দেবীদ্বার মুক্তদিবস অাজ

প্রকাশিত: ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০২৩

দেবীদ্বার মুক্তদিবস অাজ

Manual4 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিবেদক | কুমিল্লা (দক্ষিণ), ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ : কুমিল্লার দেবীদ্বার মুক্তদিবস অাজ।

Manual4 Ad Code

১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর দেবীদ্বার পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করার লক্ষ্যে আজ দেবীদ্বার উপজেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। সকাল ৯টায় সর্বস্তরের জনতার উপস্থিতিতে উপজেলা কমপ্লেক্স থেকে একটি বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের স্মরনে দেবীদ্বার নিউমার্কেট মুক্তিযোদ্ধাচত্বর ও গণকবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।

১৯৭১ সলের রক্তে ঝরা দিনগুলোতে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে হানাদার মুক্ত হয়েছিল কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল। তারই ধারাবাহিকতায় দেবীদ্বার এলাকা হানাদার মুক্ত হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথভাবে ওইদিন হানাদারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে। ৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ সেতুটি মাইন বিষ্ফোরনে উড়িয়ে দেয়। মিত্রবাহিনীর ২৩ মাউন্ড ডিভিশনের মেজর জেনারেল আর.ডি হিরা’র নেতৃত্বে বৃহত্তর কুমিল্লায় এ অভিযান পরিচালিত হয়। মিত্রবাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুড়িচং ব্রাক্ষনপাড়া হয়ে দেবীদ্বারে আসে। হানাদাররা ওই রাতেই দেবীদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসে পালিয়ে যায়। ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ দেবীদ্বার সদরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ দিনে দেবীদ্বারের উল্লাসিত জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে বিজয় উল্লাসে ‘জয়বাংলা’ স্লোগানে মেতে উঠে। দুপুর পর্যন্ত ওইদিন হাজার হাজার জনতা বিজয় উল্লাসে উপজেলা সদর প্রকম্পিত করে তোলে।

Manual7 Ad Code

ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার কসবা এলাকায় নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫ সদস্যের একটি পাক সেনার দল, পায়ে হেঁটে ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়ক হয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি বর্তমান কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসের দিকে যাত্রা শুরু করে। ৩১ মার্চ কাক ডাকা ভোরে ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়কের দেবীদ্বার উপজেলার ভিংলাবাড়ি নামক স্থানে ওই হায়েনার দলটি জনতা কর্তৃক প্রথম অবরুদ্ধ হয়। পাক সেনারা ধাওয়া খেয়ে দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামে ঢুকে এক গৃহবধূর শ্লীলতা হানীর চেষ্টাকালে আবুল কাসেম নামে এক যুবক ইট দিয়ে আঘাত করলে পাক সেনাদের গুলিতে তিনি প্রথম শহীদ হন। বিক্ষুব্ধ জনতা দেবীদ্বার থানার অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে ওই অস্ত্র এবং বঙ্গজ হাতিয়ার লাঠি, দা, সাবল এমনকি মরিচের গুড়া নামক অস্ত্রটিও শক্র নিধনে ব্যবহার করেছিল সেদিন। শক্রসেনারা বারেরা কোড়েরপাড় পৌছার পর হালচাষরত কৃষক সৈয়দ আলী শক্রসেনাদের দেখে হাতের পাজুন দিয়ে পাক সেনাদের পেটাতে থাকে, পাকসেনাদের গুলিতে সহকর্মী মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে আব্দুল মজিদ ঝাটা নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে বরণ করে হায়েনাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে শহীদ হন।

Manual4 Ad Code

এমনি করে ভিংলাবাড়ি থেকে জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ পর্যন্ত পনের কিলোমিটার পথে হাজার হাজার নিরস্ত্র ও সশস্ত্র বাঙ্গালীর সাথে পাক হায়েনাদের দিনব্যাপী যুদ্ধে পথিমধ্যে আট পাকসেনাকে হত্যাপূর্বক মাটিতে পুতে ফেলে এবং জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদটিকে ব্যাঙ্কার বানিয়ে আশ্রয় নেয়া অবশিষ্ট সাত জনকে হত্যাপূর্বক বস্তা বন্দি করে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে প্রখ্যাত রাজাকার আফসু রাজাকার এবং আলী আহাম্মদ রাজাকারের নেতৃত্বে এ এলাকাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছিল। ‘ভিংলাবাড়ি- জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধ’ খ্যাত ওই যুদ্ধে আবুল কাসেম, সৈয়দ আলী, আব্দুল মজিদ, তব্দল ড্রাইভার, মমতাজ বেগম, সফর আলী, নায়েব আলী, সাদত আলী, লালমিয়া, ঝারু মিয়া, আব্দুল ড্রাইভার, ফরিদ মিয়া, আব্দুর রহিমসহ ৩৩ বাঙ্গালী শহীদ হয়েছিলেন।।

Manual5 Ad Code

কুমিল্লা মুক্তিযোদ্ধা সংসদদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিউল অহমেদ বাবুল জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টামন্ডুলীর সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত ‘বিশেষ গেরিলাবাহিনী’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড আব্দুল হাফেজ, পালাটোনা ক্যাম্প প্রধান কিংবদন্তী যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, মুক্তি যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আজগর হোসেন মাষ্টার, সাবেক এমএনএ আব্দুল আজিজ খান, শহীদ নুরুল ইসলাম, শহীদ শাহজাহানসহ অসংখ্য কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধার অবদান ছিল স্মরনীয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট দেবীদ্বারের খুব কাছে থাকার কারণে এ এলাকার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যেমন বেশী ছিল, তেমনি রাজাকারদের সহযোগিতায় এ অঞ্চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে এ এলাকার মানুষ। এছাড়াও সমতট রাজ্যের রাজধানী খ্যাত এবং হিন্দু অধ্যুসিত বরকামতা গ্রামে পাক হানাদাররা হামলা চালানোর সংবাদে কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল হাফেজের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ হাজার বাঙ্গালী মাত্র দুটি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও লাঠি নিয়ে শক্রসেনাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। রাইফেলের গুলিতে এক প্লাটুন সৈন্যের পাঁচজন লুটিয়ে পড়লে কিংকর্তব্য বিমূঢ় পাক সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ওই রাতে ফিরে এসে হিংস্র হায়েনারা লুটপাট, নির্যাতনসহ অগ্নিসংযোগে পুরো গ্রামটি জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ