ক্লিনিকে চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণ বৃত্তিতে পিএইচডি করবেন নীলা রাখাইন

প্রকাশিত: ২:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২৬

ক্লিনিকে চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণ বৃত্তিতে পিএইচডি করবেন নীলা রাখাইন

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | কক্সবাজার, ৩০ জুলাই ২০২৬ : কক্সবাজারের সংগ্রামী তরুণী নীলা ওয়ান রাখাইন। আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে চাকরি করেছেন। সেই চাকরির আয়ের টাকায় ভর্তি পরীক্ষার খরচ জুগিয়েছিলেন। আজ সেই নীলা যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচ বছরের পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং বিষয়ে পিএইচডি করতে যাচ্ছেন তিনি। আগামী ১ আগস্ট তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা।

নীলা ওয়ান রাখাইন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্নাতক শেষে শিক্ষা বিষয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ভবিষ্যতে দেশে ফিরে শিক্ষা খাতে, বিশেষ করে আদিবাসী শিক্ষার্থী ও মেয়েদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

সংগ্রামের পথ পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার যাত্রা

নীলার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কক্সবাজারে। তিনি কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।

তাঁর বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন পেশায় একজন দরজি এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভর্তি কোচিং করার সুযোগ হয়নি নীলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় তিনি একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে কাজ করতেন। মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করতেন। সেই আয়ের একটি অংশ সংসারে ব্যয় করতেন, আর বাকি অংশ জমিয়ে ভর্তি পরীক্ষার খরচ চালাতেন।

Manual2 Ad Code

সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নীলা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। এক আত্মীয় আমার মাকে বলেছিলেন, ‘মেয়েকে এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।’ কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে আমি বিশ্বাস করেছি, মানুষ যা–ই বলুক, কাজ দিয়েই তার জবাব দিতে হবে।”

শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ

ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থাকায় তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ৩.৪৫ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করার পর শিক্ষা বিষয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে ৩.৫২ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

পড়ানোর প্রতি আগ্রহ থেকেই টিউশনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শিক্ষাদান, শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি এবং অনলাইনে মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিক্ষা বিষয়ে গবেষণার দিকে আগ্রহী করে তোলে।

Manual1 Ad Code

নেতৃত্ব ও পেশাগত অভিজ্ঞতা

Manual3 Ad Code

পিএইচডির প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, অঙ্গন ও রঁদেভু শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এসব সংগঠনে কাজের মাধ্যমে নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও দলগত কাজের দক্ষতা অর্জন করেন।

স্নাতকোত্তরের শেষ সেমিস্টারে ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিক্ষক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ১০ মিনিট স্কুলে ইংরেজি প্রশিক্ষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও কাজ করেছেন।

নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘চালুং একাডেমি’, যেখানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

পরিবারের সমর্থন

স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত অবস্থায় নীলার বিয়ে হয়। তাঁর স্বামী নি জ রাখাইন পুরো যাত্রায় অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন বলে জানান তিনি।

নীলা বলেন, “বিয়ের পর যৌথ পরিবারে থেকেও পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে স্বামী ও বাবার অনুপ্রেরণায় আমি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসিনি। আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই আমার স্বামী পাশে ছিলেন।”

Manual2 Ad Code

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ, বেছে নিলেন ক্লেমসন

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নীলা একসঙ্গে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পান। ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এবং ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন বিষয়ে পূর্ণ বৃত্তিসহ ভর্তির সুযোগ পান। এছাড়া কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন বিষয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের পূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ বিবেচনায় ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নেন তিনি।

দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয়

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে অবদান রাখাই তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

নীলা বলেন, “আমি দেশ ছেড়ে যাচ্ছি দেশের জন্যই কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে। পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে আদিবাসী শিক্ষার্থী ও মেয়েদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে কাজ করার ইচ্ছা আছে। আমি নিজেও একজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। তাই জানি, তাঁদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি আমি চাই, ভবিষ্যতে কোনো মেয়েকে যেন শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়।”

সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ নীলা ওয়ান রাখাইনের এই সাফল্য। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও লক্ষ্য অর্জন সম্ভব—তাঁর জীবনযাত্রা সেই বার্তাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ