সেই বোগেনভিলিয়ার হাসি

প্রকাশিত: ২:৪০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৫, ২০২৩

সেই বোগেনভিলিয়ার হাসি

Manual5 Ad Code

কেকা অধিকারী |

(শিল্পী, তোর জন্মদিনে পোস্ট করতে চেয়েছিলাম। দেরি হয়ে গেল।)

বরিশালের ঐতিহ্য কাঠের দোতলা বাড়িটা পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল অনেক বছর। গাছগাছালিতে ঘেরা, জীর্ণ শীর্ণ, ভগ্নপ্রায়। আমার মামাবাড়ি। মামা, মাসী, মায়ের জন্মভিটা। একটু দূরে ইটের দালান। নতুন মামাবাড়ি। ছোটমামা মাইকেল কল্যান সরকারের উদ্যোগে বানানো। সেবার অনেক বছর পরে মামাতো ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে মামাবাড়ি বরিশালে গিয়েছিলাম। চলে আসার দিন সকালে স্বভাববশতঃ বাড়ির আশেপাশের ঝোপজঙ্গল ঘুরে দেখতে বেরিয়েছি। আগের জনমে আমি নির্ঘাত পাতাকুড়ানি বা ঘুঁটেকুড়ানি ছিলাম। আমার এভাবে জঙ্গলে ঘোরার উদ্দেশ্য একটাই- মামাবাড়ির কচুটা ঘেচুটা, আনাজ, লতাপাতা, মরা ডাল, শুকনো ফুল কুড়িয়ে ঢাকায় টেনে আনা। ছোট মামা আমার এ প্রকৃতির সাথে পরিচিত। এ কাজে তাঁর প্রশ্রয়ও অনেক।

মামাকে সাথে নিয়েই ঘুরছিলাম ঝোপঝাড়ে। হঠাৎ নজরে এলো পুরনো বাড়িটা। আহা! শৈশবের মামাবাড়ি। স্মৃতিরা সব হামলে পড়ল আমার উপর- দাদুর মাথা বাঁকানো লাঠি নিয়ে ঘরের ভিতরে বাইরে টুকটুক করে হাঁটাচলা। সাদা শাড়ি পরে আমার সুন্দরীতমা দিদিমার এ ঘর, ও ঘর, রান্নাঘর করা। উঠোনে বাচ্চাসমেত মা মুরগী পোলোর নিচে আটকা থাকা। কিংবা ওদের জন্য ছড়িয়ে দেয়া ধানগম খাওয়ার দৃশ্য। মা মুরগীর তাড়া খেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে আমার উপুর হয়ে পরে যাওয়া। এমন সব দৃশ্য আমার মধ্যে আজও স্থায়ী হয়ে আছে।

কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আমি তাকিয়ে আছি বাড়িটার দিকে। স্মৃতি সব সময়ই মন কেমন করা। কিন্তু চোখ মেলে পুরো বাাড়িটায় মনোযোগ দিতেই হারানো স্মৃতি রোমন্থন করা আমার বিষাদগ্রস্ত মনটা মুহূর্তে চাঙা হয়ে উঠল। ধূসর বাড়ির একটা পাশ রাণী গোলাপি রঙে ঝলমল করছে। আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগেও নানান রঙের বোগেনভিলিয়া এখনের মতো এতোটা চোখে পড়তো না। সেই ভাঙা বাড়ির ফুলের আকর্ষণীয় রঙের আভা মাটি থেকে উর্ধমূখী হয়ে বাড়ি বেয়ে দোতলা ছাড়িয়েছিল। পরিত্যক্ত রিক্ত শূন্য বাড়িটা যেন প্রাণহীন নয়। জীবনের রঙে সম্পূর্ণ রঙ্গিন! দেখে মনে হচ্ছিল মামাবাড়ির সব সৌন্দর্য বুঝি এখানে এসে জড়ো হয়েছে। আমি বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে মামাকে বললাম –
– মামা, কী সুন্দর ফুল! কে লাগালো?
– রোজী লাগিয়েছিল।

রোজী আমার মামাতো বোন। অবশ্য আমরা অনেকে ওকে শিল্পী নামে ডাকি। আমার প্রকাশ মামার বড় মেয়ে। কিন্তু ও তো বাড়ি ছেড়েছে বহু বছর! এখন এক মেয়ে, স্বামী, চাকরি-বাকরি নিয়ে ঢাকায় ব্যাস্ত জীবন কাটাচ্ছে। মনে পড়ল সেই কতকাল আগে ছাত্র জীবনে শিল্পী আর আমি এক রুম, এক বিছানা শেয়ার করেছি। এক টেবিলে পড়েছি। ওকে পড়িয়েছি। মনোযোগ দিয়ে পড়তো। খুব ভালোবাসতো আমাকে। আহা আমার আদরের ছোট্ট বোনটা! ও লাগিয়েছিল বোগেনভিলিয়া গাছটা! তাহলে ঢাকায় যাওয়ার আরও আগে লাগিয়েছিল নিশ্চয়।

Manual4 Ad Code

এরপর আরও কয়েক বছর কেটে গেছে। যতোদূর মনে পড়ে আমেরিকা প্রবাসী হেনরীদা তাঁর ছেলে জোনাথনের বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজতে দেশে এলে ছোট মামাকে দলনেতা বানিয়ে আমরা ভাইবোনেরা মাইক্রোবাস যোগে বরিশাল শহরে গিয়েছিলাম। সেই সূত্রে আরেকটি বার ধামশরে মামাবাড়িতে যাওয়া।

Manual6 Ad Code

বান্ধবী মিলি সেবার সাথে ছিল। ওকে বাড়িটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখাতে গিয়ে পুরানো বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলে ধাক্কা খেতে হলো। কোথায় বাড়ি? কোথায় বিশাল আকারের ঝোপালো সেই বুগেনভিলিয়া? কোথায়ও কিছু নেই। সব সমতল। সেখানে সারি সারি করে লাগানো বেগুন, টমেটো, মরিচ গাছের সারি।

Manual7 Ad Code

ঘরে এসেে মামাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– মামা, পুরোনো ঘরটা ভেঙে ফেললেন? শিল্পীর লাগানো ফুুলেের গাাছটাও!
– বাড়ির ঐ অংশটা বুলুর ভাগে পড়েছে। তাই সব পরিষ্কার করতে হল।
বুলু আমার আরেক মামা। মায়ের কাকাতো ভাই। ভীষণ পরিপাটি স্বভাবের। তিনি জায়গাটা গুছিয়ে ফেলতে চেয়েছেন হয় তো। তবু কোথায় যেন মনের মধ্যে একটু বিঁধল – সুন্দর বোগেনভিলিয়া গাছটা কেটে ফেলল! শিল্পীর সখ করে লাগানো গাছটা!

তারপর আরও বেশ কিছু বছর পেরিয়ে গেল।
দিন যায় দিন আসে। তবে কিছু কিছু ভোর আসে জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে। সেই ক্ষতের ব্যথা আমৃত্য সহ্য করতে হয়। কিছু দিন আগে এমনই আরেকটা ঘটনা ঘটল আমাদের পরিবারে। দিনটি ছিল মার্চের ১২। সেই রবিবার সকালে জানলাম আমার বড় মামী মায়া সরকার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ১৫ তারিখ রাতে জানলাম শিল্পীর মা আমার সেজমামী রাণী সরকার আইসিইউতে। ১৬ তারিখ ভোর রাতে তিনিও ওপারে পাড়ি জমালেন।

বড়মামী চলে যাওয়ার খবরটি জানাতে গিয়ে অশ্রুমামীর সাথে কথা হয়েছিল। তিনি আমার চতুর্থ মামীমা। কিন্তু কী জানি কেন সেজমামীর সাথে কথা হলো না। হলে কী ভালোই না হতো। অথচ তাঁকে নিয়ে আমি কিছু পরিকল্পনা করছিলাম! তাঁর এভাবে আকষ্মিক চলে যাওয়া আমাকে হতবাক করে দিল। সকালে রাজাবাজার চার্চে মামীর অন্তেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাব। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম মাকে নিয়ে আমিও মামাবাড়ির পথে মামীর শেষ যাত্রার সাথী হব। আহা, তাঁর জন্য আমি মামাবাড়ি এলাম তা যদি মামী দেখে যেতেন! তিনি দেখলে নিশ্চিত তাঁর ঠোঁটে সেই দূর্লভ মিষ্টি হাসিটি দেখা মিলতো। আমার মা তাঁর বিষয়ের আলোচনায় প্রায়ই বলতেন,
– সেজো বৌদির হাসিটা খুব সুন্দর। কিন্তু উনি কম হাসেন।

সেজমামীর সমাধি কাজ শেষ হতে সন্ধ্যা নেমে এলো। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ছোট মামীর দেয়া চা, নাস্তা খেয়ে আমি আমার অভ্যাসবশতঃ বাড়ির চারদিকটা ঘুরতে বেরুলাম। এবার একা একা। পুরানো বাড়িটার জায়গায় নেট দিয়ে ঘিরে সবজি চাষ করা হয়েছে। আরও কিছু লাগানোর আয়োজন চলছে। কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে রাখা। মাটি থেকে দৃষ্টি আরেকটু উপরে ওঠাতেই চমকে গেলাম। সমতল মাটির উপর ঝুলে আছে, মাটিতে শুয়ে আছে রাণী গোলাপি রঙের ফুলসমেত কয়েকটি বোগেনভিলিয়ার শাখা। মরা কোন ডাল নয়। একেবারে সতেজ, জীবন্ত। দৌঁড়ে আমি ফুল গাছের দিকে এগিয়ে গেলাম। অনেক মোটা একটা কান্ড থেকে ফুলের ডালগুলো সব বেরিয়েছে। ঝাঁ করে মাথায় এলো,”আচ্ছা এটা শিল্পীর লাগানো সেই গাছটা নয় তো?” খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হলাম শিল্পীর লাগানো গাছই ওটা৷ পুরাতন বাড়ি ভাঙার সময় গাছের ওপরের অংশটা কাটা পরলেও গোড়াটা ছিল। প্রতিটি প্রাণের মধ্যেই বেঁচে থাকার প্রবণতা প্রবল। গাছটি তাই ভেতরের শক্তিতে বেঁচে উঠেছে। আবার ফুল দিচ্ছে।

আচ্ছা শিল্পী কি জানে ওর গাছটার কথা! ভাবলাম ওকে ডেকে গাছটা দেখাই। কিন্তু ওকে পাওয়া গেল না। সন্ধ্যায় মামীর উদ্দেশ্যে ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়েছে। ও বোধ হয় তার নিমন্ত্রণ করতে অন্য কোন বাড়িতে গিয়েছে। ওকে গাছটা দেখানো গেল না।

শুক্রবার সন্ধ্যায় সভার কাজ ভালো ভাবে শেষ হল। শিল্পীর পরিবার, ভাই অপুর পরিবার শনিবার দুপুরে ঢাকায় ফিরবে। আমিও ফিরব ওদের সাথে।

Manual3 Ad Code

শনিবার সকালে আমি আরেকটি বার ফুলগাছটির কাছে গেলাম। কী সুন্দর! শিল্পীকে দেখাতেই হবে ওর গাছটা। আবার ঘরের দিকে এগিয়ে জানালা দিয়ে ওকে ডেকে বললাম স্বামী উত্তম ও মেয়ে মোমকে নিয়ে বাইরে আসতে। ওরা এলে সবাইকে নিয়ে চললাম বোগেনভিলিয়ার কাছে। শিল্পী নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এটা ওর লাগানো সেই গাছ। বাড়ির ভাই বোনেরা ওকে নিশ্চিত করল। ও আবেগ আপ্লুত হয়ে মেয়েকে, আমাদেরকে বলতে লাগল,
– আমি উজিরপুর হাসপাতাল থেকে একটা ডাল ভেঙে নিয়ে এসেছিলাম। আমার বন্ধুরাও এনেছিল। আমরা গার্ডের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলাম। আমার গাছটা বেঁচেছিল। ৩০ বছর হয়ে গেছে। কত্ত দিন আগে…
আমি শিল্পীকে বললাম,
– তুই নিজের গাছটাকে একটু ধরে দেখ অন্ততঃ।
ও গাছটার কাছে গেল। আমি বললাম,
এদিকে তাকা এবার। তোর গাছের সাথে তোর একটা ছবি থাক।
বোগেনভিলিয়ার সাথে ওর ছবি, ওর পরিবারের ছবি তুললাম।

আমাদের হাতে সময় কম। এখনও গোছগাছ বাকী। তাই ঘরে ফিরলাম সবাই। ফিরতে ফিরতে শিল্পী আস্তে করে বলেছিল ওর উজিরপুর হাসপাতালে যাওয়ার কারণ।
– হাসপাতালে হ্যাপিকে দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। আসলে ওকে না, ওর লাশ দেখতে গিয়েছিলাম।
– হ্যাপী কে ছিল?
– আমার বান্ধবী। আমরা এক সাথে পড়তাম। ফার্স্ট ইয়ারে।
– কী হয়েছিল ওর। কেমন করে মারা গেল?
– সুইসাইড করেছিল। বাবা-মায়ের উপর অভিমান করে। ওর বাবা-মা ওকে বুঝতে চাই তো না।

কী আশ্চর্য! হ্যাপী নামের মেয়েটি সুখী ছিল না। দুঃখের জীবনকে তাই সে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছিল। অথচ চলে যাওয়া মেয়েটির সূত্র ধরে যে ফুলগাছটি এ বাড়িতে এলো সেটি মরে গিয়েও মৃত্যুকে অস্বীকার করল যেন, সমহিমায় জীবনে ফিরে এলো। আর আজ গাছটি অনন্তধামে পাড়ি দেয়া এ বাড়ির সেজোবৌ রাণী সরকারের হাসি ছড়াচ্ছে তার রাণী গোলাপি ফুলের শোভায়।

আসলে কেউ-ই মরে গিয়ে একেবারে চলে যায় না। রয়ে যায় কোথায়ও না কোথায়ও, কারও না কারও হৃদয়ে, প্রকৃতি-পরিবেশে -সেই না-দেখা মেয়ে হ্যাপী, আমার বড় মামী, সেজো মামীর মতো করে।

তাঁরা সবাই ভালো থাকুন অনন্তলোকে। ???