বাবা ভাণ্ডারীর খোশরোজ শরিফ ঘিরে মুখর মাইজভাণ্ডার, সমাগম লাখো ভক্ত-আশেকানের

প্রকাশিত: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

বাবা ভাণ্ডারীর খোশরোজ শরিফ ঘিরে মুখর মাইজভাণ্ডার, সমাগম লাখো ভক্ত-আশেকানের

Manual3 Ad Code
  • তিন হাজারের বেশি চুলায় চলছে তবারক রান্না, নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবক

নিজস্ব প্রতিবেদক | ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম), ১৪ অক্টোবর ২০২৬ : চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে হযরত গাউসুল আজম শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভাণ্ডারীর (ক.) ১৬৪তম খোশরোজ শরিফ ঘিরে উৎসবমুখর আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা ভক্ত-আশেকানদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো দরবার এলাকা। জিকির-আজকার, দোয়া-মোনাজাত, ছেমা, কাওয়ালি ও তবারক বিতরণসহ নানা ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে এ বার্ষিক আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান। বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা।

সোমবার (১২ অক্টোবর) শুরু হওয়া খোশরোজ শরিফ উপলক্ষে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ ও আশপাশের এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। দরবারের বিভিন্ন রওজা শরিফে ভক্ত-আশেকানেরা জিকির-আজকার ও দোয়া-মোনাজাতে অংশ নিচ্ছেন। অনেকে আহলে বায়েত-পাক পাঞ্জাতন ও অলী-আউলিয়ার সান্নিধ্য ও উছিলায় মহান আল্লাহর দরবারে রহমত, বরকত, শান্তি এবং মানবকল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করছেন। দিনভর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি রাতেও বিভিন্ন আয়োজনকে কেন্দ্র করে সরব থাকছে দরবার এলাকা।

তিন দিন ধরে চলছে তবারক রান্না

খোশরোজ শরিফে আগত বিপুলসংখ্যক ভক্ত-আশেকানের আপ্যায়নের জন্য দরবারের বিভিন্ন মঞ্জিলে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন হাজারের বেশি চুলায় গত তিন দিন ধরে তবারক রান্নার কাজ চলছে। এ কাজে যুক্ত রয়েছেন চার হাজারেরও বেশি বাবুর্চি ও স্বেচ্ছাসেবক। রান্না ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ভক্ত-আশেকানদের মধ্যে তবারক বিতরণ করা হবে।

আয়োজকদের মতে, খোশরোজ শরিফে অংশ নিতে আসা মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত ও বিতরণ এ আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিপুলসংখ্যক মানুষের আপ্যায়ন নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন মঞ্জিলে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে দায়িত্ব। রান্না, খাবার পরিবেশন ও তবারক বিতরণে নিয়োজিত ব্যক্তিরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন।

Manual1 Ad Code

জিকির-আজকার, খতমে কোরআন ও নানা আয়োজন

খোশরোজ শরিফ উপলক্ষে আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়াসহ বিভিন্ন সংগঠন ও মঞ্জিলের উদ্যোগে নানা ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খতমে কোরআন, খতমে গাউছিয়া শরিফ, পবিত্র রওজায় গিলাফ চড়ানো, দোয়া-মোনাজাত, ছেমা ও কাওয়ালি।

এ ছাড়া আগত ভক্ত-আশেকান ও স্থানীয় মানুষের সেবায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কর্মসূচি রাখা হয়েছে। তবারক বিতরণের পাশাপাশি মাদক, যৌতুক ও বাল্যবিবাহবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

Manual4 Ad Code

ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি যুক্ত হওয়ায় এবারের খোশরোজ শরিফকে ঘিরে দরবার এলাকায় নানা ধরনের কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন মঞ্জিল ও সংগঠনের সদস্যরা নিজ নিজ উদ্যোগে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন।

দরবার এলাকায় বসেছে মেলা

খোশরোজ শরিফকে কেন্দ্র করে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের আশপাশে বসেছে মেলা। বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ভক্ত-আশেকানদের আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজার ও আশপাশের এলাকাতেও বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য।

Manual7 Ad Code

দরবার শরিফকে বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। আগত ভক্ত-আশেকানদের চলাচল, অবস্থান ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের উপস্থিতিতে দরবার ও আশপাশের এলাকাজুড়ে বেড়েছে ব্যস্ততা।

আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী

বুধবার রাতে বাবা ভাণ্ডারীর (ক.) ১৬৪তম খোশরোজ শরিফের আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন তাঁর প্রপৌত্র, রাহবারে শরিয়ত ও তরীকত হযরত শাহ সুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী আল মাইজভাণ্ডারী (মা.জি.আ.)।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, আখেরি মোনাজাতকে ঘিরে ভক্ত-আশেকানদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এতে অংশ নিয়ে তাঁরা মহান আল্লাহর কাছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামষ্টিক কল্যাণের পাশাপাশি দেশ-জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবতার কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করবেন।

আয়োজকদের ভাষ্য, ইতিমধ্যে কয়েক লাখ ভক্ত-আশেকান দরবার শরিফে সমবেত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও ভক্তদের আগমন ঘটেছে। তাঁদের উপস্থিতিতে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ পরিণত হয়েছে আধ্যাত্মিক মিলনকেন্দ্রে।

নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক

বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে দরবার শরিফ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন মঞ্জিলের প্রায় তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন।

Manual2 Ad Code

খোশরোজ শরিফের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। পুরো দরবার শরিফকে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন আয়োজকেরা। আগত ভক্ত-আশেকানদের সুশৃঙ্খল চলাচল এবং ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করছেন।

গাউছিয়া রহমানিয়া মইনীয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন ও আনজুমানের সভাপতি শাহ সুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী জানান, খোশরোজ শরিফের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরো দরবার শরিফকে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি মনিটরিং সেলের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সবার প্রতি ধৈর্য, সংযম ও আন্তরিকতার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।

আধ্যাত্মিক আবহে শেষ হচ্ছে তিন দিনের আয়োজন

বাবা ভাণ্ডারীর (ক.) ১৬৪তম খোশরোজ শরিফ ঘিরে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে ভক্ত-আশেকানদের এই সমাগমকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, মানবিক সেবা, তবারক বিতরণ ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম একসঙ্গে চলছে। দরবার শরিফের বিভিন্ন মঞ্জিলে দিনভর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা তাঁদের ধর্মীয় অনুশীলন ও প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছেন।

বুধবার রাতে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের খোশরোজ শরিফের আনুষ্ঠানিকতা। মোনাজাতে সমবেত ভক্ত-আশেকানেরা মহান আল্লাহর কাছে রহমত, বরকত, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবকল্যাণ কামনা করবেন। তাঁদের প্রার্থনায় দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং মানুষের মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাও গুরুত্ব পাবে।

সব মিলিয়ে বাবা ভাণ্ডারীর খোশরোজ শরিফকে কেন্দ্র করে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ এখন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, ভক্তদের মিলন, সেবামূলক কর্মসূচি ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রাণবন্ত। আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ভক্ত-আশেকানদের কাছে দিনটি হয়ে থাকবে প্রার্থনা, আত্মিক অনুশীলন ও মিলনমেলার এক বিশেষ উপলক্ষ।