মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আলাউর রহমান চৌধুরী আর নেই

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আলাউর রহমান চৌধুরী আর নেই

Manual2 Ad Code
  • আন্দোলন-সংগ্রাম ও সমাজসেবায় দীর্ঘ পথচলার অবসান

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ২৯ আগস্ট ২০২৬ : মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট সমাজসেবক এবং মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আলাউর রহমান চৌধুরী আর নেই।

Manual3 Ad Code

গত ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে মৌলভীবাজার শহরের কাজিরগাঁও এলাকার নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।) মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

Manual8 Ad Code

তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

আলাউর রহমান চৌধুরীর প্রথম জানাজার নামাজ ২৬ আগস্ট বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় মৌলভীবাজার শহরের কাজিরগাঁও টিকর বাড়ির টিলায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাজনগর উপজেলার ভাংগারহাট প্রাইমারি স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দুপুর ২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর ছেলে তাসনিম চৌধুরী নাঈম পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের রুহের মাগফিরাতের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।

ছাত্র আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক

আলাউর রহমান চৌধুরীর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে মৌলভীবাজারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ষাটের দশকের শুরু থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। স্কুলজীবনেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে। সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মৌলভীবাজার কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি ছাত্রসমাজের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মৌলভীবাজার কলেজ ছাত্র সংসদের মিলনায়তন সম্পাদক ছিলেন বলে তাঁর সহকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। সে সময় মৌলভীবাজারে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে তিনি শহীদ মিনার নির্মাণের সেই সময়কার নানা ঘটনা তুলে ধরেছেন।

ষাটের দশকের শেষভাগে পাকিস্তানি শাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন আলাউর রহমান চৌধুরী ছাত্রসমাজের আন্দোলনে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগের উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে তিনি মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বস্থানীয় কর্মী হিসেবে রাজপথের আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, তিনি ছিলেন সাবলীল বক্তা। অনর্গল বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল। কলেজজীবনেই তিনি সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।

Manual5 Ad Code

১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এর পরপরই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, মানুষকে সংগঠিত করা এবং স্বাধীনতার পক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাঁর ভূমিকার কথা দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা স্মরণ করেন।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও সক্রিয়

স্বাধীনতার পরও আলাউর রহমান চৌধুরীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল। তিনি মৌলভীবাজার জেলা বাকশালের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি তাঁকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে পরিচিত মুখে পরিণত করে।

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ব্যবসা ও সমাজসেবার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। একসময় প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনগরের কৃতিসন্তান

আলাউর রহমান চৌধুরী মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ভাংগারহাট গ্রামের মরহুম ইসমাইল আলী চৌধুরীর সন্তান। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে মৌলভীবাজার সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে এসএসসি পাস করেন।

এরপর মৌলভীবাজার কলেজের কলা বিভাগে ভর্তি হয়ে এইচএসসি ও ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ল’ কলেজে আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই সংগঠন ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ছাত্রজীবনেই তিনি নেতৃত্বের গুণাবলির পরিচয় দেন।

তাঁর জীবনের সঙ্গে মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, স্বাধিকার আন্দোলন, ছয় দফা ও ১১ দফার সময়কার ছাত্র আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—দেশের ইতিহাসের এসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন বলে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা জানান।

সহকর্মীদের স্মৃতিতে আলাউর রহমান

আলাউর রহমান চৌধুরীর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুসংবাদে দেশে ও প্রবাসে থাকা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, সাবেক ছাত্রনেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও মুক্তিযোদ্ধা এম এ মান্নান; মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন অব ওয়ার্ল্ডওয়াইডের ফাউন্ডার্স প্রেসিডেন্ট এবং গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র কেন্দ্রীয় কনভেনর মোহাম্মদ মকিস মনসুর; সংগঠনের সহসভাপতি জয়নাল আবেদিন খান; সাধারণ সম্পাদক এম মুহিবুর রহমান মুহিব এবং ট্রেজারার মোহাম্মদ মুজিব মনসুরসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পৃথক শোকবার্তায় তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, আলাউর রহমান চৌধুরী ছিলেন সৎ, নির্লোভ, পরোপকারী ও সদালাপী মানুষ। আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথচলায় তিনি ছিলেন একজন প্রবীণ সহযোদ্ধা। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে অবদান এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ মৌলভীবাজারের স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, আলাউর রহমান চৌধুরীর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারবাসী আন্দোলন-সংগ্রামের একজন প্রবীণ সহযোদ্ধাকে হারিয়েছে। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি সততা, মানবিকতা ও সমাজসেবার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সাদাসিধে জীবন, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে আলাউর রহমান চৌধুরী ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, সদালাপী ও হাস্যোজ্জ্বল মানুষ—এমনটাই স্মরণ করছেন তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিতজনেরা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারতেন তিনি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর সুনাম ছিল বলে সহকর্মীরা জানান।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাদাসিধে ও নিরহংকার। সমাজের মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

Manual5 Ad Code

তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারের অভিভাবককেই হারায়নি মৌলভীবাজার; স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন হারিয়েছে এমন একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্বকে, যাঁর জীবন জড়িয়ে ছিল দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে।

তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও স্বজনদের প্রত্যাশা—মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা এবং দীর্ঘ কর্মময় জীবনের নানা অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সংরক্ষিত ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুম আলাউর রহমান চৌধুরীর রুহের মাগফিরাতের জন্য দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত সকলের কাছে দোয়া কামনা করা হয়েছে।