বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ, জুন ৫, ২০২৬

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৫ জুন ২০২৬ : আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি।

পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী এ দিবস পালন করা হয়।

বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার বিশ্ববাসীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিবেশগত সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবজাতির অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থেই পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক, জলবায়ু সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Manual3 Ad Code

দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি, সেমিনার, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার আয়োজন করেছে।

রাজধানীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবিষয়ক কুইজ, বিতর্ক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিবেশ রক্ষায় শুধু একদিনের কর্মসূচি যথেষ্ট নয়; বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সারা বছর পরিবেশবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এবং কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বর্ষণ এবং তীব্র গরম জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে দেশটিকে। এ কারণে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

প্লাস্টিক দূষণ ও নগর পরিবেশের সংকট

পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক দূষণ। নদী, খাল, সমুদ্র ও নগর এলাকার উন্মুক্ত স্থানে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

Manual3 Ad Code

অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং শব্দদূষণের কারণে দেশের বড় শহরগুলো পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ বিশ্বের অন্যতম উদ্বেগজনক সমস্যার মধ্যে রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে।

Manual3 Ad Code

ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সূচনা হয় পরিবেশ রক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে। ১৯৬৮ সালের ২০ মে সুইডেন সরকার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কাছে পরিবেশ দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

পরবর্তীতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন (United Nations Conference on the Human Environment)। এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম বৃহৎ আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন। সম্মেলনের গুরুত্ব বিবেচনায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫ জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

যদিও দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৭২ সালে, প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় ১৯৭৪ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য এবং আয়োজক দেশের মাধ্যমে দিবসটি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে।

পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবেশ সুরক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বৃক্ষরোপণ, জলাশয় সংরক্ষণ, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশবিদদের বার্তা— প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানই হতে পারে মানবজাতির টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং পরিবেশ ও মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বৈশ্বিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও দিবসটির গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, সবুজ ও টেকসই ভবিষ্যৎ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ