আমরা ‘আমানত’ নই; আমরা ভূমিসন্তান

প্রকাশিত: ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২২

আমরা ‘আমানত’ নই; আমরা ভূমিসন্তান

Manual7 Ad Code

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী |

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীদের মুখে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, এদেশের সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের কাছে ‘আমানত’ স্বরূপ ; তাই সেই আমানতের সুরক্ষা দেয়া তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। কথাগুলো বিভিন্ন ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক নেতৃবৃন্দের মুখে প্রায়শই শোনা যায়। কথাটি শুনতে ভালো শোনা গেলেও, কথাগুলোর মাঝে একপ্রকার পোষ্য বা মনিবের ভাব রয়েছে। মানুষ যেমন শখের বসে আদরের বিড়াল, কুকুর বা ঘোড়া পোষে; অনেকটা ঠিক সে রকমের। এই ভূমির সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়কে যারা আমানত বা গচ্ছিত ধন বলে অবিহিত করে তারা কথাটি সমানাধিকার অর্থে বলেন না। তারা তাদের কর্তৃত্ববাদী প্রভুসুলভ মানসিকতা থেকে বলেন। কিন্তু বিষয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের দৃষ্টিতে দেখলে, এ বাক্যটির মধ্যে একটি অদৃশ্যমান অবজ্ঞা রয়েছে। একটি মিছরির ছুরির ভাব রয়েছে। বাইরে মিছরির সুমিষ্টতা থাকলেও, ভেতরে ছুরির দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।বিষয়টি অনকটা ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা সাময়িক শোভাবর্ধনকারী ফুলের মত। বা বিশাল বটবৃক্ষকে ছোটকাল থেকে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে গাছটিকে বড় হতে না দিয়ে ‘বনসাই’ করে রাখার মত। অর্থাৎ বট গাছটি নামে শুধু থাকবে, কিন্তু তার নিজস্ব স্বকীয়তা থাকবে না। সুবিশাল বটবৃক্ষ যে কারো আলো জলের তোয়াক্কা করে না। বরং সে সবাইকে আশ্রয় দান করে, ছায়া দান করে।অথচ সেই সুবিশাল বটবৃক্ষ ছোটকাল থেকে বনসাই হয়ে আজীবন ক্ষুদ্র টবে অন্যের আলো জলের মুখাপেক্ষী হয়ে বাস করতে হয়। গৃহে থেকে সে গৃহের মানুষের শোভাবর্ধন করে। তাই দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, আমরা কারো আমানত বা গচ্ছিত ধন নই। গচ্ছিত ধনের সাথে আমাদের তুলনা হবে কেন? আমরা এই ভূমির ভূমিপুত্র বা ভূমিসন্তান। আমরা এ ভূমির এবং ভূমির সুপ্রাচীন ধর্ম এবং সংস্কৃতির ধারক-বাহক। আমরা এ ভূমির আদিবাসিন্দা আদিবাসী। সংক্ষেপে এক কথায় বলতে গেলে মূলনিবাসী।

Manual1 Ad Code

আমি এ মাটির ভূমিপুত্র,
মাটির সাথে আমার সহজাত সম্পর্ক;
আমার শরীরের খাঁজে খাঁজে
লেগে আছে এ মাটির সেঁধো গন্ধ।

Manual3 Ad Code

আমি এ মাটির সুরক্ষা চাই,
পিতৃপুরুষের প্রদত্ত দায়কে
বংশধারায় সুরক্ষিত করে,
তাঁদের তৃপ্ত করতে চাই।

Manual7 Ad Code

আমাদের যারা আমানত বলছে, আমরা সংখ্যায় কম হলেও এই ভূখণ্ডের শাশ্বত ভূমিসন্তান হিসেবে আমরা যদি তাদেরকে আমাদের আমাদের আমানত বলে অবিহিত করি; তবে কি তাদের বিষয়টি ভালো লাগবে? না তাদের ভালো লাগবে না। কারণ তারা নিজেরাও জানে শব্দটি সম্মান বা সমানাধিকারের নয়। তাই আমি অনুরোধ করব, সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি এই অবজ্ঞাসূচক আমানত শব্দসহ এ জাতীয় বাক্যগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে ব্যবহার না করতে। কিন্তু এরপরেও যদি শব্দটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উচিত এর যথোপযুক্ত প্রত্যুত্তর দেয়া।

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ