ড. নিরাফাত আনাম শিপ্রা: প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও মানবিক সমাজ গঠনে এক নিবেদিতপ্রাণ অগ্রদূত

প্রকাশিত: ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২৬

ড. নিরাফাত আনাম শিপ্রা: প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও মানবিক সমাজ গঠনে এক নিবেদিতপ্রাণ অগ্রদূত

Manual6 Ad Code

শুভ রহমান |

আজ ২৭ আগস্ট। ড. নিরাফাত আনাম শিপ্রার ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। দেখতে দেখতে তাঁর চলে যাওয়ার ২৫ বছর পেরিয়ে গেল। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমাতেও তাঁর স্মৃতি, কর্ম ও মানবিক আদর্শ আমাদের কাছে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী শিক্ষাবিদ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, প্রতিবন্ধী শিক্ষা বিষয়ে একজন দক্ষ রিসোর্স পার্সন এবং সর্বোপরি মানবকল্যাণে নিবেদিত এক অসাধারণ মানুষ।

ড. নিরাফাত আনাম শিপ্রা ছিলেন গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম আজিজুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা। একটি শিক্ষিত ও মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও মানুষের জন্য কাজ করার যে মানসিকতা তিনি অর্জন করেছিলেন, পরবর্তী জীবনে তা তাঁর কর্মক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

Manual1 Ad Code

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৪ বছর। এত অল্প বয়সে তাঁর জীবনাবসান নিঃসন্দেহে পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং বৃহত্তর সমাজের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ—আইইআর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রেখেছেন, তেমনি শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তাঁর কর্মপরিসর ছিল অনেক বিস্তৃত।

বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আমাদের সমাজে যখন প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি, তখন নিরাফাত আনাম শিপ্রা এই ক্ষেত্রটিকে নিজের কর্ম ও চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শুধু শিক্ষকতা করেননি; প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের শিক্ষা, যোগাযোগ, বিকাশ এবং সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার বিষয়ে কাজ করেছেন।

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট—সিডিডি, সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি—সিএসআইডি, ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন, অ্যাকশনএইড, ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব টিচার্স অব দ্য ডেফ, কমিউনিকেশন থেরাপি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে তিনি প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ধারণাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময় ও কৃতিত্বপূর্ণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ঢাকায় প্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাই কেয়ার স্কুলে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার এই প্রাথমিক পর্যায়টি তাঁর পরবর্তী জীবনের কর্মদর্শন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিতা ও স্বামীর অনুপ্রেরণায় তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন—শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; শিক্ষা মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।

প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি শিশুর শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা তার সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না। প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা, সহায়ক পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষক এবং পরিবারের সহযোগিতা। এই উপলব্ধিই তাঁকে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার দিকে নিয়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর শিক্ষার এই পর্যায়ে তিনি যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, দেশে ফিরে তা তিনি শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন, অন্যদিকে শিক্ষা ও প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছেন।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য কেবল তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্র কিংবা একাডেমিক পদমর্যাদায় নয়; তাঁর সাফল্যের বড় মাপকাঠি হলো তাঁর শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সমাজে কী ভূমিকা রাখছেন। সেই বিচারে নিরাফাত আনাম শিপ্রার উত্তরাধিকার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সরাসরি শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরবর্তীকালে শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন ও সমাজসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন।

তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি ছাত্র এবং বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. তারিক আহসান, ড. মাহাবুবুর রহমান লিটু, উন্নয়ন ও সমাজ সংগঠক জাহিদুল কবীর টিটু এবং তাঁর প্রিয় ছাত্রী তাহমিনা পলির মতো অনেকেই আজও তাঁর স্মৃতি ও কাজকে ধারণ করে চলেছেন। তাঁদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাফাত আনাম শিপ্রার শিক্ষা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

Manual5 Ad Code

নিরাফাত আনাম শিপ্রার ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা গুণে সমৃদ্ধ। তাঁর স্বামী ছিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র চিত্রগ্রাহক প্রয়াত মাহফুজুর রহমান খান। শিল্প ও শিক্ষার দুটি ভিন্ন জগতের এই দুই মানুষের পারিবারিক জীবন ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত। স্বামীর অনুপ্রেরণা যেমন তাঁর শিক্ষকতা ও পেশাগত জীবনে ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি তিনিও নিজের কর্মের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন।

Manual1 Ad Code

২৫ বছর আগে তিনি চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর কাজের প্রয়োজনীয়তা আজ যেন আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার, বিশেষায়িত শিক্ষা, যোগাযোগ-সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার বিষয়গুলো আজ জাতীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ কয়েক দশক আগে যখন এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, তখন নিরাফাত আনাম শিপ্রার মতো মানুষরা নীরবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন।

তাঁদের কাজের মূল্যায়ন তাই কেবল অতীত স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং তাঁদের আদর্শ ও কর্মদর্শন থেকে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে সবার জন্য উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। প্রতিবন্ধী শিশুদের আলাদা করে দেখার পরিবর্তে তাদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রেই নিরাফাত আনাম শিপ্রার চিন্তা ও কর্ম আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে।

তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার উদ্যোগও প্রশংসনীয়। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি দুই বছর পরপর শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো হয়। একজন প্রয়াত শিক্ষাবিদের স্মৃতিকে কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজে ইতিবাচক কাজ করা মানুষদের সম্মানিত করার মাধ্যমে তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

আজ তাঁর পৈতৃক বাড়ি গাইবান্ধা শহরের বাসায় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও খায়ের অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁর জন্মভূমি ও প্রিয়জনেরা নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর স্মৃতিকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। একজন শিক্ষকের স্মরণে শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করার চেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা আর কী হতে পারে?

নিরাফাত আনাম শিপ্রার জীবন ছিল মাত্র ৪৪ বছরের। কিন্তু জীবনের দৈর্ঘ্য দিয়ে মানুষের অবদান মাপা যায় না। কেউ কেউ দীর্ঘ জীবন পেয়েও সমাজে খুব সামান্য ছাপ রেখে যান; আবার কেউ স্বল্প সময়ের জীবনে এমন কিছু কাজ করে যান, যা বহু বছর পরও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। নিরাফাত আনাম শিপ্রা ছিলেন সেই দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ।

Manual1 Ad Code

তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন কিংবা তাঁর শিক্ষার্থী ছিলেন, তাঁদের স্মৃতিতে নিশ্চয়ই তাঁর নানা রকম ছবি রয়েছে—একজন আন্তরিক শিক্ষক, একজন দায়িত্বশীল সহকর্মী, একজন মানবিক মানুষ এবং একজন স্বপ্নবান শিক্ষাবিদ হিসেবে। তাঁর কাজের সঙ্গী ও শিক্ষার্থীরা আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সাফল্যের মধ্যেও যেন তাঁর শিক্ষাদানের উত্তরাধিকার বেঁচে আছে।

তাঁর প্রিয় ছাত্র ড. মো. তারিক আহসান, ড. মাহাবুবুর রহমান লিটু, উন্নয়ন ও সমাজ সংগঠক জাহিদুল কবীর টিটু এবং প্রিয় ছাত্রী তাহমিনা পলির কথা আজ বিশেষভাবে স্মরণ করছি। তাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করছেন। তাঁদের প্রতি রইল শুভকামনা। আশা করি, তাঁরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার স্বপ্নকে আরও দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

আজ ২৫ বছর পর দাঁড়িয়ে ড. নিরাফাত আনাম শিপ্রাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রিয় মানুষকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার ইতিহাসে একজন নিবেদিতপ্রাণ নারীর অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা। তাঁর মতো মানুষদের কর্ম ও জীবনচিন্তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি, কারণ সমাজ বদলের ইতিহাস কেবল বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়—নীরবে কাজ করে যাওয়া কিছু মানুষের জীবনও সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ড. নিরাফাত আনাম শিপ্রা আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর শিক্ষার্থীরা, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য তাঁর কাজ এবং তাঁর মানবিক আদর্শ তাঁকে আমাদের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি।

মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁর পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা ও শুভকামনা। তাঁর মানবিক কাজের উত্তরাধিকার আরও বিস্তৃত হোক—এই হোক আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ