চা-শ্রমিকদের ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরিসহ ১১ দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের সংহতি

প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০২৬

চা-শ্রমিকদের ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরিসহ ১১ দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের সংহতি

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৬ : চা-শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টসংক্রান্ত গেজেট বাতিল, ভূমির অধিকার নিশ্চিতকরণসহ ১১ দফা দাবির চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ (University Tea Students’ Association—UTSA)।

একই সঙ্গে চা-জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও শ্রমিকদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শেখর ভরদ্বাজ ও সাধারণ সম্পাদক গৌতম রায় এ সংহতির কথা জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, চা-জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। চা-বাগান থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থী ও তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, অধিকার ও সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার রয়েছে। চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, ভূমির অধিকার এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংগঠনটির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

মজুরি নিয়ে অসন্তোষ

সংগঠনটির বিবৃতিতে চা-শ্রমিকদের বর্তমান মজুরিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, চা-শ্রমিকরা বর্তমানে দৈনিক ১৭০ টাকা মজুরি পান। ২০২২ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর মজুরি ৫০ টাকা বাড়ানো হলেও পরবর্তীতে প্রকাশিত গেজেটে মূল মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের বিধান করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের মতে, বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতায় এই মজুরি শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের গেজেট বাতিল করে চা-শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি অন্তত ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে তারা।

Manual8 Ad Code

বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যমানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, দৈনিক ১ দশমিক ৯১ ডলারের কম আয়কে অতি-দারিদ্র্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেই বিবেচনায় চা-শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি তাদের জীবনযাত্রার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাগানে, তবু নেই ভূমির মালিকানা

চা-শ্রমিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে ভূমির অধিকারকে চিহ্নিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ। সংগঠনটির ভাষ্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানে বসবাস ও শ্রম দিয়ে এলেও অনেক শ্রমিক তাদের বসতভিটার মালিকানা থেকে বঞ্চিত।

বিবৃতিতে বলা হয়, নিজেদের বসতভূমিতেই চা-শ্রমিকরা কার্যত পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছেন। তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত না করে জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

শিক্ষায় পিছিয়ে চা-বাগান এলাকার মানুষ

চা-জনগোষ্ঠীর শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, দেশের ১৭০টি চা-বাগানের অনেকগুলোতে কোনো কলেজ নেই। উচ্চবিদ্যালয়ের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রত্যন্ত বাগান এলাকার অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এতে ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে।

ভাষাগত ও সামাজিক বৈষম্যের কারণেও চা-জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে তাদের জন্য কার্যকর বিশেষ ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

চা-বাগানগুলোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি চা-বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে উচ্চবিদ্যালয়, কারিগরি বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ।

Manual7 Ad Code

স্বাস্থ্যসেবায় সংকট

চা-বাগান এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোগত সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে। সংগঠনটির দাবি, অধিকাংশ চা-বাগানে পর্যাপ্ত হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। কোথাও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে চিকিৎসক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে।

প্রশিক্ষিত ধাত্রী ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবে মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, রক্তশূন্যতা ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে চা-শ্রমিকরা নিয়মিত আক্রান্ত হচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

চা-বাগান ক্লাস্টারভিত্তিক অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, ধাত্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য পানিশোধনাগার স্থাপনেরও দাবি করা হয়েছে।

আবাসন ও স্যানিটেশনেও পিছিয়ে

চা-শ্রমিকদের আবাসন পরিস্থিতিকে অমানবিক হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ। সংগঠনটির ভাষ্য, অধিকাংশ শ্রমিক পরিবার অল্প জায়গার একটি ছোট ঘরে বসবাস করে। অনেক ক্ষেত্রে একই ঘরে একাধিক প্রজন্মকে বসবাস করতে হয়।

মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিশেষ আবাসন প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা চেয়েছে সংগঠনটি।

শ্রম আইন বাস্তবায়নে নজরদারি বাড়ানোর দাবি

চা-শ্রমিকদের নিয়োগ ও চাকরির স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ। তাদের দাবি, শ্রম আইনে নিয়োগপত্র দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে অনেক চা-শ্রমিক নিয়োগপত্র পান না।

Manual4 Ad Code

বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, আইন অনুযায়ী তিন মাস কাজের পর স্থায়ী করার বিধান থাকলেও প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক দীর্ঘদিন কাজ করার পরও স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা এবং মালিকপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

এ জন্য নিয়োগপত্র প্রদান ও স্থায়ীকরণের বিধান কার্যকর করতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন এবং আইন অমান্যকারী বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সাংস্কৃতিক অধিকার

চা-বাগানে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, লোকশিল্প, উৎসব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য পৃথক উদ্যোগের দাবিও রয়েছে সংগঠনটির ১১ দফায়।

চা-বাগানের ১১টি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘চা জনগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে চা-জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখার এবং বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি

চা-বাগান এলাকার বেকার তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চা শ্রমিক উন্নয়ন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে চা-বাগানের বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় গঠনেরও দাবি করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, চা-জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আবাসন, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকারের মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন।

শ্রম আইন সংশোধন ও আইনি সহায়তার দাবি

চা-শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ। বিশেষ করে শ্রম আইনের ৩২(১) ধারাসহ সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি করা হয়েছে।

শ্রম আইন বাস্তবায়নে চা-বাগান পরিদর্শন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য বিশেষ আইনগত সহায়তা সেবা চালুর দাবি জানানো হয়েছে।

জাতীয় জনগণনায় পৃথকভাবে চা-জনগোষ্ঠীকে গণনার দাবি

চা-জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান ও প্রয়োজন নিরূপণের জন্য জাতীয় জনগণনায় তাদের পরিচয়ভিত্তিক পৃথকভাবে গণনা ও স্বীকৃতির দাবিও জানানো হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া চা-জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা কঠিন। তাই জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক গণনা প্রয়োজন।

১১ দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

Manual7 Ad Code

বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের ১১ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—চা-শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা, নিয়োগপত্র ও স্থায়ীকরণের বিধান বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও ‘চা জনগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা, জাতীয় বাজেটে পৃথক বরাদ্দ, ‘চা শ্রমিক উন্নয়ন একাডেমি’ ও পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, শ্রম আইন সংশোধন ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় জনগণনায় চা-জনগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে গণনা ও স্বীকৃতি দেওয়া।

সংগঠনটি বলেছে, চা-শ্রমিকরাই বাংলাদেশের চা-শিল্পের মূল চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের চা-শিল্প এগিয়ে গেলেও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে এই উন্নয়ন টেকসই হবে না।

বিবৃতিতে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টসংক্রান্ত গেজেট বাতিল, দৈনিক ন্যূনতম ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ এবং চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ১১ দফা দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ জানিয়েছে, বাংলাদেশের চা-জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার দাবিতে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে পাশে থাকবে।