সিলেট ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৮ মার্চ ২০২৬ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রোববার আয়োজিত এক টাউন হল আলোচনাসভায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “সবার জন্য মর্যাদাসম্পন্ন সমঅধিকারই ছিল আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মূল কথা”। তার এ বক্তব্যই যেন নারী ও কিশোরীদের ক্ষমতা, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বাস্তবতা নিয়ে গভীর, তীক্ষ্ণ ও আত্মসমালোচনার সুর নির্ধারণ করে দেয়।
এ বছরের নারী দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য “রাইটস, জাস্টিস, অ্যাকশন: ফর অল উইমেন অ্যান্ড গার্লস”কে সামনে রেখে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন “হার ভয়েস, হার রাইটস” শীর্ষক এই টাউন হলটি আয়োজন করে।
শাহীন আনাম আরো বলেন, বাংলাদেশে নারীরা বহুবার সাহস, সক্ষমতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিলেও তারা বিভিন্ন সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে বারবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন।
তার ভাষায়, নারীরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে এখনো তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত।
তার মতে, অধিকার সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য। আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বানও জানান তিনি।
বেইজিং সম্মেলনকে তিনি নারীর অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সেখানে যে উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই টাউনহলে তরুণদের পাশাপাশি দলিত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিভিন্ন বিশ্বাস ও জেন্ডারের মানুষ এবং তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
খোলামেলা নাগরিক পরিসরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তারা সরাসরি আলোচক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।
অনুষ্ঠান শুরু হয় শাহীন আনামের স্বাগত বক্তব্য দিয়ে এবং পরে ইন্টারঅ্যাকটিভ টাউন হল আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।

আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ওয়াসিউর রহমান তন্ময় বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল, কিন্তু সংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রগুলোতে তারা এখনো প্রতিনিধিত্বের জায়গায় পিছিয়ে।
তিনি কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২৫ সালে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ২ হাজার ৮০৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৮৬টি ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এছাড়া বর্তমান বা অতীতে বিবাহিত নারীদের ৭২ শতাংশ স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন, ৬৩ থেকে ৭৮ শতাংশ নারী অনলাইনে সহিংসতার মুখে পড়েছেন, প্রায় ৫১ শতাংশ নারীর বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে গেছে, আর দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা মাত্র সাত।
তিনি আরো বলেন, এই আয়োজনের লক্ষ্য ছিল এমন একটি নাগরিক পরিসর তৈরি করা, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সংস্কার-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো সরাসরি তুলে ধরতে পারে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামসের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল অধিকার, কণ্ঠস্বর ও মর্যাদার সংগ্রামও।
তিনি বলেন, মানুষকে শুধু প্রশ্ন করতে শিখলেই হবে না, এ-ও জিজ্ঞাসা করতে হবে যে বাস্তবে সমতা নিশ্চিত হচ্ছে কি না।
অধিকারের গভীরতর তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিদিনের জীবনে অধিকার কীভাবে খর্ব হয়, তা বোঝার সামাজিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বাধাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া উপস্থিত শ্রোতা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন ও অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বঞ্চনার বহুমাত্রিক বাস্তবতা উঠে আসে। কেউ তুলে ধরেন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রতিদিনের অপমান ও অনিরাপত্তার কথা, কেউ বলেন প্রত্যন্ত ও তৃণমূল এলাকায় নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সীমিত সুযোগের কথা।
আলোচনায় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিস্তার, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়ে থাকা, রাজনীতিতে নারীর নগণ্য অংশগ্রহণ, এবং শিশুদের জীবনের শুরু থেকেই অধিকারবিষয়ক শিক্ষা শুরু করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলোও উঠে আসে।
অংশগ্রহণকারীরা প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি অপমানজনক আচরণ, যৌতুক, নির্যাতন, সামাজিক অবহেলা ইত্যাদির কথাও তুলে ধরেন। আলাদাভাবে উঠে আসে খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় বাল্যবিবাহের স্থায়ী উপস্থিতির বিষয়টিও। এসব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উই ক্যান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, অগ্রগতি সত্ত্বেও বৈষম্য এখনো সমাজের গভীরে প্রোথিত।
তিনি বলেন, মেয়েদের এমনভাবে বড় করা যাবে না যাতে তারা মনে করে, বিয়েই তাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ। সামাজিক চাপের আগে মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তার মতে, আইন থাকলেও পশ্চাৎমুখী মানসিকতা আমাদের পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
রাঙামাটি থেকে আসা মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুস্মিতা চাকমা বলেন, গত দুই বছরে অনেক জায়গায় বাল্যবিবাহ ও সহিংসতা বেড়েছে, অথচ ন্যায়বিচারের সুযোগ সীমিতই রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে আইন সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম, ধর্ষণের মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল।
আদিবাসী নারী ও কিশোরীদের বাস্তবতা হিসেবে তিনি এখনো সাধারণ নাগরিক হিসেবে সমান মর্যাদা ও সমান মূল্য দাবির কথা বলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুন নাহার বলেন, শিশুবিবাহ, বর্ষণ এবং বৈষম্যের নানা রূপের শেকড় নিহিত রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ও সেই সামাজিক মানসিকতায়, যা এখনো ব্যক্তি ও সমাজের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
তিনি বলেন, লড়াই শুধু ১৮ বছর বয়সসীমা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বড় প্রশ্ন হলো নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প কখনো আন্দোলনের বিকল্প হতে পারে না। সামাজিক পরিবর্তনে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন।
সিএসআইডির নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীদের বহুমাত্রিক এবং প্রায় অদৃশ্য বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী নারীরা এখনো জনপরিসরে বঞ্চনা, সীমিত সেবা এবং ব্যাপক সামাজিক অবহেলার মুখোমুখি। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বাস্তব চাহিদা ও কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবলমাত্র সংখ্যার উপস্থিতি হিসেবে দেখা হয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে সামগ্রিকভাবে বলা হয়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল প্রতীকী উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদ্যমান আইন আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার জবাবদিহিতা এবং সব সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, অধিকার, ন্যায়বিচার ও পদক্ষেপের দাবি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে হবে, যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি নারী ও কিশোরী মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কন্ঠস্বর নিয়ে বাঁচতে পারে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি