা ও ঐতিহ্যের এক আলোকবর্তিকা

Manual8 Ad Code
  • তাঁর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সৈয়দ আক্রামুজ্জামান |

মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা কেবল তার অর্জনে নয়; বরং তার কর্ম, চরিত্র, মূল্যবোধ এবং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া স্মৃতিতে নিহিত থাকে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের সততা, মানবিকতা ও নীরব সেবার মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী ছাপ রেখে যান। আমার পিতা প্রয়াত সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামান ছিলেন তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই সজ্জন, কর্মনিষ্ঠ ও মানবদরদী মানুষটিকে।

২০০৮ সালের ১২ জুলাই তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। দীর্ঘ ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি, আদর্শ ও জীবনদর্শন আজও পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিতজনের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্য, সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানবসেবাই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

Manual5 Ad Code

সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামান ১৯৪০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন ঐতিহাসিক তরফ রাজ্যের রাজধানী, বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার লস্করপুর পশ্চিম হাবিলীতে এক সম্ভ্রান্ত, ঐতিহ্যবাহী ও শিক্ষানুরাগী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুল মোতাকাব্বির আবুল হোসেন ছিলেন তরফ রাজ্যের ছয় আনার জমিদার, বহুভাষাবিদ এবং সনেট কবি। মাতা নসরত জাহান চৌধুরী ছিলেন স্নেহশীলা, ধর্মপ্রাণ ও আদর্শবান নারী। পারিবারিক পরিবেশেই তিনি শিক্ষা, শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের আদর্শে বেড়ে ওঠেন।

তাঁদের বংশপরিচয়ও ইতিহাসসমৃদ্ধ। তিনি ছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী ও সেনাপতি হযরত সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর। এই ঐতিহ্যবাহী বংশের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি কখনো বংশগৌরবকে ব্যক্তিগত অহংকারের উপকরণ করেননি; বরং নম্রতা, বিনয় ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা করেছেন।

কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ সময় নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে হবিগঞ্জে ড্রাফ্টসম্যান (নকশাকার) হিসেবে কর্মরত থেকে ১৯৯৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সরকারি চাকরিজীবনে তিনি দায়িত্বশীল, কর্মঠ ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে সহকর্মীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। কর্মস্থলে যেমন কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও নীতিবান।

সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামানের পারিবারিক পরিমণ্ডল বাংলাদেশের বিচার বিভাগেও বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। তাঁর বড় ভাই ছিলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান বিচারপতি বিচারপতি সৈয়দ এ. বি. মাহমুদ হোসেন। তাঁর ভাতিজাদের মধ্যে বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন বাংলাদেশের ১৪তম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ছিলেন। এ ধরনের কৃতী পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি সর্বদা ছিলেন নিরহংকার, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজ-সরল আচরণে অভ্যস্ত।

পারিবারিক জীবনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুলতানশী হাবিলী, হবিগঞ্জের তরফ রাজ্যের নয়আনী জমিদার এবং সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ (টেনু মিয়া)-এর কনিষ্ঠ কন্যা সৈয়দা সাইয়্যেদা বেগমের সঙ্গে। তাঁদের সংসার ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক ঐতিহ্যের এক অনন্য উদাহরণ। তাঁরা চার পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জনক-জননী ছিলেন। সন্তানদের সুশিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য।

প্রয়াত সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানবিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সর্বোত্তম ইবাদত। ব্যক্তিগত সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি নীরবে দান-সদকা করতেন, অসহায় মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন এবং সমাজের অভাবগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সচেষ্ট থাকতেন। আত্মপ্রচারের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। তাই তাঁর বহু মানবিক কর্মকাণ্ড আজও কেবল উপকৃত মানুষের স্মৃতিতেই জীবন্ত হয়ে আছে।

Manual1 Ad Code

তিনি ধর্মপ্রাণ, পরোপকারী ও অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত যে-ই তাঁর কাছে এসেছে, তিনি আন্তরিকতা ও সৌজন্যের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ক্ষমাশীলতা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের মর্যাদা তার পদমর্যাদায় নয়, বরং তার চরিত্র ও কর্মে।

অবসর গ্রহণের পর তিনি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ আইডিয়াল হাইস্কুল সংলগ্ন নিজস্ব ভূমিতে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও এলাকার মানুষের সান্নিধ্যে অতিবাহিত করেন। সেখানেই ২০০৮ সালের ১২ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু শুধু পরিবারের জন্য নয়, তাঁকে জানতেন এমন বহু মানুষের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আজকের সমাজে যখন সততা, নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক মূল্যবোধ নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামানের জীবন আমাদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—বড় মানুষ হতে হলে বড় পদ বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন নির্মল চরিত্র, সৎ কর্ম এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি হৃদয়।

নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন হতে পারে মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল পাঠ। পারিবারিক ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কর্তব্য পালন, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং সর্বোপরি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

মৃত্যু মানুষকে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যায়, কিন্তু মহৎ কর্ম কখনো বিলীন হয় না। একজন সৎ, নীতিবান ও মানবিক মানুষের জীবন ও আদর্শ সময়ের সীমানা অতিক্রম করে পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। প্রয়াত সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামান সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁর স্মৃতি তাঁর পরিবার, শুভানুধ্যায়ী এবং সমাজে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Manual5 Ad Code

তাঁর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে বিনীত প্রার্থনা করি—তিনি যেন মরহুম সৈয়দ আম্বিয়াউজ্জামানকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন, তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করেন এবং তাঁর রেখে যাওয়া উত্তম আমলসমূহ কবুল করেন।

আমিন।
#
সৈয়দ আক্রামুজ্জামান
বেঞ্চ অফিসার
হাইকোর্ট বিভাগ,
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট,
ঢাকা।

Manual8 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ