সিলেট ১০ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২, ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিবেদক | ভোলা, ০২ এপ্রিল ২০২৬ : বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভোলা জেলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা যুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভোলা জেলার মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমবারের মতো সংগঠিতভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই যুদ্ধ ভোলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
দেউলা যুদ্ধের পটভূমি
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। এই তথ্য স্থানীয় শান্তি কমিটির সভাপতি মতি সিকদারসহ কয়েকজন রাজাকারের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ধ্বংস করতে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯ সেপ্টেম্বর সকালে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন পাকসেনা, রাজাকার ও সহযোগী বাহিনী খেয়াঘাট থেকে নৌকাযোগে দেউলা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। গ্রামে পৌঁছে তারা গানপাউডার দিয়ে বাড়িঘরে আগুন দেয়, গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করে। গ্রামের মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দিকবিদিক ছুটে পালিয়ে যায়।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুতি ও কৌশল
মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে দ্রুত প্রস্তুতি নেয়। প্রায় ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা মাত্র ১৬টি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে প্রতিরোধের পরিকল্পনা করে। যে পথে পাকসেনাদের আসতে হবে সেই পথটি ছিল সরু এবং দু’পাশে পানি বেষ্টিত। মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলগতভাবে একটি দিঘির পাড়ের তিন দিকে অবস্থান নেয় এবং পাকসেনাদের অপেক্ষা করতে থাকে।
পাকসেনারা সরু পথ দিয়ে অগ্রসর হলে ল্যান্স নায়েক ও হাই কমান্ডার ছিদ্দিকুর রহমান প্রথম গুলি চালান। এরপর অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও একযোগে গুলি শুরু করেন। আকস্মিক আক্রমণে বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয় এবং অনেকে পানিতে পড়ে যায়। পরে পাকসেনারা সুপারি গাছের আড়ালে থেকে পাল্টা গুলি চালালেও মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
দেড় ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে এই সম্মুখ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ২৩ থেকে ২৪ জন পাকসেনা নিহত এবং ২২ জন আহত হয় বলে মুক্তিযোদ্ধাদের সূত্রে জানা যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই যুদ্ধে কোনো মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বা আহত হননি।
যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেন। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে ছিল স্টেনগান, চাইনিজ রাইফেল, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও পিস্তলসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি অস্ত্র।
যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
সেদিনের সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাদেক জানান, যুদ্ধ শেষে গ্রামের মানুষ ঢাল-সুরকি নিয়ে পানিতে পড়ে থাকা পাকসেনাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। পরে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়।
আরেকটি ঘটনায় জানা যায়, একজন পাকসেনা পথ ভুল করে গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধ শেষে গ্রামবাসী তাকে ধরে পিটিয়ে হত্যা করে। এছাড়া পাকসেনাদের ঘাটে বাঁধা নৌকাটিও স্থানীয়রা ডুবিয়ে দেয়। পরে অবশিষ্ট পাকসেনারা অন্য নৌকায় করে পালিয়ে যায়।
যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারা
এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক এমপি চুন্নু মিয়া, সাহাজাদা, দক্ষিণ দিঘলদীর মুছু ছিদ্দিক, সামছু মিয়া, অধ্যক্ষ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, বাংলাবাজারের আব্দুল কাদের, আব্দুল খালেক, তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা গোলাম মোস্তফা, আলম চৌকিদার, শানু, ডা. আব্দুর রহমান, কমিউনিস্ট পার্টির ইছাক জমাদ্দারসহ আরও অনেকে।
যুদ্ধের গুরুত্ব
দেউলা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, পাকবাহিনী সেদিন ব্যাপকহারে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় এবং নারীদের ওপর নির্যাতন চালায়। অল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তারা পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধের পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অনেক বেড়ে যায় এবং ভোলায় মুক্তিযুদ্ধ আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ইতিহাসে দেউলা যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষকদের মতে, দেউলা যুদ্ধ ভোলা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম বড় প্রতিরোধ যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। এই যুদ্ধের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সীমিত অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়েও সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। এটি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং পরবর্তী সময়ে ভোলার বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধকে আরও বেগবান করে।
উপসংহার
দেউলা যুদ্ধ শুধু একটি যুদ্ধ নয়, এটি ভোলার মানুষের সাহস, সংগঠন ও দেশপ্রেমের প্রতীক। অল্প অস্ত্র ও সীমিত শক্তি নিয়ে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীকে পরাজিত করার এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। জাতীয় পর্যায়ে এই যুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণা করা প্রয়োজন বলে মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষকরা মনে করেন।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভোলায় প্রথম প্রতিরোধ “দেউলা যুদ্ধ”কে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা-
ভোলার আকাশে জেগে ওঠে অগ্নিদীপ্ত দিন,
স্মৃতির ভাঁজে লেখা আছে রক্তে ভেজা ঋণ।
সেই যে একাত্তরের গাঢ় অন্ধকার ভোর,
দেউলার পথে জ্বলে ওঠে প্রতিরোধের শোর।
নদীর বুকে কুয়াশা ছিল, শঙ্কিত ছিল প্রাণ,
গ্রামের পথে ভয়ের ছায়া, নিভে গিয়েছিল গান।
হানাদারের বুটের শব্দ কাঁপায় জনপদ,
আগুন হাতে ছুটে আসে নিষ্ঠুর এক দণ্ড।
বোরহানউদ্দিন মাটির বুকে ঘনিয়ে ওঠে ক্ষণ,
অত্যাচারের আগুন ছড়িয়ে দগ্ধ করে মন।
ঘর পুড়ে যায়, কান্না ভাসে বাতাস জুড়ে বিষ,
নারীর জন্য অপমানের দগদগে রক্তলেখা যুদ্ধ।
তখন হঠাৎ দূর দিগন্তে বজ্রধ্বনি শোনা,
দামাল ছেলেরা জেগে ওঠে বুকের আগুনে সোনা।
ষোলটি শুধু থ্রি-নট-থ্রি, তবু সাহস ঢাল,
মৃত্যুকে তারা পায়ের নিচে করেছে নির্ভাল।
ছিদ্দিকুরের চোখে জ্বলে যুদ্ধের দৃপ্ত শপথ,
“মাটি আমার, রক্ত আমার, শেষ করিব শত্রুর রথ।”
দিঘীর পাড়ে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে যোদ্ধার দল,
সংকীর্ণ সেই পথের ধারে জাগে আগুন-ঝলক।
যেই না শত্রু এগিয়ে আসে অহংকারে ভর,
প্রথম গুলির শব্দ যেন বিদ্যুৎ চমক ঘোর।
একসাথে সব বন্দুক জ্বলে, কাঁপে চারি দিক,
মাটির বুক ফুঁড়ে উঠে প্রতিরোধের শ্লোক লিখ।
পড়ে যায় কত পাকসেনা আকস্মিক সেই ঘায়,
কারো দেহ নদীর জলে, কারো নিঃশ্বাস হায়।
তবু তারা পাল্টা গুলি ছোঁড়ে ভীত চিত্তে,
সুপারির গাছ আড়াল হয়ে বাঁচতে চায় মৃত্যু থেকে।
কিন্তু ততক্ষণে জেগে ওঠে স্বাধীনতার ঢেউ,
ভোলার মাটি বলে ওঠে— “আর নয়, থামাও সেই!”
যোদ্ধাদের সেই আক্রমণে ভেঙে পড়ে ভয়,
পিছু হটে শত্রু তখন, হার মানে সেই ক্ষয়।
দেড় ঘন্টার রণাঙ্গনে রচিত ইতিহাস,
রক্ত নয়, বিজয়ের গান— প্রতিরোধের শ্বাস।
একজনও শহীদ নয়, আহত নয় কেউ,
তবু শত্রুর বুক ভেদ করে গর্জে ওঠে ঢেউ।
স্টেনগান আর রাইফেলের ঝনঝন শব্দে,
লুটে নেয় তারা অস্ত্র শত্রুর কাঁপা কাঁপা হস্তে।
ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ অস্ত্র তখন মুক্তির হাতে ধরা,
শক্তি পায় নতুন করে লড়াইয়ের সে ধারা।
সাদেক বলে— “সেদিন ছিল আগুনে লেখা দিন,
আমরা ছিলাম মৃত্যুর সাথী, ভয় ছিল না বিন।”
চুন্নু মিয়া, গিয়াসউদ্দিন, কাদের, খালেক সাথে,
অজস্র নাম জেগে থাকে ইতিহাসের পথে।
গ্রামের মানুষ ফিরে এসে দেখে রণক্ষেত্র,
শত্রু পড়ে পানির বুকে নিথর, নিস্তব্ধ, পেত্র।
ঢাল-সুরকি হাতে নিয়ে ঘিরে ধরে চারি পাশ,
বিজয়ের সেই মুহূর্তে জাগে প্রতিশোধের শ্বাস।
ধরা পড়ে কত সৈন্য ভয়ে কাঁপা প্রাণ,
শেষে গুলির শব্দে থামে তাদের দুঃস্বপ্ন গান।
একজন পথ হারিয়ে লুকায় গ্রামের ঘরে,
মানুষ এসে চিনে ফেলে, শেষ হয় তার ভোরে।
ঘাটে বাঁধা নৌকা ডুবায় জনতারই হাত,
পালায় শেষে শত্রু দল ভেঙে মনোবল ঘাট।
দেউলার সেই রণাঙ্গন আজও কথা কয়,
স্বাধীনতার প্রথম শিখা সেখানেই জ্বলে রয়।
ছিদ্দিকুরের কণ্ঠে তখন দৃঢ় উচ্চারণ—
“এই লড়াইয়ে জিতবো আমরা, জাগবে স্বাধীন ধরণ।”
তার সেই ডাক ছড়িয়ে পড়ে নদী, মাঠ, বন,
ভোলার বুকেই জন্ম নেয় নতুন এক স্বপন।
সেই দিন থেকে মুক্তিযোদ্ধার চোখে আগুন জ্বলে,
ভয়ের শৃঙ্খল ছিন্ন করে এগোয় দলে দলে।
ছোট্ট সেই প্রতিরোধই দেয় অমর দিশা,
চূড়ান্ত বিজয়ের পথে খুলে দেয় নিশা।
ভোলা তখন আর কাঁদে না, জেগে ওঠে গান,
রক্তে লেখা স্বাধীনতার গৌরবময় মান।
দেউলার সেই যুদ্ধ শুধু একটি দিনের নয়,
জাতির বুকে অনন্তকাল জ্বলা অগ্নিময়।
আজও যখন ইতিহাসের পাতা খুলি ধীরে,
দেখি সেই সব তরুণেরা দাঁড়িয়ে আছে নীরে।
ষোলটি বন্দুক হাতে তারা লিখেছিল যে জয়,
তারই ধারায় বাংলাদেশ আজ স্বাধীনতায় ভরসায় রয়।
হে দেউলা, হে ভোলার মাটি, তোমায় করি প্রণাম,
তোমার বুকে লেখা আছে স্বাধীনতার নাম।
প্রতিরোধের প্রথম আলো জ্বালিয়েছিলে তুমি,
তোমার সেই অগ্নিশিখা আজও পথের ভূমি।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি