সিলেট ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:০০ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ : শিশু–কিশোরদের নিজেদের স্বপ্ন, আনন্দ ও সৃজনশীলতার জায়গাকে অনুসরণ করে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
তিনি বলেছেন, জীবনে বড় হওয়ার জন্য শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, খেলাধুলা, শিল্পচর্চা, সৃজনশীলতা এবং অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রোববার (২৪ মে ২০২৬) রাজধানীর গুলশান–তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘সেপনিল নিবেদিত কিআ কার্নিভ্যাল ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কিশোর আলোর ১২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো দিনব্যাপী এ আয়োজন করা হয়। সকাল ৯টায় জাতীয় সংগীত ও উদ্বোধনী সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং সমসংখ্যক অভিভাবক অংশ নেন। প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে একজন অভিভাবক উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। দিনজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, লেখক, শিল্পী, শিক্ষক ও তারকার মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো আয়োজন।
‘নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, “অন্যের চাপিয়ে দেওয়া পথে নয়, নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সফলতা বা ব্যর্থতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের স্বপ্ন ও আনন্দের জায়গাকে অনুসরণ করা।”
তিনি শিশু–কিশোরদের উদ্দেশে বলেন, “জীবনকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা যাবে না। একজন মানুষ পূর্ণতা পায় বই পড়া, খেলাধুলা, সাঁতার, ব্যায়াম, গান, সাহিত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে।”
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক সময় সমাজ কিংবা পরিবার থেকে নির্দিষ্ট পেশা বা জীবনপথ বেছে নেওয়ার চাপ আসে। কিন্তু একজন মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে বিকশিত হয়, যখন সে নিজের পছন্দ ও স্বপ্নের জায়গাকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যায়।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ‘দেওয়ার আনন্দ’-এর গুরুত্ব তুলে ধরেন এই শিক্ষাবিদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, মানুষ শুধু পাওয়ার মধ্য দিয়ে বড় হয় না; বরং ত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও অন্যের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত মহত্ত্ব অর্জন করে।
তিনি আরও বলেন, “কঠিনকে গ্রহণ করার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও কিছু করার মানসিকতা শিশু বয়স থেকেই গড়ে তুলতে হবে।”
সৃজনশীলতা বিকাশে কার্টুন ও শিল্পচর্চার গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব শিশু–কিশোরদের নিজস্ব স্টাইল ও সৃজনশীল চিন্তাশক্তি গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “কেউ খারাপ আঁকে না। প্রত্যেক মানুষের আঁকার ভেতরে আলাদা এক ধরনের ভাবনা ও স্বকীয়তা থাকে। সেই স্বকীয়তাকে বের করে আনাই শিক্ষকের দায়িত্ব।”
তিনি বলেন, একটি সাধারণ কলম, কাগজ এবং দৈনিক পত্রিকা দিয়েই কার্টুনচর্চা শুরু করা সম্ভব। শিশুদের কমিকস, গ্রাফিক নভেল ও অ্যানিমেশনের মতো সৃজনশীল মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ডাক্তার বা প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি কার্টুনচর্চাও চালিয়ে নেওয়া যায়।”
ভাষা, প্রযুক্তি, আলোকচিত্র ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কর্মশালা
কিআ কার্নিভ্যাল ২০২৬-এ ছিল শিশু–কিশোরদের জন্য নানা বিষয়ে কর্মশালা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। আলোকচিত্র, লেখালেখি, ভাষা শিক্ষা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কার্টুন, গণিত ও প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মশালায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা।
আলোকির বলরুমে অনুষ্ঠিত হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা। দ্বিতীয় তলায় ছিল অভিনয়, আলোকচিত্র, লেখকের সঙ্গে আড্ডা এবং গণিত ও প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মশালা।
গ্রিনহাউস মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া-কবিতা নিয়ে আড্ডা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ সেশন এবং কার্টুন ও আঁকিবুঁকি কর্মশালা। অনুষ্ঠানস্থলের বাইরের চত্বরে ছিল বিভিন্ন প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠানের স্টল। প্রথমাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টলে ভিড় করেন অংশগ্রহণকারীরা।
ভাষা ও সাহিত্যের আড্ডায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর শিশুদের বুঝে বুঝে পাঠ আয়ত্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বদলে বোঝার মাধ্যমে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন শিশুদের জন্য সহজ ভাষায় আলোকচিত্রের নানা দিক তুলে ধরেন। টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক শিক্ষার্থীদের সহজ ও আনন্দময় শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন।
তারকাদের উপস্থিতিতে মুখর আয়োজন
কার্নিভ্যালে শিশু–কিশোরদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিনোদনজগতের জনপ্রিয় তারকারাও। জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী পাঠকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অভিনেতা আফরান নিশো, ফারহান আহমেদ জোভান ও তৌসিফ মাহবুব অভিনয়বিষয়ক এক সেশনে অংশ নিয়ে শিশুদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অভিনয়জগতে কাজের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রমের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন তাঁরা।
এ ছাড়া জনপ্রিয় জাদুশিল্পী রাজীব বসাকের জাদু প্রদর্শনী শিশুদের মুগ্ধ করে। পুতুল নাট্যদল জলপুতুলের পরিবেশনায় পুতুলনাচ উপভোগ করে অংশগ্রহণকারীরা।
দুপুরের পর গানের আয়োজনে অংশ নেয় জনপ্রিয় ব্যান্ড অ্যাভয়েড রাফা। সংগীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুল ও তাঁর গানের দল এবং গায়ক আহমেদ হাসান সানিও পরিবেশনা করেন।
উৎসবমুখর পরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা
সকাল থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে ছিল উৎসবের আমেজ। জাতীয় সংগীতের পর ‘ধনধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানটি পরিবেশন করেন সুরবিহার ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড পারফরম্যান্স সেন্টারের শিল্পীরা। তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
প্রবেশপথে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন ও প্রবেশপত্র যাচাই করা হয়। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর হাতে বিশেষ সিল দেওয়া হয়, যা প্রবেশ ও বাহিরের সময় প্রদর্শন করতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একজন অংশগ্রহণকারী সর্বোচ্চ তিনবার উৎসব প্রাঙ্গণে প্রবেশের সুযোগ পান।
আয়োজক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান
সকালের উদ্বোধনী পর্ব সঞ্চালনা করেন কিশোর আলোর সম্পাদক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) সিইও ও এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী, অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব ও আফরান নিশো এবং ইস্পাহানি টি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) ওমর হান্নান।
সেপনিল নিবেদিত কিআ কার্নিভ্যাল ২০২৬-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। গোল্ড পার্টনার হিসেবে ছিল মাইটি চিপস এবং ভেন্যু পার্টনার ছিল আলোকি।
শিশু–কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ, মানসিক বিকাশ এবং আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা। দিনব্যাপী উৎসব শেষে অংশগ্রহণকারীদের মুখে ছিল উচ্ছ্বাস, আনন্দ আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রত্যয়।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি