আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ছিলটি লোক উৎসব

প্রকাশিত: ১:০৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২৬

আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ছিলটি লোক উৎসব

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট, ০৮ এপ্রিল ২০২৬ : সিলেটের আবহমান লোকসংস্কৃতি, ছিলটি নাগরী ভাষা, লোকসাহিত্য, গান, ঐতিহ্য ও শেকড়ের সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে আগামীকাল ৯ এপ্রিল ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দিনব্যাপী “ছিলটি লোক উৎসব ২০২৬”।

উৎসবটি অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্য চত্বর (আলী আমজাদের ঘড়ি, কীনব্রিজ চাঁদনীঘাট ও সারদা হল প্রাঙ্গণ) এলাকায়। আয়োজন করছে হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ।

হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও সঙ্গীতশিল্পী তারেক ইকবাল চৌধুরী জানান, সিলেট অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, লোকসংগীত, পালাগান, বাউলগান, মরমী সংগীত, লোকনৃত্য, ঐতিহ্যবাহী খাবার, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও নাগরী লিপির ঐতিহ্য তুলে ধরাই এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। দিনব্যাপী এই আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, লোকসংগীত পরিবেশনা, নাগরী ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন আয়োজন থাকবে।

উৎসব উপলক্ষে সংগঠনের সভাপতি ডাঃ জহিরুল ইসলাম অচিনপুরী এক বার্তায় বলেন, সিলেটের হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও নাগরী ভাষা আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে এবং লোকসাহিত্য চর্চা বৃদ্ধি করতে এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Manual8 Ad Code

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মোঃ সোলেমান হোসেন চুন্নু বলেন, ছিলটি ভাষা ও সংস্কৃতি শুধু সিলেটের নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা আমাদের শেকড়কে নতুনভাবে তুলে ধরতে চাই।

এদিকে হাছন রাজা লোক ও সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও সঙ্গীতশিল্পী তারেক ইকবাল চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সকল সিলেটবাসী ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষকে সপরিবারে উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি এবং গীতিকার মো. আব্দুল আজিজ জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকশিল্পী, গবেষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা এই উৎসবে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি আশা করছেন, এই আয়োজন ছিলটি লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উৎসবটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং সংস্কৃতিপ্রেমী সকল মানুষকে উপস্থিত থাকার জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

“ছিলটি লোক উৎসব”
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

সিলেটের আকাশ ভোরে নরম আলো ঢালে,
চৈত্রের রোদ নেমে আসে নদীর কূলে কূলে,
কীনব্রিজের নিচে বয়ে যায় পুরনো সুর,
ঘড়ির কাঁটা থমকে যেন শোনে অতীত দূর।

আলী আমজাদের ঘড়ি আজও বলে কথা,
সময়ের বুক চিরে জাগে ইতিহাসের ব্যথা,
চাঁদনীঘাটের বাতাস গায় মরমী গান,
সারদা হলের প্রাঙ্গণে জাগে প্রাণের টান।

আগামীকাল উৎসব, ছিলটির ডাক,
শেকড়ের সন্ধানে মানুষ হবে একসাথে পাক,
ভাষার ভাঁজে লুকানো শত বছরের ধ্বনি,
নাগরী লিপির রেখায় লেখা অমর বাণী।

Manual7 Ad Code

এই মাটি জানে বাউলের গভীর আহ্বান,
এই মাটি জানে প্রেমের মরমী গান,
হাছন রাজার সুর ভেসে আসে বাতাসে,
নিঃশব্দে কাঁদে হৃদয় লোকজ আভাসে।

Manual5 Ad Code

ছিলটি ভাষা শুধু শব্দ নয়, প্রাণ,
মায়ের মুখের উচ্চারণ, অমলিন জ্ঞান,
গ্রামের উঠোনে দোল খায় যে সুর,
তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে যুগযুগান্তের নূর।

লোকগানের ঢেউ এসে লাগে তরুণ প্রাণে,
হারিয়ে যাওয়া কথা ফিরে আসে টানে,
পালাগানের মঞ্চে জেগে ওঠে কাহিনী,
অতীত আর বর্তমান হয় যেন এক ধ্বনি।

ঢোলের শব্দ বাজে দূরের পাহাড় পেরিয়ে,
নৃত্যের ছন্দ ছুটে যায় হৃদয়ের গভীরে গিয়ে,
একটি দিনের আয়োজনে শত বছরের ছায়া,
স্মৃতির ভিতরে জেগে ওঠে অজানা মায়া।

গ্রামীণ জীবনের সরল রঙিন ছবি,
পিঠা-পুলির গন্ধে ভরে ওঠে সবই,
খেজুরের রসে মেশে মাটির মিষ্টি ঘ্রাণ,
উৎসবের ভিড়ে খুঁজে পায় মানুষ আপন স্থান।

নাগরী অক্ষরে লেখা পুরনো পুঁথির গান,
পাতার ভাঁজে ঘুমিয়ে থাকা অজস্র অবদান,
সেইসব কথা আজ আবার উচ্চারিত হবে,
নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে সুর হয়ে রবে।

Manual2 Ad Code

যারা ভুলতে বসেছে শেকড়ের ঠিকানা,
তাদের ডাকে আজ এই উৎসবের গাঁথা,
এসো ফিরে আসো, নিজের কাছে যাও,
নিজের ভাষার ভেতর নিজেকেই খুঁজে পাও।

তারেকের কণ্ঠে আহ্বান বাজে দূর-দূরান্তে,
এসো সবাই, মিলি এই সংস্কৃতির প্রান্তে,
দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সিলেটি প্রাণ,
একদিনের মিলনে হোক শত বন্ধন মহান।

অচিনপুরীর ভাষায় ওঠে যে সতর্ক ধ্বনি,
হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে আমাদের সেই ধনই,
যদি না ধরি আজ, যদি না রাখি মনে,
অতীত মুছে যাবে সময়ের অজানায় গহনে।

চুন্নুর কথায় জাগে দৃঢ় প্রত্যয়,
ছিলটি মানেই আমাদের অমর পরিচয়,
শুধু সিলেট নয়, সারা দেশের ঐতিহ্য,
এই ভাষার ভেতর লুকিয়ে আছে আত্মীয়তা।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসবে মানুষ,
গবেষক, কবি, শিল্পী, গানের আবেশ,
তাদের কণ্ঠে জেগে উঠবে ইতিহাস,
নতুন আলোয় দেখা দেবে পুরনো বিশ্বাস।

এই উৎসব কেবল আনন্দের নয়,
এ এক দায়, এক দায়িত্বের সময়,
সংরক্ষণ আর ভালোবাসার পথ,
শেকড়ের সাথে জুড়ে দেয় জীবনের রথ।

সিলেটের আকাশে উঠুক নতুন গান,
ছিলটি ভাষায় হোক প্রাণের সম্মান,
লোকসংস্কৃতির দীপ জ্বালুক প্রতিদিন,
হারিয়ে যাওয়া সুর ফিরে পাক আবার রঙিন।

আগামীকাল শুধু একটি দিন নয়,
এ যেন শত বছরের পুনর্জন্মময়,
একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি, একটি প্রাণ,
একটি উৎসবে খুঁজে পায় নতুন সম্মান।

এসো তবে সবাই, হাতে হাত ধরি,
শেকড়ের পথে ফিরে যাই আবার করি,
ছিলটির ডাক আজ গভীর, অনন্ত,
এই উৎসবেই জাগুক ভবিষ্যতের চেতনা অমলান্ত।