চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

প্রকাশিত: ১১:২৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২৩

চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১১ এপ্রিল ২০২৩ : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আর নেই।

অসুস্থতা নিয়ে ঢাকার ধানমণ্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু ঘটেছে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক মামুন মোস্তাফী সাংবাদিকদের এই খবর নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুর খবর জানিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফেইসবুক পাতায় বলা হয়েছে, “গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাণ পুরুষ, প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল ২০২৩) আনুমানিক রাত ১০:৪০ এ গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।”

স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

একাত্তরে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিয়োগকারী জাফরুল্লাহর পরে বড় অবদান ছিল জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলে কম খরচে দরিদ্রদের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করায়ও তার অবদান স্মরণ করা হয়।
মুক্তি সংগ্রামী জাফরুল্লাহ চৌধুরী রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

Manual3 Ad Code

বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শ পাওয়া জাফরুল্লাহ রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা ভূমিকা রেখে চলছিলেন। তবে এই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিতি গড়ে উঠেছিল তার।

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগবিরোধী দলগুলোকে এক মঞ্চে এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

নানা রোগে কাবু হয়ে গত কিছুদিন ধরে হাসপাতালে ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর তার লিভারেও সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া তিনি অপুষ্টিসহ সেপটিসেমিয়ায় আক্রান্ত বলে চিকিৎসকরা জানান।

গত ৩ এপ্রিল নগর হাসপাতালে ভর্তির পর সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল। গত রোববার তার শারীরিক অব্স্থার উন্নতি না হলে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। অবস্থার অবনতি না ঘটল তাকে সোমবার নেওয়া হয়েছিল ‘লাইফ সাপোর্টে’।

এরপর মঙ্গলবার সকালে মেডিকেল বোর্ড বসে তার রক্তে সংক্রমণ পাওয়ার কথাও জানায়। তবে দুপুরে তার কিডনি ডায়ালাইসিস শুরু করা হয়েছিল। এরপর রাতেই এল মৃত্যুর খবর।

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। ১৯৬৪ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।

Manual7 Ad Code

এরপর উচ্চ শিক্ষা নিতে তিনি যুক্তরাজ্যে গেলেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পড়াশোনা বাদ রেখে দেশের টানে ছুটে আসেন।

লন্ডন থেকে ফিরে ভারতের আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রথমে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন জাফরুল্লাহ, পরে সেখানেই ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিবেদিত হন। তার এই বড় ভূমিকার কথা এখনও স্মরণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

স্বাধীনতার পর মেলাঘরের সেই ফিল্ড হাসপাতালকে ঢাকার ইস্কাটনে নিয়ে আসেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী, পরে গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘চল গ্রামে যাই’ এই স্লোগান নিয়ে হাসপাতালটি সাভারে স্থানান্তরিত হয়। তখন এর নামকরণ হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর নারীর ক্ষমতায়নে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রায় অর্ধেক কর্মী নেওয়া হয়েছিল নারীদের মধ্য থেকে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৭৯ সাল থেকে জাতীয় শিক্ষা কমিটির ও নারী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৮২ সালে প্রণীত জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নে অবদান রাখেন তিনি।

কোভিড মহামারীর সময় গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে নমুনা পরীক্ষার কিট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি, যদিও সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি।

দুটি কিডনি নষ্ট হওয়ার পরও নানা সঙ্কটে সমাধান খুঁজতে ছুটে বেড়িয়েছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

Manual1 Ad Code

১৯৭৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এশিয়ার নোবেল পুরস্কার হিসাবে পরিচিত ‘র‌্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কার তিনি পান ১৯৮৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি ইউনিভার্সিটি ২০০২ সালে তাকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ হিসেবে সম্মাননা দেয়।

Manual2 Ad Code

খুবই সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী; কোনো দলে যুক্ত না হলেও রাজনীতি সচেতন এই ব্যক্তি বলতেন- “আমি মানুষের রাজনীতি করি।”

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মৃত্যুতে ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা এমপি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, তাঁর এই মহাপ্রয়াণে নাগরিক অধিকার ও জন স্বাস্থ্য আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। বিবৃতিতে তারা বলেন, জনাব ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ গড়ে তুলে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার দেয়ায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। সে সময় তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসী চিকিৎসকদের সংগঠিত করেন এবং ফিল্ড হাসপাতালের জন্য ঔষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম যোগাড় করায় ভূমিকা রেখেছিলেন। জনাব চৌধুরীর বড় অবদান প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭৭ সালে সরকার তাকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত করে। বিবৃতিতে তারা বলেন, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী মৃত্যুতে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।

সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক প্রকাশ

আজীবন মুক্তি সংগ্রামী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ অামিরুজ্জামান।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ