প্রধানমন্ত্রী অামলাতন্ত্রের ওপরই ভরসা রাখছেন

প্রকাশিত: ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২০

Manual1 Ad Code

রাশেদ খান মেনন, ৩০ এপ্রিল ২০২০ : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থ-বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস-এ প্রকাশিত নিবন্ধে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

রাশেদ খান মেনন এমপি

প্রশংসা করা হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত, সেখানে ফোর্বস-এর মতো একটি পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রীর এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত পদক্ষেপের এই স্বীকৃতি সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। সবার প্রত্যয়দীপ্ত সম্মিলিত প্রয়াসকে বেগবান করবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই স্বীকৃতি দেশবাসীকে অনুপ্রেরণা জোগাবে, সন্দেহ নেই। তবে যে সম্মিলিত প্রয়াস বেগবান করার কথা বলা হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই অনেকাংশে পথভ্রষ্ট হয়েছে। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণের খবর প্রকাশের আগেই প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন জাতীয় কমিটির যে সভায় করোনাভাইরাসজনিত কারণে এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ অন্য অনুষ্ঠানাদি পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত হয়, সেই সভায় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নেওয়া ব্যবস্থাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্যসচিব সভাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে ডব্লিউএইচওর প্রটোকল অনুযায়ী সব প্রস্তুতি আছে। ওই সভার পর প্রস্তুতির ব্যাপারে তিন মাস কী অমূল্য সময় আমরা হারিয়েছি, তা নিয়ে অন্য একটি নিবন্ধে আমি লিখেছি। এখানে তার পুনরুক্তি করতে চাই না। তবে ওই মহামারি মোকাবিলায় যে ৫০০ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল, তার প্রধান হয়েও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় এই বলে প্রকাশ্যেই গণমাধ্যমে খেদোক্তি করেছিলেন যে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কোন ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা তিনি জানেন না। করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী যাঁকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর ওই অসহায়ত্ব কী প্রমাণ করে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে এখন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে কি না, বা সেই পরামর্শ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে ট্রাম্প পাগলামি করছেন, সেখানে তাঁকেও সহযোগিতা করছেন ড. ফাউসির মতো খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের দল। চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, অন্যান্য দেশেও সেটা লক্ষ করেছি। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি আমলাতন্ত্রের হাতে বন্দী। যার ফলে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা দূরে থাক, প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ নেই। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নেই।

এ ব্যাপারে একজন চিকিৎসকের বক্তব্য উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি করোনা চিকিৎসার বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘দেশের জনগণ তার চিকিৎসার প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করতে পেরেছে কি? দেশের রাজনীতিবিদগণ নিরূপণ করতে পেরেছেন কি সুচিকিৎসা সেবাদান বলতে কী বোঝায়? দেশের সরকার সঠিক সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিরূপণ করতে পেরেছেন কি? উত্তর হলো, না। যেখানে খোদ রাজধানী ঢাকায় অত্যাধুনিক নবনির্মিত হাসপাতালে (কুর্মিটোলা হাসপাতাল, কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল) সেন্ট্রাল অক্সিজেন, (এমনকি মেনিফ্লোট, Ñযা অনেক বেসরকারি ছোট হাসপাতালেও আছে সরাসরি অক্সিজেন সরবরাহের জন্য) করার প্রয়োজন বোধ করেনি। এই চিত্র শুধু এই দুটি প্রতিষ্ঠানের নয়, প্রায় সব সরকারি হাসপাতালের। জনগণ, রাজনীতিবিদ ও সরকার—এই তিন গোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা বলতে বোঝায় চিকিৎসকের উপস্থিতি। কিন্তু শুধু চিকিৎসকের উপস্থিতি দিয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, তা তারা কোনো দিন ভেবে দেখেনি আমলাতন্ত্রের সূক্ষ্ম কুচক্রে পড়ে।…সুচিকিৎসা বলতে বোঝায় চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যথাযথ সরবরাহ—যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, নার্সদের যথাযথ কার্যকর ভূমিকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অক্সিজেনসহ অন্যান্য কিছু ব্যবস্থার লেভেল অনুযায়ী জনবল ব্যবস্থা রাখা।’ আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তা রেখেছে কি?

Manual2 Ad Code

প্রশ্নটা এই কারণে যে করোনা চিকিৎসা কেবল নয়, কেবল করোনা পরিস্থিতিতে সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে চিকিৎসকেরা নিদারুণ প্রশ্নের সম্মুখীন। কিন্তু যেখানে আমলাতন্ত্র কেবল করোনা মোকাবিলা নয়, পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে তাদের মতো করে বাস্তবায়ন করে, তখনই প্রশ্ন আসে। এখানে একজন চিকিৎসকও যখন ওই জায়গায় বসেন, তখন আমলা হয়ে যান।

এর প্রমাণ চিকিৎসকদের পিপিই সরবরাহ ও এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ নিয়ে। প্রতিদিন ব্রিফিংয়ে বলা হচ্ছে, লাখ লাখ পিপিই, কিট আছে। সরবরাহও করা হচ্ছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে একজন চিকিৎসক মাস্ক না পাওয়ার কথা বললে স্বাস্থ্যসচিব ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। আর এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় স্বাস্থ্য দপ্তরের ব্রিফিংয়ে একজন কর্মকর্তা আইসিটি আইনে মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন পরপর দুই দিন।

Manual5 Ad Code

আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রতিদিন যে টেস্ট করানোর কথা বলেন, সেই টেস্টের কী অবস্থা? ডিএনসিসির একজন কর্মকর্তার টেস্টজনিত সমস্যা তার প্রমাণ। তাঁর সহকর্মীদের আপ্রাণ প্রচেষ্টার পরও মৃত্যুর আগে তাঁর টেস্ট করাতে পারেননি, চিকিৎসা দূরে থাক। এটা তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ঢাকার বাইরের সন্দেহভাজন করোনা সংক্রমিত ব্যক্তিকে ঢাকায় পাঠাতে বলা হয়েছে। ঢাকায় এসে রোগী অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছে। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো আছি।

এ তো গেল স্বাস্থ্যসেবা। সাধারণ ব্যবস্থাপনাও আমলাতন্ত্রের বাঁধনে আটকা। যখন ২৬ মার্চ ছুটি ঘোষণা করা হলো, তখন সংবাদ সম্মেলনে মুখ্য সচিব বেশ ভারিক্কি চালেই বললেন, ‘লকডাউন’ আন-সায়েন্টিফিক। ওটা হবে ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’। এমন সামাজিক দূরত্ব তৈরি হলো যে মানুষ ছুটি পেয়ে হুড়মুড় করে গ্রামে ছুটল। কেউবা বিনোদনের জন্য বউ-বাচ্চা নিয়ে কক্সবাজারে। পরে সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিন মন্ত্রী ছুটলেন রেল, নৌযান আর গণপরিবহন বন্ধ করতে। ইতিমধ্যে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। প্রথমে স্বীকার না করলেও যখন কিছু বেশি টেস্ট করায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল, রোগতত্ত্ব বিভাগ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিরস বদনে ঘোষণা দিলেন ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ হয়ে গেছে।

আর কর্মহীন মানুষের জন্য ত্রাণ? প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন সবার কাছে খাবার পৌঁছাতে। মাধ্যম এখানেও ডিসি মহোদয়। ঢাকা মহানগরে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের হুকুম দেওয়া হলো, ৫০০ জনের তালিকা করো। কাউন্সিলরদের ঘুম হারাম। কার কোথায় কী প্রয়োজন, জানা নেই। ঢাকার ১৬ এমপি কেউ কিছু জানেন না। তাঁদেরও ঘুম হারাম। ব্যক্তিগত আর দলগত উদ্যোগে তাঁরা মানুষের কাছে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। তাঁদের দায় রয়েছে জনগণের প্রতি। কিন্তু কোথাও তাঁদের উপস্থিতি নেই। পত্রিকার জাঁদরেল কলাম লেখক লিখলেন ‘এমপি সাহেবরা কি আন্ডারগ্রাউন্ডে’। এই সমস্ত বিষয়কে সমন্বয় করার জন্য ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে সমন্বয়ক করা হলো। ঢাকার যিনি দায়িত্বে, তিনি অনুগ্রহ করে এমপিদের আহ্বান করলেন সমন্বয় সভার। জুম অ্যাপে অনুষ্ঠিত সভায় এমপিরা জানলেন, ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাঁদের ত্রাণ বিতরণ কমিটির উপদেষ্টা বলা হলেও এ ধরনের প্রজ্ঞাপন তাঁরা পাননি। কোনো বিষয়ই তাঁরা জানেন না। তাঁদের বক্তব্য, আস্থায় না নেন, কিন্তু বদনামের ভাগী করবেন না।

আর রেশন কার্ড? প্রধানমন্ত্রীর একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ, যা ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষদের এই মুহূর্তে সহায়তা করবে। কিন্তু সেখানে বলা হলো, দুই দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। আর তালিকা ভাগ হয়ে গেল পদ-পদবির ভিত্তিতে। দুই দিনের মধ্যে দিতে গিয়ে যাঁকে হাতের সামনে পাওয়া গেছে, তাঁর নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হলো তালিকায়। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর রেশন কার্ড প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর দরকার নেই।

Manual8 Ad Code

প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় তাঁর সাহসী সব প্রয়াসে আমলাতন্ত্র, সে সামরিক-বেসামরিক হোক, এর ওপর ভরসা রেখেছেন। রাজনৈতিক দল, এমপি এখানে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ কি না, বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে তা উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিতে আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিলেন। তাঁর ওই পদক্ষেপ সম্পর্কে রাজনৈতিক বিরোধিতা-বিতর্ক আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন কীভাবে আমলাতন্ত্র তাঁকে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। দেশ গড়ার তাঁর প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী সেই আমলাতন্ত্রের ওপরই ভরসা রাখছেন। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন।

Manual7 Ad Code

রাশেদ খান মেনন এমপি : সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ