বেগম রোকেয়ার সুলতানা’স ড্রিম

প্রকাশিত: ২:৩৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২২

বেগম রোকেয়ার সুলতানা’স ড্রিম

Manual5 Ad Code

ফরিদ অাহমেদ |

দুই দিনের জন্য সরকারী সফরে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। বাড়িতে একা ছিলেন তিনি ফলে, সময় কাটানোর জন্য লেখাটা লিখেছিলেন। লেখার সময়ে হয়তো বুঝতেও পারেননি যে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম লেখাটা তিনি লিখে ফেলেছেন ওই সময়ে।

সেটা ১৯০৫ সাল। যাঁর কথা বলছি, তিনি বেগম রোকেয়া। সরকারী সফর শেষে বাড়িতে ফিরে এসে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়াকে মজার ছলে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমার অবর্তমানে আপনি কী করছিলেন?’ এর উত্তরে তিনি স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায় লেখা একটা ক্ষুদ্রাকৃতির পাণ্ডুলিপি। নাম ‘সুলতানা’স ড্রিম। ইংরেজিতে লেখা বলে এটাকে তাঁর স্বামী ভাগলপুরের ইংরেজ কমিশনার ম্যাকফারসনের কাছে নিয়ে যান দেখে দেবার জন্য। সেই লেখা পড়ে এর গায়ে সামান্যতম আঁচড় কাটেননি কমিশনার ম্যাকফারসন। পাণ্ডুলিপি ফেরত দিয়ে একটা সংযুক্ত পত্রে তিনি লিখেছিলেন, “The ideas expressed in it are quite delightful and full of originality and they are written in perfect English.”

এই বইয়ের ইংরেজি ভাষার বিশুদ্ধতার বিষয়ে বাঙালি পাঠকেরাও অবগত ছিলো। সাধনা পত্রিকাতে বইটার একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন আবুল হুসেন। তিনি সুলতানা’স ড্রিমের বিশুদ্ধ ইংরেজির বিষয়ে লেখেন, “পুস্তিকাখানি যেরূপ সুমার্জিত বিশুদ্ধ ইংরেজী ভাষায় লেখা, সেরূপ ভাষা আয়ত্ত করা আমাদের অনেক ইংরাজী-শিক্ষিত যুবকের পক্ষে কঠিন।”

Manual6 Ad Code

১৯০৫ সালেই মাদ্রাজের দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় সুলতানা’স ড্রিম। ১৯০৮ সালে এটা পুস্তকাকারে বের হয়ে আসে। ১৯২২ সালের এটার বাংলা অনুবাদ করেন বেগম রোকেয়া নিজেই। নামকরণও করা হয় আক্ষরিকভাবেই, ‘সুলতানার স্বপ্ন’।

Manual2 Ad Code

চন্দ্রালোকিত এক রাতে, স্বপ্ন দেখেছিলো তন্দ্রার মাঝে, নাকি জাগ্রত অবস্থায়, সে বিষয়ে সুলতানা নিজেও নিশ্চিত ছিলো না। শুধু স্বপ্নের ব্যাপারেই অনিশ্চয়তা না, তার বিছানার পাশে যে ইউরোপিয়ান নারীকে সে দেখেছিলো, তাকেও তার পূর্ব পরিচিতা ভগিনী সারা বলে মনে হয়েছিলো। স্বপ্নের এই ভগিনী সারার আমন্ত্রণে তার বাগান দেখার জন্য বের হয়েছিলো সুলতানা।

ভ্রমণ করতে গিয়ে আশ্চর্য ঘটনাসমূহ ঘটতে থাকে। সুলতানা বুঝতে পারে এটা তার পরিচিত দার্জিলিং নয়। অচেনা এক দেশ। এমনকি সময়েরও গড়মিল রয়েছে সেখানে। রাত নয়, বরং দিনের আলোতে বাইরে ঘুরছে তারা দু’জনে অচেনা শহরে। নগরের সমস্ত রাস্তা পরিণত হয়ে গিয়েছে জনারণ্যে। প্রকাশ্য দিনের বেলাতে নগরের রাস্তায় হাঁটছে বলে সংকুচিতবোধ করছিলো সুলতানা। নিজ নগরীতে পুরুষদের সামনে অবগুণ্ঠন ছাড়া চলাফেরার স্বাধীনতা তার নেই। এখানেও সেই একই নিয়ম হবে, সেটাই ভেবেছিলো সে।

কিন্তু, অবাক বিস্ময়ে সুলতানা দেখে নগরের কোথাও কোনো পুরুষ নেই। ব্যস্ত হয়ে যারা চলাফেরা করছে, এদিক ওদিক যাচ্ছে, তারা সকলেই নারী। তার ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থা দেখে ভগিনী সারা তাকে আশ্বস্ত করে এই বলে যে এখানে কোনো পুরুষের মুখোমুখি হবার সুযোগ সুলতানার নেই। দেশটার নাম নারীস্থান। এখানে নারীরাই সর্বেসর্বা। তারাই বাইরে আসে, বাইরের কাজ করে। পুরুষেরা থাকে অন্তঃপুরে।

পুরুষরা অন্তঃপুরে থাকে বলেও নারী স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করে বাইরে। সব গৃহকর্ম করে পুরুষ। কলকারখানায় শারীরিক পরিশ্রমের কাজের দায়িত্বও তার। নারী খাটায় তার মন এবং মস্তিষ্ক। শারীরিক শক্তিতে পুরুষ নারীর চেয়ে শক্তিশালী হলেও, নারীস্থানে নারীর মর্যাদা উচ্চে। নারীস্থানে কোনো অপরাধ নেই, অশান্তি নেই, নেই কোনো কলহ–বিবাদ।

Manual7 Ad Code

এগুলো যারা করে, সেই পুরুষরাই রয়েছে ঘরে বন্দি। এই বন্দিত্ব তারা এমনি এমনি মেনে নেয়নি। মেনে নিয়েছে নিজেদের চরম ব্যর্থতার কারণে। পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে এক অন্যায় যুদ্ধে দলে দলে যখন দেশের পুরুষ সৈনিকেরা আহত এবং নিহত হতে থাকলো, পরাজয় এবং বিপর্যয় যখন সুনিশ্চিত, ঠিক সেই সময়ে দেশ রক্ষার জন্য এগিয়ে এলো দেশের দুই হাজার নারী স্বেচ্ছাসেবী। তাদের কাছে কোনো প্রচলিত অস্ত্র ছিলো না; ছিলো না কোনো সামরিক প্রশিক্ষণও। প্রচলিত যুদ্ধের বদলে তাই তারা বেছে নিয়েছিলো বুদ্ধিদীপ্ত এক উপায়কে। বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ জ্ঞানে তারা এক সূর্যের শক্তিকে সহস্র সূর্য তাপে রূপান্তরিত করেছিলো। সেই তীব্র উত্তাপে শত্রুরা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো।

Manual8 Ad Code

নারীরা যুদ্ধে অংশ নেবার আগেই শর্ত দেওয়া হয়েছিলো পুরুষদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করার। তারা প্রবেশ করেছিলো। যুদ্ধ জয়ের পরে অবশ্য বাইরে আসার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু সেই সুযোগ আর তাদের দেওয়া হয়নি। বাইরের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে নিয়ে নিয়েছে নারীরা, নারীস্থানের স্বাধীন এবং স্বনির্ভর নারীরা নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা আর শুভ চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছে এক কল্যাণকর রাষ্ট্র। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সেটাকে করা হয়েছে সমৃদ্ধ এবং সম্পদশালী। এখানে চাষাবাদের জন্য মেঘ থেকে সংগ্রহ করা হয় পানি আর সূর্যকিরণ থেকে সংগৃহীত হয় জ্বালানি।

নারীর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সুলতানার স্বপ্ন এক অভিনব প্রচেষ্টা। তাঁর সময়ে সমাজটাকে যেভাবে পুরুষরা নিয়ন্ত্রণ করেছে, নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নিয়ে নারীদের অন্তঃপুরে বন্দী করেছে, অবগুণ্ঠিত করেছে, সেটাকেই একেবারে উল্টো করে দিয়ে নতুন এক সমাজের কল্পনা করেছেন রোকেয়া। এই অঞ্চলে তাঁর মতো করে এভাবে কেউ ভাবেনি। আমাদের সমাজে এটা একটা অভিনব প্রচেষ্টা হলেও, গোলাম মুরশিদ এটাকে মৌলিক ভাবনা মনে করেন না। তিনি তাঁর “নারী প্রগতির একশো বছরঃ রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া” বইতে লিখেছেন, “Sultana’s Dream – এ যে নারীস্থান এবং নারীর আধিপত্যের কল্পনা, তা অভিনব অথবা মৌলিক নয়। এরিস্টোফেনিসের Lysistrata এর সর্বপ্রথম নিদর্শন, খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে। উপন্যাসে এভাবের প্রতিফলন ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে একেবারে অনুপস্থিত নয়। তৎসত্ত্বেও বলা যায়, Sultana’s Dream নামে স্বপ্ন, উচ্চতর কোনো দাবি বা ভানও নেই লেখিকার, তবু তাঁর স্বপ্ন একেবারে আজগুবি নয়। বরং তাঁর মধ্যেও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত প্রতিবিম্বিত। ইতিমধ্যে মহিলাদের সামাজিক এবং পারিবারিক ভূমিকায় যে বিবর্তন এসেছে, তা থেকে এই মন্তব্যই সমীচীন।”

পুরুষের আধিপত্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত এবং ক্ষুব্ধ রোকেয়া কি প্রতিশোধ নিয়ে চেয়েছিলেন এর মাধ্যমে পুরুষদের বিরুদ্ধে? বাস্তবে যে প্রতিশোধ সেই সময়ে তাঁর পক্ষে নেওয়া সম্ভব ছিলো না, সেটাকে তিনি অলীক এক রাজ্য কল্পনা করার মাধ্যমে সম্ভব করে তুলেছিলেন। এ কারণেই হয়তো তিনি যখন লেখাটা তাঁর স্বামীকে দেখিয়েছিলেন, তিনি মন্তব্য করেছিলেন এই বলে ‘এ দেখি নির্মম এক প্রতিশোধ’। হুমায়ুন আজাদ তাঁর নারী গ্রন্থে লিখেছেন, “পঁচিশ বছরের এক আমূল নারীবাদী তরুণীর নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ, যা কোমলমধুর কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষমাহীন নির্মম। রোকেয়া ব্যাপকভাবে নারীস্থানের সমাজজীবন উপস্থাপিত করেন নি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করেছেন পুরুষদের। পুরুষের ওই দেশে কী প্রয়োজন, তা তিনি বলেন নি; তবে প্রতিশোধগ্রহণের জন্য পুরুষদের অত্যন্ত দরকার ছিলো সেখানে। রোকেয়া পুরুষজাতিটিকেই বাদ দিতে পারতেন ওই সমাজ থেকে, কিন্তু তিনি দেন নি; তিনি হয়তো মনে করেছেন সামাজিকভাবে পুরুষ দরকার, তবে তার চেয়ে বেশি দরকার পুরুষপীড়নের জন্যে।”

নারীর অধিকার আদায়ের অভিনব পন্থা ছাড়াও, ‘সুলতানা’স ড্রিম’ আরেক কারণেও অবিস্মরণীয়। বাংলায় লেখা এটাই প্রথম সায়েন্স ফিকশন। যদিও এটাকে সেভাবে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর লেখা ‘পলাতক তুফান’ গল্পটি। যদিও রোকেয়ার বইটা প্রকাশ হয়েছে ‘পলাতক তুফান’ লেখার অনেক বছর আগেই।

পুরুষের সৃষ্ট কারাগার থেকে বের হয়ে আসা এবং সেই কারাগারে পুরুষদেরই আটকে ফেলার জন্য নারীস্থানের মেয়েরা ব্যবহার করেছিলো বিজ্ঞানকে। পুরুষদের অন্তঃপুরে পাঠানোর পরেও তাদের সেই বিজ্ঞাননির্ভরতা কমেনি। শিক্ষা ও বিজ্ঞানই সব সমস্যার সমাধান, এই মতবাদে বিশ্বাসী রাজ্যের রানীর উৎসাহ ও আদেশে মেয়েদের জন্য অসংখ্য স্কুল ও দু’টো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলো। একটিতে সূর্যালোক ও সূর্যতাপের গবেষণা এবং নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করে ঘরবাড়ি আলোকিত এবং রান্নার কাজ সহজ করা হলো। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি পানি-বেলুন নির্মাণ করে আকাশ থেকে পানি সংগ্রহ ও সঞ্চিত করে দেশকে খরার হাত থেকে বাঁচালো। এর ফলে দেশে কৃষি-ফলন বাড়লো। নারী বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বায়ুযানে অল্প সময়ে অধিক দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। বায়ুযানের কারণে কোনো সড়ক বা রেল দুর্ঘটনা ঘটে না।

রোকেয়া যে সময়ে এই বৈজ্ঞানিক কল্পনা গুলো করেছেন, সেই সময়টাকে চিন্তা করলে বিস্মিত হতেই হয়। তিনি যে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারসমূহের বিষয়ে অবগত ছিলেন, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। একই সাথে তাঁর কল্পনাপ্রবণতাকেও সাধুবাদ দেওয়া লাগে। তিনি যখন বায়ুযানের কল্পনা করেছেন, তখন তিনি স্বচক্ষে বিমান দেখেন নাই। বিমান দেখেছেন তিনি আরো কয়েক বছর পরে। আর বিমানে ভ্রমণ করেছেন ‘সুলতানা’স ড্রিম লেখার পঁচিশ বছর পরে। ১৯৩০ সালে তিনি তাঁর বিমানচালক ভাইপো মুরাদের সাথে পঞ্চাশ মাইল ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তাঁর ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’ প্রবন্ধে লেখেন, “২৫ বৎসর পূর্বে লিখিত ‘সুলতানার স্বপ্নে’ বর্ণিত বায়ুযানে আমি সত্যই বেড়াইলাম। বঙ্গের প্রথম মুসলিম পাইলটের সহিত যে অবরোধ-বন্দিনী নারী উঠিল সে আমিই।”

সবশেষে বলবো, নারীর অধিকার বা নারীবাদ নিয়ে যাঁরা পড়ালেখা করেন কিংবা কাজ করেন, তাঁদের জন্য রোকেয়ার লেখা ‘সুলতানা’স ড্রিম’ একটা অবশ্য পাঠ্য গ্রন্থ। এটাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম পরিপূর্ণ নারীবাদী সাহিত্য। শুধু প্রথম বললেও ভুল হবে, এখন পর্যন্ত এটাই অন্যতম সেরা একটা কাজ। এর আগে যে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়নি, তা নয়। তবে, এমন পরিপূর্ণভাবে আর এমন অভিনবভাবে আগে কেউ বলেনি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ