ধানমন্ডি লেকে গাছে গাছে ঝুলছে বইয়ের বাক্স

প্রকাশিত: ১:১৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০২৫

ধানমন্ডি লেকে গাছে গাছে ঝুলছে বইয়ের বাক্স

Manual2 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ : রাজধানীর ধানমন্ডি লেকের পথ ধরে হাঁটলে এখন চোখে পড়ে এক অভিনব দৃশ্য—গাছের ডালে ঝুলছে কাঠের ছোট ছোট বাক্স, দেখতে অনেকটা পাখির বাসার মতো। তবে ভেতরে পাখি নয়, সারি সারি সাজানো রয়েছে গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনীসহ নানা ধরনের বই। লেকপাড়ে হাঁটতে আসা পথচারীরা চাইলে এই বাক্স থেকেই বই তুলে নিয়ে পড়তে পারেন। আবার পড়া শেষে নির্ধারিত জায়গায় রেখে যাওয়াই নিয়ম।

বিদেশের বিভিন্ন দেশে ‘স্ট্রিট লাইব্রেরি’ বা ‘ফ্রি বুক শেলফ’-এর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে বহু বইপ্রেমীই দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি উদ্যোগের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু এবার সে স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছে ঢাকায়, ধানমন্ডি লেককে কেন্দ্র করে।

Manual5 Ad Code

জার্মানির ভিডিও থেকে অনুপ্রেরণা

Manual1 Ad Code

এই অভিনব প্রকল্পের উদ্যোক্তা জাকিয়া রায়হানা রূপা, পেশায় বইপ্রেমী এবং সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। কিছুদিন আগে তিনি ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখেন, যেখানে দেখা যাচ্ছিল জার্মানির বিভিন্ন রাস্তা, পার্ক, বাসস্টপ এমনকি জঙ্গলেও ছোট ছোট বুক সেলফ স্থাপন করা হয়েছে। মানুষ বই পড়ছেন, কেউ আবার নিজের সংগ্রহ থেকে বই রেখে দিচ্ছেন।

ভিডিওটি দেখে রূপার মনে প্রশ্ন জাগে—“জার্মানিতে যদি সম্ভব হয়, বাংলাদেশে কেন নয়?” ভাবনাটিই পরিণত হয় বাস্তব কাজে। ধানমন্ডি লেকের পাশে রূপার বাসা হওয়ায় প্রথম পরীক্ষামূলক আয়োজন শুরু হয় এখান থেকেই।

মাত্র ৫টি বই দিয়ে যাত্রা শুরু

গত বছরের ১৬ নভেম্বর রূপা প্রথম বুককেসটি স্থাপন করেন। সেই কেসে ছিল মহিউদ্দিন মোহাম্মদের পাঁচটি বই। কেউ নেবে কি না, আদৌ টিকবে কি না—সব প্রকার সন্দেহ নিয়েই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। কিন্তু লেকপাড়ের মানুষদের সাড়া দেখে তিনি উৎসাহ পান আরও কেস স্থাপনে।

এক বছরের মধ্যেই বর্তমানে ধানমন্ডি লেকজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে মোট ১০টি বুককেস। স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, শিক্ষার্থী, এমনকি বইপাগল অনেকেই নিয়মিত এসব বাক্সে বই দান করছেন। কেউ নতুন বই রাখছেন, কেউ পুরোনো বই তুলে নিচ্ছেন বিনিময়ে পড়ার জন্য।

মানুষের সাড়া—উদ্যোগে নতুন প্রাণ

বুককেসগুলো যত দিন যাচ্ছে, ততই জনপ্রিয় হচ্ছে। লেকের ধারে সকালে ব্যায়াম করতে আসা মানুষ থেকে শুরু করে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা—সবাই কৌতূহল নিয়ে থেমে থেমে বই দেখছেন। কেউ হাঁটতে হাঁটতে বই নিয়ে বসেছেন বেঞ্চে, কেউ আবার ধার নেওয়া বই ফিরিয়ে রেখে গেছেন পরের পাঠকের জন্য।

লেকপাড়ে দেখা মিলল কলেজছাত্রী নওরীন ইসলামের, হাতে বই গণিতের গল্প। তিনি বলেন, “এ ধরনের উদ্যোগ বইপ্রেমীদের কাছে স্বপ্নের মতো। লাইব্রেরিতে না গিয়েও খোলা আকাশের নিচে পড়ার অন্যরকম আনন্দ আছে।”

Manual8 Ad Code

চুরি বা ভাঙচুর হয়নি—মানুষের সচেতনতা বাড়ছে

উদ্যোক্তা রূপার ভাষায়, শুরুতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল—বই কি টিকে থাকবে? বাক্স কি ভেঙে ফেলা হবে? কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং মানুষ বইয়ের প্রতি আন্তরিকতা দেখিয়েছে। রূপা বলেন, “এটা মানুষকে বিশ্বাস করার একটা উদ্যোগ। আর সবাই সেই বিশ্বাস রাখছে—এটাই আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।”

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশে ‘ওপেন বুকশেলফ’ সংস্কৃতির বিকাশ

এ উদ্যোগ বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জনসমাগমস্থলে বই রাখার ধারণা শুধু পাঠক বাড়ায় না, সম্প্রদায়ের মধ্যেও একটি ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড. তানভীর আরেফিন বলেন, “এ ধরনের উদ্যোগ জনপরিসরে পাঠচর্চার চর্চা তৈরি করে। মানুষ যখন নিজের ইচ্ছে ও আবেগ দিয়ে বই বিনিময় করে, তখন এর সামাজিক প্রভাব গভীর হয়।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

রূপা জানান, ধানমন্ডির বাইরে শিগগিরই তিনি বনানী, রামপুরা ও উত্তরা এলাকায় আরও কিছু বুককেস স্থাপন করতে চান। তবে তিনি মনে করেন, টেকসই উদ্যোগের জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত হওয়া জরুরি। কয়েকটি সংগঠন ইতোমধ্যেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলেও জানান তিনি।

শেষ কথা

যে দেশে পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে, সেখানে ধানমন্ডি লেকের এই ছোট ছোট বুককেসগুলো নতুন আশা দেখাচ্ছে। পাখির বাসার মতো দেখতে এই কেসগুলো শুধু বইই বহন করছে না—বহন করছে মানুষের বিশ্বাস, অভ্যাসের পরিবর্তন এবং সমাজে নতুন সংস্কৃতির বীজ।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ