আগামী ৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস: শ্রদ্ধা, স্মৃতি ও বেদনার দিন

প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০২৫

আগামী ৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস: শ্রদ্ধা, স্মৃতি ও বেদনার দিন

Manual8 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ : আগামী ৬ ডিসেম্বর পালিত হতে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় শ্রীমঙ্গল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, গণহত্যা ও নির্যাতনের পর স্বাধীনতার পতাকা উড়েছিল চা বাগানঘেরা এই জনপদের আকাশে।

স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন ও প্রতিরোধের সূচনা

Manual3 Ad Code

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরই শ্রীমঙ্গলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন গড়ে ওঠে। তৎকালীন সংসদ সদস্য আলতাফুর রহমান, কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরৗ ও ফরিদ আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এখানে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী।

২৩ মার্চ শ্রীমঙ্গল পৌরসভা চত্বরে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ। এ ঘটনার পর মুক্তিকামী জনতা আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।

নয় মাসের যুদ্ধ শেষে বিজয়ের আনন্দ

দীর্ঘ সংগ্রাম, লড়াই ও ত্যাগের পর ৬ ডিসেম্বর ভানুগাছ সড়ক হয়ে শ্রীমঙ্গল শহরে প্রবেশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। পৌরসভা চত্বরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয়ের উল্লাস। স্থানীয়দের ভাষায়—সেদিন পুরো শ্রীমঙ্গল যেন উচ্ছ্বাস ও আবেগে কেঁপে উঠেছিল।

চা শ্রমিকদের ত্যাগ: ভাড়াউড়া বধ্যভূমির নির্মম ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের বধ্যভূমি একটি গভীর বেদনাবহ অধ্যায়। যুদ্ধ চলাকালীন ৩০ এপ্রিল পাক-হানাদার বাহিনী যুদ্ধের ব্যাংকার তৈরির কথা বলে শহরসংলগ্ন ভাড়াউড়া চা বাগানের ৫৭ জন চা শ্রমিককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “এই বধ্যভূমিতে ৫৭ জন শ্রমিককে হত্যা করে পাক-হানাদার বাহিনী নির্মমতার এক জঘন্য নজির তৈরি করেছিল। এটি স্বাধীনতার ইতিহাসে ভয়াবহতম গণহত্যার একটি অধ্যায়।”

Manual8 Ad Code

তিনি জানান, ভাড়াউড়া বধ্যভূমিসহ শ্রীমঙ্গলের সব বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এলজিইডিতে আবেদন পাঠানো হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণকর্মসূচি

শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কুমুদ রঞ্জন দেব জানান, “মুক্ত দিবসের সকালে শ্রীমঙ্গল বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন বধ্যভূমিতে আমরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করব। সকল মুক্তিযোদ্ধা এতে অংশ নেবেন।”

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা এবং স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করবে।

শ্রীমঙ্গলের মানুষের অবদান স্মরণে

Manual3 Ad Code

স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রীমঙ্গলের সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং চা বাগানের শ্রমিকদের ত্যাগ আজও স্মরণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধায়। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা, গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখেও তারা সাহসিকতার সঙ্গে অবদান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধে।

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাস, বেদনা ও গৌরবের স্মৃতি বয়ে বেড়ায় শ্রীমঙ্গল। ৬ ডিসেম্বর তাই শুধু মুক্তির দিন নয়—এটি স্মরণ, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধেরও দিন।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ