খাদ্য প্যাকেটের সম্মুখভাগে সতর্কবার্তা কমাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০২৬

খাদ্য প্যাকেটের সম্মুখভাগে সতর্কবার্তা কমাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি

Manual1 Ad Code
  • বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে ওয়েবিনারে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ জুন ২০২৬ : “অতিরিক্ত চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স-ফ্যাটযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত (Ultra-Processed) প্যাকেটজাত খাদ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বাংলাদেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্যাকেটজাত খাদ্যের সম্মুখভাগে সহজ, স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণভিত্তিক ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (FOPL) চালু করা হলে ভোক্তারা খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাবেন এবং সচেতন খাদ্য নির্বাচন করতে পারবেন বলে মত দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা।”

রোববার (৭ জুন ২০২৬) সকাল ১১টায় বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত “অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং করণীয়: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত” শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)। এ বছরের বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল “From Burden to Solution: Safe Food Everywhere”।

অসংক্রামক রোগে বাড়ছে মৃত্যুহার

Manual6 Ad Code

ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার ২৬৩ জন মানুষ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে মারা যান, যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে থাকা অতিরিক্ত চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স-ফ্যাট এই রোগগুলোর ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি করছে।

তারা জানান, নগরায়ণ, কর্মব্যস্ত জীবনযাপন, অনলাইন বিপণনের প্রসার এবং শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে পরিচালিত আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপনের কারণে চিপস, কোমল পানীয়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কুকিজ, চকলেট, প্রক্রিয়াজাত মাংসজাত খাদ্য ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত স্ন্যাকসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এসব খাদ্যে উচ্চমাত্রার চিনি, সোডিয়াম ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের বিপাকীয় কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

Manual3 Ad Code

ভোক্তারা বুঝতে পারছেন না খাদ্যের প্রকৃত ঝুঁকি

আলোচকরা বলেন, বর্তমানে বাজারে বিক্রিত অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যের পেছনের অংশে পুষ্টিতথ্য থাকলেও তা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বোধ্য। ফলে খাদ্য ক্রয়ের সময় ভোক্তারা পণ্যের প্রকৃত পুষ্টিমান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না নিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তাদের মতে, বাধ্যতামূলক এফওপিএল চালু হলে খাদ্যপণ্যের সম্মুখভাগেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে খাদ্যটিতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে কি না। এতে ভোক্তারা খুব সহজে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন করতে পারবেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ কমাতে উৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশেও এফওপিএল চালুর প্রস্তুতি

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, “বিশ্বের ৪৪টি দেশ ইতোমধ্যে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং ব্যবস্থা চালু করেছে। এসব দেশে ভোক্তাদের খাদ্য নির্বাচনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশও এ বিষয়ে কাজ করছে এবং আমরা আশা করি খুব দ্রুত এ ব্যবস্থা চালু করতে পারব।”

তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে খাদ্যপণ্যের তথ্য ভোক্তাদের কাছে সহজবোধ্যভাবে পৌঁছে দিতে হবে।

এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, “বাংলাদেশে এফওপিএল বাস্তবায়িত হলে এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৪ অর্জনের পথকে আরও সুগম করবে।”

তিনি বলেন, অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু হ্রাসে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতির অংশ হিসেবে এফওপিএল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পুষ্টিবিদদের জোরালো সমর্থন

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, “প্যাকেটজাত খাদ্যে থাকা স্বাস্থ্যহানিকর উপাদানের পরিমাণ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হলে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

তার মতে, খাদ্যের উপাদান সম্পর্কে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা মানুষকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান

ওয়েবিনারে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং খাদ্যাভ্যাসজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বর্তমানে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্স ফ্যাট ও বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদানসমৃদ্ধ অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যাপক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।”

Manual2 Ad Code

তিনি আরও বলেন, “দেশে প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এসব খাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর নীতি ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।”

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অনেক খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্স-ফ্যাট থাকলেও অধিকাংশ ভোক্তা তা সহজে বুঝতে পারেন না। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ করছে। তিনি মনে করেন, বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল চালু হলে ভোক্তারা খাদ্যের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাবেন এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বিশ্বজুড়ে কার্যকর প্রমাণিত উদ্যোগ

ওয়েবিনারে জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এফওপিএলকে একটি কার্যকর, বৈজ্ঞানিক ও সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে সুপারিশ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং এর মধ্যে অন্তত ১০টি দেশে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যপণ্যের সম্মুখভাগে স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তারা তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন করেন এবং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা কমাতে উৎসাহিত হয়।

অংশগ্রহণকারীদের মতামত

Manual8 Ad Code

ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কনসালট্যান্ট আমিনুল ইসলাম সুজন। অনুষ্ঠানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী, যুব সংগঠনের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের-এর সভাপতিত্বে এবং কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওয়েবিনারে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা।

ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারী বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, বাংলাদেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং এর সঙ্গে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে খাদ্যপণ্যের সম্মুখভাগে বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণভিত্তিক লেবেলিং চালু করা হলে ভোক্তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সময়োপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে এফওপিএল বাস্তবায়ন করা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ