সিলেট ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২৪
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০ জানুয়ারি ২০২৪ : “আমরা বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে আছি, এখান থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের লেনিনকে জানার দরকার। নিজের থেকে বেরিয়ে আসতে পারে যারা, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হবে।”
শনিবার (২০ জানুয়ারি ২০২৪) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান মিলনায়তনে রুশ বিপ্লবের স্থপতি লেনিনের জীবনভিত্তিক প্রথম বাংলা উপন্যাস ‘লেনিন’র প্রকাশনা উৎসবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রথমে এই রকম একটি বই লেখার জন্য আশানুর রহমানকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। লেনিন উপন্যাসটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো, যখন তার মৃত্যুবার্ষিকী। তার এই মৃত্যুকে অকাল মৃত্যু বলা যায়। তার এই মৃত্যুর শত বছর হচ্ছে আগামীকাল। কিন্তু এই উপন্যাসের মাধ্যমে লেনিন আমাদের কাছে অন্যভাবে উপস্থাপিত হলো। আর এই রকম ব্যক্তিকে নিয়ে উপন্যাস লেখা বিরাট সংগ্রাম ও সাহসের ব্যাপার।
সাংবাদিক নুরুল কবির বলেন, আমার এক শিক্ষক বলতেন পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর যেটুকু মনে থাকে, তা-ই হলো শিক্ষা। আমার মতে ঐতিহাসিক উপন্যাস হলো, মূল চরিত্র একদিকে ইতিহাসের ভেতরে বেড়ে উঠেছেন, অন্যদিকে তিনি ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছেন। এই দুটি দিক অবশ্যই থাকতে হবে। এখানে একজন এই উপন্যাসকে বস্তুনিষ্ঠ বলেছেন, কিন্তু আসলে বস্তুনিষ্ঠ হলে তো সেটি আর উপন্যাস থাকে না, উপন্যাসে থাকে নাটকীয়তা। উপন্যাসটি পড়ে আমার প্রথম মনে হয়েছে এটি তার মাকে নিয়ে উপন্যাস। আর উপন্যাসের সময় আরেকটু এগোতে পারতো।
সাংবাদিক শামসুল আরেফিন বলেন, আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করেছি, সেখানে থেকেছি। সোভিয়েতের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। যে কারণে আমার জন্য অন্যতম ভালো লাগা এই উপন্যাস। লেনিনের মতো মনুমেন্টাল চরিত্রকে নিয়ে উপন্যাস লেখার সময় সচেতনভাবে ‘তিনি’ না বলে ‘সে’ বলে সম্বোধন করেন। এখানে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন লেনিনের প্রতি লেখকের টান যেন এখানে প্রকাশ না পায়। আমার কাছে লেখকের এই জিনিসটা ভালো লেগেছে। বইটিতে লেখক নৈতিকতার চাইতে প্র্যাক্টিক্যাল রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার লেনিন পঠন-পাঠনের জানা থেকে লেনিনকে যেমন প্র্যাক্টিক্যাল রাজনীতিবিদ মনে হয়েছে, এই উপন্যাসটিতে তেমনই মনে হয়েছে।
কবি ও কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম বলেন, লেখক আশানুর রহমান এবং আমার সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে। আমিও ব্যাংকার, সে-ও ব্যাংকার। আমারও প্রথম উপন্যাস ঐতিহাসিক উপন্যাস। লেখক বই নিয়ে কী করতে পারতেন বা করা উচিত তা নিয়ে আমি বলবো না। আমার মনে হয় লেখক লেখেন এবং লেখা তৈরি হয়ে যায়। এটি লেখকের স্বাধীনতা। আমাদের বর্তমান যে পরিস্থিতি, সবাই নিজ নিজ সুবিধা খুঁজে নেওয়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ যদি কেউ লেনিন উপন্যাসে খোঁজেন, তাহলে তিনি পাবেন না। এটা লেখকের স্বাধীনতা বলে আমি মনে করি। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবে উপস্থাপন করেন।
কথাপ্রকাশের কর্ণধার জসিম উদ্দিন সূচনা বক্তব্যে বলেন, কথা প্রকাশ মানুষের জ্ঞানচর্চার সহায়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে এবং করে যেতে চায়। পাঠকরা কথা প্রকাশের সঙ্গে না থাকলে তা এতদূর এগোতো পারতো না। আমরা আমাদের পাঠকের কাছে এই বই (লেনিন) তুলে ধরতে পেরে আমরা আনন্দিত। এই বইয়ে পাঠক অন্য এক লেনিনকে আবিষ্কার করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
বইয়ের লেখক আশানুর রহমান বলেন, এটি আমার প্রথম উপন্যাস। আমার নিজের ওপর আস্থার ঘাটতির কারণেই এই বই প্রকাশ করতে ছয় বছর লাগে। আমাদের বাড়িতে ছোটবেলায় ছোটদের লেনিন বই পড়েছিলাম। সেখান থেকেই লেনিনের প্রতি আমার ভালো লাগা। এই উপন্যাসে আমি বিপ্লব পর্যন্তই নিয়েছি। এর পরের ঘটনা খুবই জটিল ও ঘটনাবহুল, যে কারণে আমি সেদিকে আগাইনি। এরপর অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন দ্বিতীয় খণ্ডে হতে পারে সেটি। সে রকমও একটা পরিকল্পনা হতে পারে। আমি এখনও সে বিষয়ে কিছু ভাবিনি। আপাতত বইটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকুক।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যের আগে সবাই মিলে উপন্যাসটির মোড়ক উন্মোচন করেন। এ সময় আরও বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, অনুবাদ কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম।
অনুষ্ঠান সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন রুছেলী খান।
উপন্যাসটি লেখার প্রেক্ষাপট :
বিশ শতকের নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর রুশ বিপ্লবের নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এখন বাংলাদেশে আলোচিত এক ঐতিহাসিক চরিত্র।
কিন্তু পুরো বিংশ শতাব্দীজুড়ে দেশে দেশে লেনিনের প্রভাব ছিল অবিস্মরণীয়। ঐতিহাসিক এ কিংবদন্তি নায়ককে নিয়ে এবার বাংলায় উপন্যাস লিখেছেন আশানুর রহমান।
‘লেনিন’ লেখকের প্রথম উপন্যাস।
উপন্যাসে আছে—বালক ভ্লাদিমিরের লেনিন হয়ে ওঠার গল্প যেন একদিকে রুশ ইতিহাসের আলোড়ন, অন্যদিকে উলিয়ানভ পরিবারের একটানা বিয়োগাত্মক কাহিনি। ইতিহাসের কামারশালার আগুনে আর পারিবারিক শোকগাথায় গড়ে ওঠে লেনিনের মন। জারের হাতে বিপ্লবী বড় ভাই সাশার মৃত্যু কিশোর লেনিনকে দেখিয়ে দেয় জীবনের দিশা। সেই জীবনে প্রেম আসে নাদিয়া ও ইনেসার আকর্ষণ নিয়ে। ভালোবাসার আহ্বান ছিল ইয়াসনেভা ও এলিজাবেতের কাছ থেকেও। কিন্তু লেনিন যেন কাছে থেকেও দূরে, দূরে থেকেও অন্তর্গত রক্তের ভেতরে। শুধু প্রেমে নয়, বন্ধুত্বেও লেনিন যেন অধরা থেকে যায় ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের কাছে। শ্রমিকের সঙ্গে তিনি শ্রমিক, অরণ্যে শিকারি, প্যারিসের আড্ডায় তুখোড় বুদ্ধিজীবী আর ব্রিটিশ মিউজিয়মের নির্জনতায় এক আচ্ছন্ন পাঠক।
উপন্যাসে লেনিনের চলাচল ইউরোপের ভূগোলজুড়ে। সাইবেরিয়ার বরফজীবনের নির্বাসন থেকে সুইজারল্যান্ড, লন্ডন, প্যারিস, ব্রাসেলস আর পুরো রাশিয়াজুড়ে ছড়ানো তার কক্ষপথ। কখনো মনে হয় তিনি নিষ্ঠুর, কখনো বিষাদময় ও নিঃসঙ্গ। ইনেসাকে কবরে শুইয়ে কাঁদছেন লেনিন। এ লেনিনই তো পিটার্সবার্গের ক্ষমতা দখলের আগে ও পরে শান্ত—যেন বিপ্লবের রেলগাড়িটার বিজ্ঞ চালক। ইতিহাসের শীতল বরফে মোড়ানো লেনিনের কঠিন ব্যক্তিত্বের তলায় যে উষ্ণ জীবনস্রোত–এ উপন্যাস যেন তারই নিবিড় বয়ান।
লেখক আশানুর রহমান এক সময় সক্রিয় বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। জীবনীভিত্তিক উপন্যাস নির্মাণে লেখক ‘লেনিন’কে নিয়ে জানা-বোঝা, সংগ্রাম থেকে ইতিহাস পাঠ আর কল্পনা থেকে অনন্য এক চরিত্র হাজির করেছেন। আলোচকরা আশা প্রকাশ করেন যে, নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে বামপন্থি আন্দোলনের নিস্তরঙ্গ সময়ে বইটি নতুন করে লেনিনকে নিয়ে ভাববার অবকাশ সৃষ্টি করবে।
‘লেনিন’ উপন্যাসটির প্রচ্ছদ করেছেন মেহেদী হাসান। বইটির বিক্রয় মূল্য ৪৫০ টাকা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি