প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক নিদর্শন রোয়াইলবাড়ি দুর্গ

প্রকাশিত: ৩:৫৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬

প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক নিদর্শন রোয়াইলবাড়ি দুর্গ

Manual7 Ad Code

মো. জিয়াউর রহমান | হাওরাঞ্চল (নেত্রকোনা), ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি দুর্গ—প্রাচীন বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। মোগল বা সুলতানী আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা এ দুর্গ আজ অবহেলা ও অরক্ষিত অবস্থায় ধুঁকছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা গেলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ইতিহাসের সাক্ষী রোয়াইলবাড়ি

Manual5 Ad Code

কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আমতলা ইউনিয়নের রোয়াইলবাড়ি এলাকায় দুর্গটির অবস্থান। দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এ নিদর্শন ১৯৮৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ৪৬ একর ভূমিকে পুরাকীর্তি এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সাইনবোর্ড টানিয়ে এলাকা সংরক্ষিত ঘোষণা করলেও নির্মাণ করা হয়নি বাউন্ডারি দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া।

Manual5 Ad Code

১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরিচালিত খননে কারুকার্যখচিত ইটের নির্মিত একটি বারো-দুয়ারি মসজিদ, প্রাসাদের চিহ্ন ও একটি সুড়ঙ্গপথের সন্ধান পাওয়া যায়। সুড়ঙ্গের পাশে একটি বটগাছের নিচে কথিত নিয়ামত বিবির মাজার এবং প্রায় ১২ হাত দীর্ঘ একটি কবরও রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ডেংগু মালের কবর’ নামে পরিচিত।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন করে খননকাজ শুরু হলে দুর্গের ফটকসহ আরও কিছু স্থাপনার সন্ধান মেলে। খননে পাওয়া কারুকার্যখচিত ইট ও পাথরের অস্থায়ী প্রদর্শনীও উপস্থাপন করা হয়। তবে বরাদ্দ ও পরিকল্পনার অভাবে সেই খননকাজও থেমে যায়।

নামের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ‘রোয়াইলবাড়ি’ শব্দটি আরবি ও বাংলা শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘রোয়াইল’ শব্দটি আরবি ‘রেইল’ বা ‘রালাহ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ অশ্বারোহী সৈন্যদল; আর ‘বাড়ি’ অর্থ বসবাসের স্থান। অর্থাৎ ‘রোয়াইলবাড়ি’ মানে দাঁড়ায় ‘অশ্বারোহী সৈন্যদলের আবাসস্থল’।

স্থানীয়ভাবে এটি ‘ঈশা খাঁর দুর্গ’ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ কামরূপ জয় করার পর তার পুত্র নছরৎ শাহ এ অঞ্চল শাসন করেন। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ঈশা খাঁ এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেন। তার মৃত্যুর পর দেওয়ান মজলিশ জালাল দুর্গ সংস্কার ও একটি সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেন, যা ‘মসজিদ-এ জালাল’ নামে পরিচিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। খননে পাওয়া মসজিদের ধ্বংসাবশেষকে অনেকেই সেই মসজিদ বলে মনে করেন।

সম্ভাবনা আছে, নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো

প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা দুর্গটি দেখতে আসছেন। তবে সেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, তথ্যকেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট কিংবা আধুনিক বিশ্রামাগার। জেলা পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত দুটি ছাতাকৃতির বিশ্রামাগার ছাড়া তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি।
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা থেকে ঘুরতে আসা নূর সালাম বলেন, “জায়গাটি অত্যন্ত সুন্দর ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপত্তা ও পর্যটকসুবিধা না থাকায় কিছুটা হতাশ হতে হয়। উন্নয়ন করা হলে এটি বড় পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে।”
স্থানীয়দের দাবি, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ দেশের একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

প্রশাসনের বক্তব্য

Manual5 Ad Code

কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিফাতুল ইসলাম বলেন, দুর্গ এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পর্যটকসুবিধা সম্প্রসারণে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে এটি জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠবে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে রোয়াইলবাড়ি দুর্গসহ জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় রোয়াইলবাড়ি দুর্গ শুধু নেত্রকোনার নয়, সমগ্র দেশের ঐতিহ্যের অংশ। পরিকল্পিত খনন, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—যাতে অবহেলায় হারিয়ে না যায় প্রাচীন বাংলার এই মূল্যবান ইতিহাস।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ