সমবায় মালিকানা প্রতিষ্ঠার দাবীতে মৎস্যজীবীদের বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে উপদেষ্টা বরাবরে খোলাচিঠি

প্রকাশিত: ১১:৪৪ অপরাহ্ণ, মে ২৭, ২০২৫

সমবায় মালিকানা প্রতিষ্ঠার দাবীতে মৎস্যজীবীদের বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে উপদেষ্টা বরাবরে খোলাচিঠি

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ), ২৭ মে ২০২৫ : বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বরাবরে খোলাচিঠি প্রেরণ করেছে মৎস্যজীবীরা।

দেশব্যাপী মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর সমাজভিত্তিক প্রথাগত ও সমবায় মালিকানা দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা দিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা।

দেশব্যাপী ইজারা বাতিল পদ্ধতি বাতিল করে বাঁওড়সহ জলমহালে সমাজভিত্তিক প্রথাগত ও সমবায় মালিকানার ৪ দফা দাবিতে মৎস্য উপদেষ্টা বরাবরে খোলা চিঠি প্রেরণ ও কোটচাঁদপুরে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ মে ২০২৫) সকালে ইজারা পদ্ধতি বাতিল করে বাঁওড়সহ দেশব্যাপী সকল জলমহালে মৎস্যজীবী জেলেদের সমাজভিত্তিক সমবায় মালিকানা প্রতিষ্ঠার ৪ দফা দাবিতে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর বলুহর বাসস্ট্যান্ডে বাংলাদেশ বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে শত-শত মৎস্যজীবী জেলে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা দাবিদাওয়া সহকারে ফেস্টুন হাতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে জড়ো হয়। বিক্ষোভ মিছিল শেষে কোটচাঁদপুর বলুহর বাসস্ট্যান্ডে বাংলাদেশ বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলনের আহ্বায়ক নির্মল হালদারের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব সুজন বিপ্লবের সঞ্চালনায় বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন আন্দোলনের অন্যতম উপদেষ্টা; বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান, ক্ষেতমজুর সমিতি ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি কাজী ফারুক, বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এসএম চন্দন প্রমুখ।

Manual7 Ad Code

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক বাসুদেব বিশ্বাস, বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলন যশোর জেলা সংগঠক মনোরঞ্জন হালদার, মাগুরা জেলা সংগঠক হিমাংশু দেব বর্মন, মশিয়ার রহমান, ঝিনাইদহ জেলা সংগঠক পরিতোষ হালদার, সাধন হালদার, সাধন বসু, শীতল হালদার, নিত্য হালদার, শীলা হালদারসহ শত শত জেলে সদস্যগণ। বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষে উপজেলা পরিষদে মতবিনিময় সভায় বাঁওড় আন্দোলনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেছেন।

Manual4 Ad Code

৪ দফা দাবিতে সমাজভিত্তিক সমবায় মালিকানা বাস্তবায়নে পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, অবিলম্বে বাঁওড় জলমহালসমূহের ইজারা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে জেলেদের ন্যায়সঙ্গত মালিকানার স্বীকৃতি দিয়ে সমাজভিত্তিক সমবায় মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্যজীবীদের অনুকূলে ও জাতীয় স্বার্থে জলমহাল ব্যবস্থাপনা আইন সংশোধন করতে হবে। জাতীয় বাঁওড় উন্নয়ন বোর্ড, স্বতন্ত্র বাঁওড় জলমহাল নীতিমালা ও বাঁওড় জেলেদের প্রান্তিক শ্রমিক হিসাবে নিজস্ব সংগঠন ও অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিতে হবে।

বাঁওড় জলমহালে মাছ চাষে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের অর্থায়নে ও জেলেদের সাথে ন্যায্য উৎপাদনের অংশীদারিত্ব চুক্তি করতে হবে। মাছ উৎপাদনে ৬০ শতাংশ মালিকানা জেলেদের অধিকার ও ৪০ শতাংশের মালিকানা রাষ্ট্রপক্ষ অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।

বাঁওড় উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের শুমারি, তালিকাবদ্ধ ও মৎস্যজীবী জেলে কার্ড প্রদান করতে হবে। বাঁওড় জেলেদের রেশনের এর ব্যবস্থা করতে হবে।

Manual2 Ad Code

বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি না করে বাঁওড় জলাশয়ে মাছের প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা, বাঁওড় জেলেদের উন্নত জীবন-জীবিকা-কর্মসংস্থানের নিরাপদ পরিবেশ ও ষাটোর্দ্ধদের পেনশন দিতে হবে।

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বলুহর বাওড় পরিদর্শন করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। এসময় তিনি স্থানীয় বাওড় পাড়ের মৎস্যজীবী হালদার সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

মঙ্গলবার (২৭ মে) সকাল ১০টায় বলুহর বাওড় পরিদর্শন করেন উপদেষ্টা। পরে বেলা সাড়ে ১১টায় কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে মৎস্যজীবী জেলে সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি ফজলুর রহমান, মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন, বাঁওড় আন্দোলনের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব প্রমুখ। মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করে বাঁওড় জেলেদের জাতীয় প্লাটফর্ম- বাংলাদেশ বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলনের পক্ষে জেলে নেতৃবৃন্দ এসময় দাবিদাওয়াভিত্তিক খোলা চিঠি মৎস্য উপদেষ্টার হাতে প্রেরণ করেছেন।

সভায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি, বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘকাল ধরে আমরা জানি- “জাল যার, জলা তার”। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বিতাড়িত করে ইজারা প্রথা চালুর ফলে বাঁওড় ও প্রাকৃতিক জলমহালগুলো প্রভাবশালীদের কাছে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। বাঁওড়গুলোতে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন ধ্বংস হয়ে গেছে। বাঁওড়গুলোতে বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃত্রিম খাবার ও রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ফলে জলমহালগুলো তার প্রাকৃতিক রূপ হারিয়েছে।

মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলেন, শত শত বছর ধরে হালদার মৎস্যজীবীরা বাঁওড়ে মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার জলমহাল নীতি সংশোধন করে বাঁওড়গুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে অমৎস্যজীবীদের মাঝে ইজারা দেয়। ইজারা নিয়ে প্রভাবশালী মহলের লোকজন বাঁওড়ে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। ইজারাদাররা বাঁওড়ে মৎস্য আহরণ ও বাঁওড়পাড়ের বাসিন্দারের ওপর নানাভাবে হয়রানি করে আসছে।
মৎস্যজীবীরা বলেন, জেলে সম্প্রদায়ের প্রকৃত মৎস্যজীবীরা আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে। জীবিকা হারিয়ে আজ মৎস্যজীবীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। প্রভাবশালীরা বাঁওড় ইজারা নিয়ে মৎস্যজীবীদের বাঁওড়ে অঘোষিত ভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এত মানুষ শহিদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশের সকল বাঁওড়ের ইজারা বাতিল করতে হবে। জলমহাল নীতিমালা সংস্কার করে জেলেদের জীবিকায়নে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। জলমহাল ও বাঁওড় জলাভূমি সুরক্ষায় জেলেদের প্রথাগত ও লোকয়ত জ্ঞানের সদ্ব্যবহারে পরিবেশ, প্রকৃতি ও বাঁওড়পাড়ের মৎস্যজীবীরাও বাঁচবে বলে সভায় জোরদারভাবে দাবিদাওয়া উত্থাপিত হয়েছে।

মতবিনিময় সভায় মৎস্যজীবী জেলে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা ইজারা পদ্ধতি বাতিল করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মাঝে বাঁওড় ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান।

Manual6 Ad Code

সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “জল যার-জলা তার, এই নীতি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করবো। তরুণ প্রজন্ম আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। এই প্রজন্মই সমাজের সকল বৈষম্য দূর করবে। প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মাঝে বাঁওড়ের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আমি ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সকল দপ্তরে কথা বলবো। বাঁওড়পাড়ের বাসিন্দাদের কাছে বাঁওড়ের প্রকৃত মালিকানা ফিরিয়ে দিয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও সামাজিক সকল পক্ষকে এ বিষয়ে সংহত হতে হবে।”