একটা মেয়ের জীবন কি শুধু মানিয়ে নেওয়ার জন্য?

প্রকাশিত: ১১:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬

একটা মেয়ের জীবন কি শুধু মানিয়ে নেওয়ার জন্য?

Manual7 Ad Code

সৈয়দা হাজেরা সুলতানা |

আমাদের সমাজে বিয়ের পর একটা মেয়ে যত সমস্যার মধ্যেই পড়ুক না কেন, সবার প্রথম পরামর্শ থাকে— “বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে মানিয়ে নাও।”

শাশুড়ি হিংসা করলে বলা হয়, “শাশুড়ির আর কয় দিনই বা আছে, মানিয়ে নাও। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আচ্ছা, আপনার কাছে কি আজরাইল নোটিশ দিয়ে গেছেন যে উনি ঠিক কবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন? যদি আরও ৩০ বছর বেঁচে থাকেন, তাহলে কি মেয়েটাকে আরও ৩০ বছর সেই মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করে যেতে হবে?

ননদ বদমেজাজি হলে বলা হয়, “রাগটা একটু বেশি, কিন্তু মনটা অনেক ভালো।”

কিন্তু একজন মানুষের বদমেজাজ যদি অন্য একজনের মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে, তাহলে সেই ভালো মনের মূল্যটা কোথায়? ভালো মন কি শুধু নিজের মানুষের জন্য, নাকি অন্যকে সম্মান করার মধ্যেও তার পরিচয় থাকা উচিত?

দেবর নিয়মিত বেয়াদবি করলে সেটাও যেন ছোটখাটো বিষয়। মেয়েটাকে বোঝানো হয়, চুপ থাকতে, এড়িয়ে যেতে, মানিয়ে নিতে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—স্বামী।

যৌথ পরিবারের অনেক স্বামী এমনভাবে চোখ বন্ধ করে থাকেন, যেন পরিবারের অন্যদের ভুল দেখার দায়িত্ব তাঁর নয়। প্রতিবাদ করার সাহস নেই, স্ত্রীকে রক্ষা করার দায়িত্ববোধ নেই। ফলে সংসারে অশান্তি চলতে থাকে, আর মেয়েটাকে শেখানো হয় সেই অশান্তির সঙ্গে বাঁচতে।

একটা মেয়েকে কেন বারবার অন্যের ভুলের মূল্য দিতে হবে?

Manual1 Ad Code

সমাজ, পরিবার—সবাই একসময় বাচ্চাদের কথা বলে তাকে ত্যাগ করতে শেখায়। মেয়েটাও ভাবে, আজ নিজের সুখ বিসর্জন দিই, বাচ্চারা বড় হলে অন্তত তারা আমাকে বুঝবে। আমার এই কষ্টের দিনগুলো একদিন শেষ হবে। তারা আমাকে সুখ দেবে, আমার পাশে দাঁড়াবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ত্যাগের মূল্য কি সত্যিই সে পায়?

অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরটা এত সহজ নয়।

কারণ একটা শিশু যখন প্রতিনিয়ত ঝগড়া, অপমান, অশান্তি আর মানসিক চাপের মধ্যে বড় হয়, তখন সেই পরিবেশ তার মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। তাকে সরাসরি কিছু না বললেও সে বুঝতে শেখে, কখন বাড়িতে ঝগড়া শুরু হতে পারে, কখন চুপ থাকতে হবে, কখন ভয় পেতে হবে।

শিশুরা শুধু আমাদের বলা কথাগুলো শেখে না; তারা আমাদের সম্পর্কগুলোকেও দেখে, অনুভব করে এবং সেগুলো থেকেই ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সম্পর্কের ধারণা তৈরি করে।

Manual6 Ad Code

আজ যে মা বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের কষ্টগুলো চেপে রাখছেন, তাঁর সেই ত্যাগের প্রভাব সন্তানদের ওপর কীভাবে পড়বে, তা হয়তো তিনি এখন বুঝতে পারছেন না। সব শিশু একইভাবে প্রভাবিত হয় না, কিন্তু দীর্ঘদিনের অশান্তি তাদের মানসিক সুস্থতা ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এবার আসি সেই মায়ের শেষ আশাটুকুতে।

একসময় জীবনের প্রয়োজনে সন্তান হয়তো অন্য কোথাও চলে যাবে। নিজের সংসার হবে, নিজের ব্যস্ততা তৈরি হবে, নিজের জীবনকে সুন্দর করার চেষ্টা করবে। এটা স্বাভাবিক। সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবন গড়বে, এটাই তো প্রত্যাশিত।

কিন্তু সেই নতুন জীবনের ব্যস্ততায় হয়তো মায়ের নিঃসঙ্গতা, তাঁর দীর্ঘদিনের কষ্ট কিংবা নিজের যৌবন বিসর্জন দেওয়ার গল্পটা আর আগের মতো মনে থাকবে না।

তখন প্রশ্ন জাগে—যে সুখের আশায় একজন নারী বছরের পর বছর নিজের সুখ বিসর্জন দিলেন, সেই সুখ যদি শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায়, তাহলে তাঁর ত্যাগের প্রাপ্তিটা কোথায়?

আমি বলছি না, সন্তানদের কথা ভাবা উচিত নয়। আমি বলছি, সন্তানদের কথা ভাবতে গিয়ে একজন মায়ের নিজের অস্তিত্বটুকু হারিয়ে ফেলা উচিত নয়।

সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু মেয়ের নয়। সম্পর্ক সুন্দর রাখার দায়িত্ব সবার। শাশুড়ির বয়স, ননদের ভালো মন, দেবরের ছোট বয়স কিংবা স্বামীর অসহায়ত্ব—কোনোটাই অন্য একজন মানুষকে প্রতিনিয়ত মানসিক কষ্ট দেওয়ার বৈধতা হতে পারে না।

Manual7 Ad Code

আর সবচেয়ে বড় কথা, বাচ্চাদের জন্য ত্যাগ করতে হলে প্রথমে ভাবুন, তারা আসলে কী পাচ্ছে—একটা অশান্ত সংসারে বাবা-মাকে একসঙ্গে, নাকি এমন একটা পরিবেশ, যেখানে তারা ভয় ছাড়া বড় হতে পারবে?

কারণ একটা শিশুর শুধু বাবা-মাকে এক ছাদের নিচে প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, সম্মান, মানসিক শান্তি আর সুস্থ সম্পর্কের উদাহরণ।

Manual5 Ad Code

একজন মেয়ের জীবন শুধু স্ত্রী কিংবা মা পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। সবার আগে তিনি একজন মানুষ। তাঁরও শান্তিতে বাঁচার অধিকার আছে।

তাই কাউকে শুধু “মানিয়ে নাও” বলার আগে একবার ভাবুন—যে মানুষটাকে সারাজীবন মানিয়ে নিতে বলছেন, তার নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারটুকু কি আপনারা কখনো ভেবে দেখেছেন?

বি.দ্র. অনেক মেয়ের জীবনের গল্প শুনে, তাদের না বলা কষ্টগুলো অনুভব করেই লেখাটা লেখা। হয়তো প্রতিটি গল্প আলাদা, কিন্তু কোথাও গিয়ে কষ্টগুলো একই রকম।
#
সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা)
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান (সম্মান) প্রথম বর্ষ
মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ, সিলেট।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ