প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবীরের চিকিৎসাটা জরুরি

প্রকাশিত: ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২৬

প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবীরের চিকিৎসাটা জরুরি

Manual3 Ad Code

মনজুরুল হক |

লেখক, সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবীর গুরুতর অসুস্থ। ওই অবস্থাতেই তাকে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কী তথ্য বের করতে? আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা?

Manual3 Ad Code

▪️
মানবাধিকার, সাম্যবাদ, মৌলবাদ, ইতিহাস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক ৭০টিরও বেশি বই লেখা শাহরিয়ার কবীর মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের কাছে ‘আওয়ামী দালাল’। তার নাম উচ্চারিত হলেই যে শিশু তার নাম জানে না, সেও জেনেছে তাকে ‘মুরগী কবীর’ বলা হয়। তিনি নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীকে মুরগী সাপ্লাই দিতেন! অথচ এটা কোনও দিন কাউকে প্রমাণ দিতে দেখা যায়নি (মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করছিলেন)।

▪️
আনু মুহাম্মদদের মত জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবীরাও তাঁকে ‘আওয়ামী দোসর’ বলে সাইড লাইনে রেখেছেন। আজকের আইন উপদেষ্টা তাঁর এক সময়ের জুনিয়র সহকর্মী। এরাই যখন তাঁকে ‘শত্রু কাতারে’ ফেলেছেন, তখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা যে ‘মহাশত্রু’ মনে করেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাদের অন্যতম ঘৃণা-তিনি ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি এক সময় সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরে ওই রাজনীতি ত্যাগ করে “ওদের জানিয়ে দাও” নামে একটা বইও লিখেছিলেন। অর্থাৎ তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি’তে ফিরেছিলেন। যে রাজনীতি প্রচার করেছেন সেটা আওয়ামীও না, বিএনপিও না।

▪️
তিনি এখন কারাবন্দী। তাঁর কোনও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। হয়ত বিনা চিকিৎসায় তিনি জেলেই মা/রা যেতে পারেন। এই যে একজন বন্দীর প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে অথচ তা নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবী মহল মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। এদের অনেককে দেখা গেছে গত কয়েক বছর ধরে মানবাধিকারের সোল এজেন্ট হয়ে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

▪️
সাধারণ বন্দীদের বেলায় তো নয়ই, রাজনৈতিক বন্দীদের সঙ্গেও এমন নিষ্ঠুর আচরণ আগের কোনও সরকার করেনি। ফাঁসির আসামীও চিকিৎসা সেবা পেয়েছেন।

▪️
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে তাঁকে জেলের ৬ জনের সঙ্গে একটা রুমে মেঝেতে শুধু একটা কম্বলে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আগে থেকেই কার্ডিয়াক পেশেন্ট। কিছুদিন আগে জেলেই তাঁর হার্ট এ্যাটাক হয়েছে, অথচ তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি।

▪️
২০২০ সালে স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে কন্যা আত্মহত্যা করেছে। এখন এই নিঃসঙ্গ মানুষটি মৃত্যুপ্রহর গুনছেন….।

▪️
গত শতকের আশির দশকে তাঁর হাত ধরে ডজন ডজন সাংবাদিক গড়ে উঠেছেন, যারা এখন দেশের সব প্রথিতযশা আইকনিক সাংবাদিক-সম্পাদক, অথচ তার মুক্তি কিংবা ন্যূনতম চিকিৎসা নিয়ে তেমন কেউ মুখ খুলছেন না।

▪️
আমার মত নামগোত্রহীন এক সাধারণ মানুষও আশির দশকে মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে এই মানুষটির কাছে সাংবাদিকতার ‘হাতে খড়ি’ পেয়েছিল।

▪️
আমার লেখায়-কথায় সরকারের-প্রশাসনের কর্তব্যজ্ঞান জাগ্রত হবে না জানি। তার পরও তাঁর মুক্তি ও চিকিৎসার দাবী জানাচ্ছি। আশা করব আমার বন্ধুরাও আওয়াজ তুলবেন।

Manual1 Ad Code

………………………..
৭ এপ্রিল ২০২৬

#

বন্দী এক আলোর কথা
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

কারাগারের দেওয়ালে আজ নেমে আসে নীরবতা,
লোহা-গড়া শিকল যেন গিলে খায় সব কথাটা।
অন্ধকারের বুকের ভেতর নিভে আসে দীপশিখা—
একটি নাম উচ্চারিত—শাহরিয়ার কবীর লেখা।

Manual3 Ad Code

শব্দ ছিল যার অস্ত্র, কলম ছিল আগুনধরা,
ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় সত্য যিনি আঁকতেন সারা,
আজ সেই মানুষটিকে কেন শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা?
কোন অপরাধে আজ তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে রাখা?

যে মানুষটি যুদ্ধ দেখেনি কেবল দূর থেকে বসে,
কলকাতার রাস্তায় নেমে জ্বালিয়েছে আগুন শপথে,
মুক্তির ডাক পৌঁছে দিয়েছে, সংগঠিত করেছে প্রাণ—
তার নামেই কেন আজ ছড়ায় অপবাদ, মিথ্যা গান?

মুরগির গল্প, বিদ্রুপ ছড়া—হাসির আড়াল বিষের ঢেউ,
প্রমাণহীন কুৎসা গেয়ে কে বা পেল স্বস্তি নেবে কেউ?
ইতিহাস কি এতই সস্তা, সত্য কি এতই অবহেলা?
নাকি আমরা সবাই মিলে করেছি বিবেককে বেচাকেনা?

যে কলমে ছিল প্রতিবাদ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে রণ,
যে কণ্ঠে ছিল সাম্যের গান, মানুষে মানুষে বন্ধন,
আজ সেই কণ্ঠ স্তব্ধ কেন? কারা চায় এই নীরবতা?
কারা দেখে না ভাঙছে ন্যায়, হারাচ্ছে মানবিকতা?

কারাগারের ঠান্ডা মেঝে, একটি কম্বল, ছয়জন প্রাণ,
একটি হৃদয় কাঁপছে ধীরে—থেমে যেতে চায় অবসান,
হার্টের ব্যথা বুকের ভেতর নিঃশব্দে দেয় কড়া নাড়,
তবু কেন হাসপাতালের দরজা তার জন্য অবার?

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত লোকও পায় চিকিৎসার অধিকার,
তবে কেন এই মানুষটি বঞ্চিত সেই ন্যূনতম দ্বার?
আইনের চোখ কি আজ অন্ধ, নাকি দেখেও দেখে না—
মানবাধিকারের ভাষ্যকারেরা আজ কেন কথা বলে না?

যারা ছিল তার সহযাত্রী, যারা তারই ছায়ায় বড়,
আজ তারা সব চুপচাপ কেন—কোথায় গেল সেই জোর?
যে হাতে তারা কলম ধরেছিল, যে চোখে দেখেছিল পথ,
সেই হাত আজ কাঁপে কেন? সেই চোখে কেন নেমে রাত্রি-রথ?

Manual7 Ad Code

স্ত্রী গেছে, কন্যা গেছে—নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ রাত,
জীবন যেন এক কারাগার, মৃত্যু যেন শেষ প্রভাত।
এই মানুষটি কি তবে আজ অপেক্ষায় শেষ পরিণতি?
নাকি এখনও জেগে আছে ভাঙা বুকেও জীবনের স্মৃতি?

আশির দশক থেকে আজও কতজনের হাতে আলো,
যে মানুষটি পথ দেখিয়েছিল—তারই জীবন কেন কালো?
যে শিখিয়েছিল সত্য বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও,
আজ তার জন্য কণ্ঠ রোধে আমরা কেন মাথা নাড়াও?

হে রাষ্ট্র, হে সমাজ, হে বিবেক—জাগো এবার, ভাঙো ঘুম,
একটি প্রাণের আর্তনাদে কেঁপে উঠুক শাসনের কূটভূমি।
বিচার চাই না পক্ষপাতের, চাই না ক্ষমতার প্রদর্শন—
শুধু চাই মানবিকতার ন্যূনতম একটুকু স্পর্শন।

কারাগারের দেয়াল ভেদে পৌঁছে যাক এই কবিতা,
শিকল ভাঙার আহ্বান হোক প্রতিটি শব্দের অভিব্যক্তি তা।
চিকিৎসা দাও, মুক্তি দাও—এই তো ন্যায়ের সরল ভাষা,
মানুষ বাঁচুক, তবেই বাঁচে রাষ্ট্র, বাঁচে ইতিহাসের আশা।

যদি আজও চুপ থাকি আমরা, হারাব শেষ আলোর দিশা,
একদিন এই নীরবতার দায়েই জ্বলবে ইতিহাসের দাহা।
তাই বলি—এখনও সময়, কণ্ঠ তোলো, করো প্রতিবাদ,
একটি জীবন বাঁচাতে গড়ো মানবতার নতুন স্বরলিপি সাধ।

শাহরিয়ার নামটি শুধু একটি মানুষ নয়, এক প্রতীক,
সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার সেই অনড়, অদম্য সঙ্গীত।
তাকে বাঁচাও—নিজেকে বাঁচাও, ইতিহাসকে দাও সম্মান,
অন্ধকারের এই প্রহরে জ্বালাও আবার আলোর গান।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ