‘নানা সাহেব ও দুটি হত্যাকাণ্ড’

প্রকাশিত: ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২২

‘নানা সাহেব ও দুটি হত্যাকাণ্ড’

Manual6 Ad Code

রানা চক্রবর্তী |

১৮১৮ সালে ‘পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরা’ও যুদ্ধে হেরে গিয়ে ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পণ করে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে বাৎসরিক ৮ লক্ষ টাকার পেনশন নিয়ে ‘কানপুর’ থেকে ১৫ মাইল উত্তরে গঙ্গার ধারে ‘বিঠুরে’ বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। ১৮৫১ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়ে তিনি উইল করে তাঁর দত্তক পুত্র ‘দন্দুপন্থ নানা’কে তাঁর সব কিছুর উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজ সরকার নানাকে পেশোয়া বলে স্বীকার করতে রাজি হয়নি, এবং তাঁর ৮ লক্ষ টাকার পেনশন বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে অন্যান্য অধিকারগুলি থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল।

পেনশনের জন্য তাঁর দরখাস্ত যখন গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল নামঞ্জুর করে দিয়েছিল, তখন নানা সাহেব ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টার্সের’ কাছে আপিল করবার জন্য ‘আজিমুল্লা খান’কে ইংল্যাণ্ডে পাঠিয়েছিলেন। আজিমুল্লা খান অতি সাধারণ অবস্থা থেকে নিজের অধ্যবসায়ে ইংরেজী ও ফরাসী ভাষা শিখে উন্নতি লাভ করেছিলেন। ইংল্যাণ্ডের সম্ভ্রান্তবংশীয় মহিলা মহলে যথেষ্ট প্রতিপত্তি লাভ করলেও নানা সাহেবের পেনশন সম্বন্ধে তিনি ইংরেজ কর্তৃপক্ষকে রাজী করাতে পারেন নি। তারপরে লণ্ডন থেকে ভারতে ফেরবার আগে তিনি ‘ক্রাইমিয়ার যুদ্ধ’ দেখবার জন্য ‘কনস্টান্টিনোপলে’ গিয়েছিলেন। “যেসব রুস্তমরা, অর্থাৎ রুশরা, ইংরেজ ও ফরাসী উভয়কে হারিয়ে দিয়েছে” – তাঁদের দেখবার জন্য তিনি ব্যগ্র হয়ে উঠেছিলেন।
(মাই ডায়েরি ইন ইণ্ডিয়া, ১ম খণ্ড, রাসেল, পৃ- ১৬৫)
যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে তিনি রুশ ব্যাটারির কার্যকলাপও পরিদর্শন করেছিলেন। এমনকি এটাও শোনা যায় যে, কনস্টান্টিনোপলে থাকাকালীন আসন্ন ভারত বিদ্রোহে সাহায্যার্থে তিনি কয়েকজন রুশ প্রতিনিধির সঙ্গেও আলাপ আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু এইসব তথ্যের সত্যাসত্য নির্ণয় করা খুবই কঠিন ব্যাপার। তবে এ সম্পর্কে ‘ফোরবস-মিচেল’ যেটুকু ইতিহাস দিয়েছিলেন, সেটা হল যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক ও ‘রুরকি’র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত ‘মোহাম্মদ আলি খান’, বিদ্রোহের শেষের দিকে ইংরেজের হাতে বন্দী হয়েছিলেন এবং ১৮৫৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি তারিখে তাঁর ফাঁসি হয়েছিল। ফাঁসির আগে ফোরবস-মিচেলকে মোহাম্মদ আলি কতগুলি কথা জানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, আজিমুল্লার সঙ্গে তিনিও ইংল্যাণ্ডে গিয়েছিলেন, এবং তারপরে ক্রাইমিয়াতেও তিনি তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন, “… সেখানে আমরা ১৮ই জুন তারিখে বৃটিশের আক্রমণ ও পরাজয় দেখেছিলাম। সেখান থেকে আমরা কনস্টান্টিনোপলে ফিরে যাই সেখানে আমরা কয়েকজন প্রকৃত অথবা কৃত্রিম রুশ প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। আজিমুল্লা যদি ভারতে বিদ্রোহ ঘটাতে পারেন, তা হলে প্রচুর বাস্তব সাহায্যের ব্যবস্থা করবেন বলে তাঁরা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই সময়ই আমি ও আজিমুল্লা কোম্পানি সরকারকে খতম করবার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।”
(রেমিনিসেন্সেস অব দি গ্রেট মিউটিনি, ফোরবস-মিচেল, পৃ- ১৮৬)
যাই হোক, এখন বিদ্রোহকালীন প্রসঙ্গে আসা যাক। কানপুরের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানের জন্য সেখানে একটি ইংরেজ গোলন্দাজ বাহিনী ও প্রায় ২,৫০০ সিপাহীর থাকবার জন্য একটা বড় ক্যান্টনমেন্ট ছিল এবং ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় সেখানে বেসামরিক ইংরেজ, ফিরিঙ্গী ও খৃষ্টান অধিবাসীর সংখ্যাও খুব একটা কম ছিল না। সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে মিরাট ও দিল্লীতে বিদ্রোহের খবরের পর থেকেই কানপুর শহরের অবস্থা দিনের পর দিন চঞ্চল হতে শুরু করেছিল। কানপুর বাহিনীর নায়ক ‘জেনারেল হুইলার’ যে কোনো দিন বিদ্রোহের আশঙ্কা করতে শুরু করেছিলেন।
১৮৫৭ সালের ২২শে তারিখে নানা সাহেব ২টি কামানসহ ৩০০ জন মারাঠা সৈন্যকে ইংরেজদের সাহায্যের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কানপুরের তৎকালীন ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ‘হিলার্স ডনের’ তখনও নানা সাহেবের উপরে সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল এবং সেজন্য তিনি নানা সাহেবের উপরে ব্রিটিশ ধনাগার, যেখানে তখন ১০ লক্ষ টাকা মজুত করে রাখা ছিল, সেটি রক্ষার ভারও ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরপরে ওই বছরের ১লা জুন তারিখে ইংরেজদের ২য় অশ্বারোহী বাহিনীর সুবাদার ‘টীকা সিং’ এবং আরো কয়েকজন মিলে নানা সাহেবের সঙ্গে বিদ্রোহ সম্বন্ধে আলোচনা করেছিলেন। ২রা জুন তারিখে ব্রিটিশ বাহিনীর একজন মাতাল ইংরেজ অফিসার ২য় অশ্বারোহী বাহিনীর একজন প্রহরীকে গুলী করে হত্যা করেছিলেন। পরের দিন সামরিক আদালতের বিচারের সময়ে সেই অফিসারটি কোন শাস্তি পাওয়া তো দূরে থাকে, উল্টে অচেতন অবস্থায় গুলী ছোঁড়ার অজুহাতে মুক্তি পেয়ে গিয়েছিলেন। ৪ঠা জুন তারিখে হুইলার কানপুর শহরের সমস্ত ইংরেজদেরকে নিয়ে ও এক মাসের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে সুরক্ষিত ‘ইনট্রেঞ্চমেন্টে’ প্রবেশ করেছিলেন। ৫ই জুন তারিখে কানপুরের ভারতীয় সিপাহীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে সুবাদার টীকা সিংকে ২য় অশ্বারোহীদের জেনারেল, জমাদার ‘দলভঞ্জন সিং’কে ৫৩ম পদাতিকদের কর্নেল ও সুবাদার ‘গঙ্গাদীন’কে ৫৬ম পদাতিকদের কর্নেল নিযুক্ত করা হয়েছিল। নানা সাহেবের বাহিনীর কমাণ্ডার ‘জওলা প্রসাদ’ ব্রিগেডিয়ার পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এখানে টীকা সিং সম্পর্কে একটু বলবার প্রয়োজন রয়েছে। টীকা সিং সম্বন্ধে ‘স্যার জর্জ ট্রিভেলিয়ান’ তাঁর ‘কানপুর’ নামক গ্রন্থে লিখেছিলেন, “টীকা সিং তাঁর দুঃসাহস ও কর্মদক্ষতার দ্বারা সিপাহীদের নেতৃস্থান অধিকার করেছিলেন।” (পৃ- ৬৭)
যখন বিদ্রোহী সিপাহীরা নানা সাহেবের অনুরোধে কানপুরে ফিরে এসেছিল, “টীকা সিং তৎক্ষণাৎ ম্যাগাজিনে চলে গেলেন। যেসব কামান কার্যকরী অবস্থায় ছিল সেগুলিকে তৎক্ষণাৎ ইনট্রেঞ্চমেন্টের দিকে পাঠিয়ে দিলেন, আর যেগুলি তখনই ব্যবহার করবার মতো অবস্থায় ছিল না সেগুলিকে পরিষ্কার করবার জন্য মিস্ত্রীদের কাজে লাগিয়ে দিলেন। বিদ্রোহীদের বেশীর ভাগই তাঁর মতো দূরদর্শিতা ও ধীরতা দেখাতে পারেনি।” (পৃ- ৮৮)
৬ই তারিখে “টীকা সিং অস্ত্রাগারে সারাদিন কাজ করলেন। বড় বড় কামানগুলি ঠিকভাবে ব্যবস্থা করে ঠিক ঠিক জায়গায় পাঠিয়ে দিতে লাগলেন। যেই কামানগুলি আসতে লাগল, তখনই সেগুলিকে সঠিক স্থানে বসানো হল এবং স্বেচ্ছাসেবকরা তার ভার গ্রহণ করল। পরদিন দ্বিপ্রহরের মধ্যে ব্যাটারির বেষ্টনী তৈরি করা শেষ হল এবং আমাদের ইনট্রেঞ্চমেন্ট চারদিক থেকে ২৪-পাউণ্ড গোলার আঘাতে কাঁপতে লাগল।” (পূ- ১০০)
উক্ত টীকা সিং ইত্যাদিকে নিয়ে নানা সাহেব যখন তাঁর নিজের বাহিনী গঠন করেছিলেন, তখন বিদ্রোহী সিপাহীদের একদল প্রতিনিধি নানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে জানিয়েছিলেন – “মহারাজ, আপনি যদি আমাদের সঙ্গে যোগ দেন, তাহলে একটা রাজ্য আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে, কিন্তু আপনি যদি শত্রুদের সঙ্গে যান, তা হলে আপনার মৃত্যু অনিবার্য।” নানা সাহেব এর উত্তরে তাঁদের বলেছিলেন, “ইংরেজদের সঙ্গে আমার কি সম্বন্ধ? আমি সম্পূর্ণরূপে তোমাদেরই।” (হিষ্ট্রি অব দি ইণ্ডিয়ান মিউটিনি, হোমস, পৃ- ২২৪)
কানপুরে বিদ্রোহ করেই সিপাহীরা দিল্লী অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা যখন ৬ মাইল চলে গিয়েছিলেন, তখন নানা সাহেব পুনরায় তাঁদের কানপুরে ফিরিয়ে এনেছিলেন। বিদ্রোহীরা শহরে ফিরে এসেই ইনট্রেঞ্চমেন্ট অবরোধ করেছিলেন।

Manual1 Ad Code

২৬শে জুন তারিখে নানা সাহেব হুইলারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন যে, “যাঁরা লর্ড ডালহৌসির কাজের জন্য দায়ী নন ও যাঁরা আত্মসমর্পণ করবেন, তাঁদের নিরাপদে এলাহাবাদ যেতে দেওয়া হবে।” তাঁর সেই শর্তে ঐ তারিখেই জেনারেল হুইলার বিদ্রোহীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

এরপরে ২৭শে জুলাই তারিখে কানপুরের ইংরেজরা ‘সতীচৌরা ঘাটে’ গিয়ে এলাহাবাদ যাওয়ার জন্য নৌকোয় উঠেছিলেন। বেলা ১টা আন্দাজ সকলের শেষে ‘মেজর ভিবার্ট’ নৌকোতে চড়েছিলেন। ‘মৌরে টমসন’-এর লেখা থেকে জানা যায়, “মেজর ভিবার্ট নৌকোতে ওঠা মাত্রই ‘চল’ বলে নৌকো ছাড়বার আদেশ দেওয়া হল। কিন্তু কিনারা থেকে কোন একটা সঙ্কেত পেয়ে নেটিভ মাঝিরা – প্রত্যেক নৌকোয় তাঁরা ৯ জন করে ছিল – জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ও কিনারার দিকে চলল। আমরা তৎক্ষণাৎ তাঁদের গুলী করলাম, কিন্তু বেশীরভাগই পালাতে সক্ষম হয়েছিল।” (ষ্টোরি অব কানপুর, মৌরে টমসন, পৃ- ১৬৩)
টমসনের উক্তিতেই দেখা যাচ্ছে যে, ইংরেজরাই – যাঁরা তখনও একরকম বন্দী অবস্থাতেই ছিলেন – তাঁরাই প্রথমে গুলী চালিয়েছিলেন ও কয়েকজন ভারতীয় মাঝিকে হত্যা করেছিলেন।

Manual7 Ad Code

এরপরে বিদ্রোহীরাও পাল্টা গুলী চালাতে শুরু করেছিলেন। ফলে নৌকায় থাকা ইংরেজ পক্ষের প্রায় সকল পুরুষই এবং অনেক স্ত্রীলোক ও শিশুও তাতে নিহত হয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত টমসনকে নিয়ে মাত্র ৪ জন ইংরেজ সেখান থেকে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে পালাতে পেরেছিলেন। ওই নৃশংস ঘটনার ৩৭ বছর পরে ‘কর্নেল মড’, তাঁর ‘মেমরীজ অব দি মিউটিনি’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “কর্নেল উইলিয়ামস (কানপুরের তৎকালীন পুলিস কমিশনার) যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, তা খুব ভালভাবে পড়ে এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে বলা যায় যে, নানা সাহেব এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। বরং আমার মত এই যে, যদিও তিনি দোষী, আমি বলব যে তাঁর রক্তপিপাসু অনুচররাই তাঁকে এ বিষয়ে জড়িত করেছিল, যাঁদের কাজে তিনি বাধা দিতে সাহস করতেন না। এমন কি, আজও এবং আমাদের দেশেই দেখিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, অনুরূপ পাশবিকতাকে ওই একইভাবে সহ্য করে যাওয়া হচ্ছে। এটা ঠিক যে, নানা সাহেব অনেকবার অসহায় লোকদের সাহায্য করেছিলেন, এমন কি, তাঁদের প্রতি সত্যিকারের দয়াও দেখিয়েছিলেন।” (পৃ: ১০৮-৯)
সবদিক বিবেচনা করে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে একথা বলা চলে যে, অতীতে যেসব ইংরেজ কানপুরের সেই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে অত পবিত্রতাপূর্ণ ক্রোধ দেখিয়েছিলেন, তাঁদের এটা স্মরণে রাখা প্রয়োজন ছিল যে, ইংরেজ পক্ষের ‘জেনারেল নীল’ কিন্তু অনেক আগেই কানপুরের অবরুদ্ধদের উদ্ধার করতে পারতেন এবং তাহলে হুইলারের আত্মসমর্পণ করবার কোনো প্রয়োজনই হত না। কিন্তু বিদ্রোহের সময়ে উক্ত নীল নেটিভ ‘নিগার’দের পাইকারীভাবে ফাঁসি দিয়ে এবং স্ত্রী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে ভারতীয়দের নৃশংসভাবে হত্যা করে ও গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দিয়ে বিদ্রোহীদের শিক্ষা দিতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, কানপুরে পৌঁছাতে তাঁর বেশ কিছুদিন বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক নথিগুলো থেকে জানা যায় যে, জেনারেল নীলের হত্যাকাণ্ড ও পাশবিক অত্যাচারের ঘটনাগুলি ঘটবার পরেই কানপুরের সতীচৌরা ঘাটের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল। সুতরাং জেনারেল নীলের অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের খবর কানপুরে পৌঁছতে বিলম্ব হয়নি, এবং সেই খবর যে কানপুরের অধিবাসীদের প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আরো উস্কিয়ে তুলেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। সতীচৌরা ঘাটের হত্যাকাণ্ডের পরেও যেসব ইংরেজ তখন বেঁচে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে পুরুষদের গুলী করে হত্যা করা হয়েছিল, এবং প্রায় ২০০ স্ত্রীলোক ও শিশুদের ‘বিবিঘরে’ বন্দী করে রাখা হয়েছিল৷

Manual6 Ad Code

১লা জুলাই তারিখে নানা সাহেব নিজেকে পেশোয়া বলে ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু তাঁকে পেশোয়াশাহী পতাকার পাশে বাদশাহী পতাকা তুলে বিদ্রোহী রাজধানীর আনুগত্যও স্বীকার করতে হয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই তাঁকে কানপুর ছাড়তে হয়েছিল। ১৭ই জুলাই তারিখে ‘জেনারেল হ্যাভলক’ কানপুর শহরে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর বাহিনীর কানপুরে আগমনের আগে ও নানা সাহেবের কানপুর ত্যাগ করবার পূর্বে বিবিঘরের সমস্ত বন্দীদের হত্যা করে একটা কূপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এরপরে ২০শে জুলাই তারিখে জেনারেল নীল যখন কানপুরে পৌঁছেছিলেন, তখন হ্যাভলক তাঁর উপরে কানপুরের ভার দিয়ে ২৫শে জুলাই তারিখে লক্ষ্ণৌর দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, জেনারেল নীল কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে কখনও কোনো রকমের কৃতিত্ব দেখাতে পারেন নি; তবে নিরস্ত্র, অসহায় ও নির্দোষ ভারতীয়দের উপরে পাইকারীভাবে নৃশংস ও পাশবিক প্রতিশোধ নিতে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। বস্তুতঃ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময়ে বারাণসী থেকে কানপুর পর্যন্ত তিনি যেভাবে জল্লাদের কাজ করেছিলেন, খোদ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসেও সেরকম উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায়। কানপুর থেকে তিনি তাঁর এক বন্ধুকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমি নেটিভদের দেখাতে চাই যে, এই ধরনের কাজের জন্য (সতীচৌরা ঘাট ও বিবিঘরের হত্যাকাণ্ড) তাঁদের আমরা যে শাস্তি দেব, তা হবে খুবই কঠোর, তা তাঁদের মনোবৃত্তিকে জঘন্যভাবে আঘাত করবে এবং চিরকালের জন্য তা তাঁদের মনেও থাকবে। আমি যে নিম্নলিখিত হুকুমটি জারী করেছিলাম, তা আমাদের কয়েকজন ব্রাহ্মণ মনোভাবাপন্ন বৃদ্ধ ভদ্রলোকদের নিকট যতই আপত্তিজনক হোক না কেন, আমি মনে করি কানপুরে তা খুবই ঠিক হয়েছিল।” (মেমরীজ অব দি মিউটিনি, কর্নেল মড, পৃ: ৩৯৮-৪০০)
নীলের হুকুম ছিল যে, মৃত্যুদণ্ডের আদেশের পরে প্রত্যেকটি ভারতীয় অপরাধীকে বিবিঘরে নিয়ে যাওয়া হবে, এবং মৃত্যুর আগে তাঁকে কয়েক ইঞ্চি করে রক্তের দাগ জিভ দিয়ে চেটে পরিষ্কার করতে হবে। “যদি কেউ এ কাজ করতে রাজী না হয়, তা হলে প্রোভেস্ট-মার্শাল তাঁকে বেত মারতে থাকবে – যতক্ষণ পর্যন্ত না অপরাধী তাঁর ঐ কাজ সম্পন্ন করবে।” এরপরেই উক্ত চিঠিতেই নীল লিখেছিলেন, “প্রথম অপরাধী ছিল একজন ৬ষ্ঠ বাহিনীর সুবাদার, উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ। তাঁকে আধ বর্গফুট পরিষ্কার করতে হয়েছিল। সে প্রথমে আপত্তি করেছিল, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উপর পড়ল বেত। রক্ত পরিষ্কারের কাজটুকু করবার পরে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হল। আরও অনেককে এইভাবে আনা হল, তাঁদের মধ্যে একজন ছিল মুসলমান, আমাদের দেওয়ানী আদালতের কর্মচারী ও একজন নেতৃস্থানীয় বদমাশ লোক। এটা যে খুবই একটা অদ্ভুত নিয়ম তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু পরিস্থিতির পক্ষে খুবই প্রযোজ্য এবং আশা করি যে, ঘরটা এইভাবে সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আমাকে কেউ বাধা দেবে না। ভগবানের আশীর্বাদে ও সাহায্যে আমি আমার কাজের সার্থকতা দেখাতে পারব।” নীলের পাশবিক হত্যাকাণ্ডের ফলে বিদ্রোহের সময়ে যেসব হিন্দু-মুসলমান ভারতবাসীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল, তাঁরা তাঁদের অদৃষ্টকে ধীর ও শান্তভাবেই বরণ করে নিয়েছিলেন। কি ভাবে হিন্দু ও মুসলমানেরা সেই মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছিলেন সে সম্বন্ধে ‘কর্নেল মড’ লিখেছিলেন, “মুসলমানরা গর্বিত ও ক্রুদ্ধভাবে মৃত্যুকে উপেক্ষা করেছিলেন, আর হিন্দুরা অদ্ভুত রকমের একটা উদাসীনতা দেখিয়েছিলেন। অনেক হিন্দু, যেন তাঁরা কোথায়ও ভ্রমণে যাচ্ছেন এইভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন।” (মেমরীজ অব দি মিউটিনি, কর্নেল মড, পৃ- ২২৪)

সতীচৌরা ঘাটের মত বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের জন্যও অতীতের প্রায় সব ইংরেজ ঐতিহাসিকেরাই নানা সাহেবকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। বস্তুতঃ আইনসঙ্গতভাবে ও নৈতিকভাবে তিনিই ওই সমস্ত কাজের জন্য দায়ী ছিলেন। তিনিই ছিলেন মারাঠা রাষ্ট্রের প্রধান, সুতরাং সব কাজের জন্যই তাঁর উপরে চরম দায়িত্ব বর্তেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বিবেচনা করতে হবে যে, বিবিঘরের হত্যাকাণ্ড কখন ঘটেছিল – সেটা কি নানা সাহেবের কানপুর ত্যাগ করবার আগে ঘটেছিল, নাকি পরে ঘটেছিল? এটা খুবই সম্ভব যে, সেই হত্যাকাণ্ড একদল চরমপন্থীর দ্বারা নানা সাহেব কানপুর ত্যাগ করবার পরে ঘটানো হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে নানা সাহেব যে ওই সব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ছিলেন, কিংবা তাঁর জ্ঞাতসারে ও তাঁর সম্মতিতে যে ওই সব ঘটনা ঘটেছিল – সেসবের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কিন্তু ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না। কানপুর পুনর্দখল করবার পরে ‘কর্নেল উইলিয়ামস’ সে সম্বন্ধে যেসব সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছিলেন, ইংরেজ ঐতিহাসিকেরাও সেগুলোকে খুব বেশী মূল্য দেননি। কেবলমাত্র ঐতিহাসিক ‘ফরেস্ট’ তাঁর ‘হিস্ট্রি অব দি ইণ্ডিয়ান মিউটিনি’ গ্রন্থের ভূমিকায় যা লিখেছিলেন, তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য – “উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের পুলিস কমিশনার কর্নেল উইলিয়ামস্ যে ৬৩ জন লোকের সাক্ষ্য নিয়েছিলেন, তা আমি পড়েছি। ঐ সাক্ষ্যগুলি স্ববিরোধী উক্তিতে পরিপূর্ণ এবং খুব সতর্কতার সঙ্গে সেগুলি বিচার করতে হবে। কর্মচারীদের প্রদত্ত এবং অন্যান্য গুপ্ত রিপোর্টগুলিও আমি দেখেছি। এইসব থেকে দেখা যায় যে, যদিও তাতে কলঙ্কময় কৃষ্ণবর্ণের প্রাধান্যই বেশী, তা হলেও চিত্রটিকে যতখানি কালো করে চিত্রিত করা হয়েছে তা ততখানি কালো নয়। কর্নেল উইলিয়ামস্ বলেছেন – ‘প্রথম দিকে সাধারণভাবে সর্বত্র অহেতুক মনে করা হত যে, আমাদের বন্দী স্ত্রীলোকরা লাঞ্ছিত ও কলঙ্কিত হয়েছিলেন; সে ধারণা আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সংগৃহীত তথ্যের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন বলেই প্রমাণিত হয়েছে।’ তথ্যর দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, যেসব সিপাহী বন্দীদের পাহারা দিচ্ছিল, তাঁরা তাঁদের হত্যা করতে অসম্মত হয়। এই ঘৃণ্য দুষ্কর্ম ঘটেছিল একজন দুঃশ্চরিত্রা স্ত্রীলোকের প্ররোচনায় নানা সাহেবের পাঁচজন দেহরক্ষীর দ্বারা। এই নিষ্ঠুর কাজের জন্য একটা সমগ্র জাতিকে অভিযুক্ত করা যেমন ক্ষুদ্রমনের পরিচায়ক, তেমনই অসত্য।” (পৃ- XI)

যাই হোক, রাজনীতি ও মানবতার দিক থেকে বিচার করলে, বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের কোনো সার্থকতাই ছিল না। সেই হত্যাকাণ্ডের দ্বারা বিদ্রোহীরা কিছুই লাভবান হননি, বরং ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছিলেন। কারণ ইংল্যাণ্ডে ও ইউরোপে ভারতবিরোধী প্রচারে ওই সব ঘটনা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে পরবর্তীকালে খুবই সহায়ক হয়েছিল। যদিও এটাও ঠিক যে, বিবিঘরের ঘটনা না ঘটলেও ইংরেজ শাসকদের পক্ষে ঐ রকম কিছু আবিষ্কার করে প্রচারকার্য চালানো কিছুই কঠিন হত না। সাম্রাজ্যবাদীরা তাঁদের সকল যুদ্ধের সময়েই, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক যুদ্ধের সময়ে, এ রকম বরাবরই যে করে থাকেন, ইতিহাসে তার অনেক সাক্ষ্যই রয়েছে।

লেখা – রানা চক্রবর্তী
(তথ্যসূত্র:
১- মাই ডায়েরি ইন ইণ্ডিয়া, ১ম খণ্ড, রাসেল।
২- রেমিনিসেন্সেস অব দি গ্রেট মিউটিনি, ফোরবস-মিচেল।
৩- কানপুর, স্যার জর্জ ট্রিভেলিয়ান।
৪- ষ্টোরি অব কানপুর, মৌরে টমসন।
৫- মেমরীজ অব দি মিউটিনি, কর্নেল মড।
৬- হিস্ট্রি অব দি ইণ্ডিয়ান মিউটিনি, ফরেস্ট।)

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ