অবসরের গান: যদ্যপি আহমদ ছফা

প্রকাশিত: ৫:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২২

অবসরের গান: যদ্যপি আহমদ ছফা

Manual1 Ad Code

শরীফ শমসীর |

আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) জন্মের আশি বছর এবং মৃত্যুর একুশ বছর পার হচ্ছে ; মহাকালের বিচারে তেমন কিছু নয়। তবে কালের বিচারে তিনি এখনো তরুণ। তাঁর শিক্ষক, বন্ধুস্থানীয় বা প্রত্যক্ষ আলাপচারীগণ এখনো তাঁকে নিয়ে লিখে থাকেন, তিতা – মিঠা, যাইহোক না কেন। আহমদ ছফা, সেই অর্থে ভাগ্যবান। আহমদ ছফা এরকমটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু সব চাওয়ার ফলাফল মনে হয় এক না, তার কারণ কাল পরিবর্তনশীল। তাঁকে নিয়ে পুরনো যারা লিখছেন তাদের লেখার প্রেক্ষাপটে পুরনো দিনের স্বাদ থাকে, নতুনদের লেখায় নতুন দিনের প্রসঙ্গ থেকে। সবমিলিয়ে, আহমদ ছফার বয়ান বা প্রাসঙ্গিকতা জারী আছে – এটাই পরম তৃপ্তির।
আহমদ ছফার যাপিত জীবন, সৃষ্টি এবং মনীষার চর্চার সামাজিক চাহিদা থাকবে, কারণ, ছফা, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের কর্মী, প্রত্যক্ষদর্শী কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিন্তকদেরও অন্যতম ছিলেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র থাকলে, ছফা প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তাঁর ভাবনায়, লেখায় বা কর্মে বাংলাদেশ থাকতো। কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তিনি, তা তাঁর সৃষ্টিতে বলেছেন। তাই ছফাকে অনুধাবন করতে হলে বাংলাদেশের জন্মবৃত্তান্তের রাজনীতি- সমাজনীতি- অর্থনীতি- সংস্কৃতি ইত্যাদি জানা থাকা ভালো, না হয় ছফাকে নিয়ে আলোচনা কোথাও কমতি থাকবে।
আহমদ ছফা বলতেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মহাসিন্ধুর কল্লোল, সেই কল্লোলে কান না পাতলে ছফার সৃষ্টির মর্মের ফেনা দেখা যাবে, মুলস্রোতের পরিচয় পাওয়া যাবে না।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে তিনি সৃজনশীল রচনার স্বাক্ষর রেখেছেন কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাঁর মূল চিন্তা ছিল, পাকিস্তানের বৈষম্যনীতির বিপরীতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে! এই ভাবনা তাঁর আমৃত্যু ছিল, আর এই ভাবনা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রীক তাঁর অমর সৃষ্টিসমূহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক ও উচ্চ শিক্ষার একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষাপীঠ হবে – এটা ছফার স্বপ্ন শুধু ছিল না, সাধনাও ছিল ; একটি জাতির শিক্ষা কেমনতরো হবে তা নিয়ে এমন আবেগ ও সৃষ্টিশীলতা সমসাময়িক রাজনীতিবিদ, শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবীদের ছিল না, এখানেই ছফা অন্য অনেকের চেয়ে যোজন যোজন মাইল এগিয়ে, প্রণম্য।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে বাঙালির অগ্রগতি কীসে; এটাও আহমদ ছফার চিন্তার মূখ্য বিষয় ছিল। সেই পথ ধরেই বাঙালি মুসলমানের মন নিয়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসা। বাঙালি মুসলমান নিয়ে ব্রিটিশ ভারতে হান্টার প্রমূখ কাজ শুরু করেন, সেখানে ব্রিটিশ নীতির প্রতিফলন আছে, তারপরও মুসলিম মনীষা নিয়ে এন্তার কাজ হয়েছে, কিন্তু মুসলিম মন নিয়ে চিন্তা করার মাহাত্ম্য অন্যমাত্রার। বাঙালি মুসলমানদের ভবিষ্যত কেমন হওয়া উচিত তার অন্বেষাই ছিল এই চিন্তাসূত্রের অভীপ্সা। বাঙালি মুসলমানের মন কৌম চেতনার কোষে কেনো আবদ্ধ, তার অর্গল কীভাবে খোলা যায় – তার চিন্তা তিনি করেছেন। ছফার আফসোস ছিল, একজন রামমোহন বা বিদ্যাসাগর বা সমাজসংস্কারক বা ধর্মীয়সংস্কারক কেন বাঙালি মুসলমানের ঘরে জন্মালো না! এই আফসোস হীনমন্যতা থেকে নয় বরং সংস্কারকের মানসিকতা থেকে তিনি করেছিলেন। বাঙালি মুসলমানকে কৌম চেতনা থেকে বের হতে গেলে মুসলমানদেরই নিজেদের সংস্কারের কাজ নিজেদের করতে হবে- ছফা তাই চেয়েছিলেন তিনিও স্বধর্মীদের মাঝে যাবেন এবং তাদের সংস্কারের পথ আসতে আহবান জানাবেন। তিনি জলে নেমেছিলেন জলে ডুবে যাওয়ার জন্য নয়, স্বধর্মীদের হাত ধরে নতুন পথে হাঁটার জন্য। ছফার অভীপ্সা না বুঝে ছফাচর্চা কোনো কোনো সময় অর্থের চেয়ে অনর্থ তৈরি করতে পারে। এই ফাঁদ অনেকেই ভেদ করতে পারছেন না।
আহমদ ছফা নিজেকে তৈরি করেছিলেন বাংলা সাহিত্য ও বিশ্ব সাহিত্য পাঠ করে। নিজের পাঠে মূল্যায়ন করেছেন প্রায় সব প্রাতঃস্মরণীয়দের। মূল্যায়ন করেছিলেন, বিশ্ব সাহিত্য। গ্যাতের কথা উল্লেখ করা যায়, বার বছরের অধিক সাধনায় তিনি ফাউস্ট বাংলার মননে গেঁথে দিয়েছেন।
আহমদ ছফা বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতেন। ছফার মতো মধুর বাংলা আর কম ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠাও ছফার সাধনা ছিল।
আহমদ ছফা ছিলেন বহুমাত্রিক সৃষ্টিতে ও জীবনযাপনে। স্বধর্মীয়দের উদ্ধারের বাসনায় সাম্প্রদায়িক নন, সাম্প্রদায়িক ভারতের সমালোচনায় বিদ্বেষী নন, মানবতার সাধনায় সাম্যপ্রচারক।
আহমদ ছফার সাহিত্য একদিন বিশ্ব দরবারে সমাদৃত হবে, নিজের সম্পর্কে তাঁর এই মূল্যায়ন অহংকারসূচক ছিল না, ছিল আত্মবিশ্বাসের।
ভারতের রাজনীতির দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভুল মনে করতেন, ভুল মনে করতেন কংগ্রেসের একজাতি তত্ত্বও। ছফা চেয়ে ছিলেন বাংলাদেশ হবে ফজলুল হকের প্রজাদের, ভাসানীর কৃষকদের, স্বাধীনতা ও সাম্যের। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশেও তিনি গণতন্ত্রের পূজারী। সামরিক শাসনের বিরোধী। আরো চেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য ফুলে ফলে বিশ্বসাহিত্য মাতাবে আর গ্যাতের মহামানবের গান বাঙালি গাইবে।
বাংলাদেশ হবে সব সম্প্রদায়ের ; তাই সব সম্প্রদায়কে নিজেদের অর্গল মুক্ত করে বেরিয়ে এসে একটা গর্বিত বাংলাদেশ গঠনে যুক্ত সাধনায় মিলিত হতে হবে – এও ছিল আহমদ ছফার সাহিত্যিক সৃষ্টি ও রাজনৈতিক মতামতের মূল সুর।
আহমদ ছফাকে পাওয়া যাবে তাঁর যাপিত জীবনে ও সমগ্র রচনাবলীতে।
আহমদ ছফা বাংলাদেশের কল্যাণ ও সমৃদ্ধিতেই বেড়ে উঠুক -তরুণদের মনীষাও এ পথে হোক- এই কামনা। বাসনায় থাকবে – সহি ছফানামা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ