ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী

প্রকাশিত: ৩:০৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৫

ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী

Manual5 Ad Code

গ্রন্থ রিভিউ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ : ‘ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী’ গ্রন্থটি লিখেছেন মালেকা বেগম। এর প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৯। এর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন কাইয়ূম চৌধুরী। কৃতজ্ঞতায় : কামরুল হাসান।

ইলা মিত্র একটি নাম, উচ্চারণমাত্র মনে পড়ে এক বিদ্রোহ আর সংগ্রামের ইতিহাস। ইলা মিত্রের ইতি নেই। অন্তহীন তাঁর ইতিহাস, ইতিবৃত্ত ও ইতিকথা।

Manual8 Ad Code

কলকাতা থেকে লেখাপড়া শেষে ইলা সেন ১৯৪৫ সালে রাজশাহী জেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে এলেন রমেন্দ্র মিত্রের বধূ হয়ে। সেই থেকে ইলা সেন হলেন ইলা মিত্র। ইলা মিত্রকে আমরা জেনেছি সংগ্রামের সুতীক্ষ্ণ বিবেক হিসেবে। ইলা সেনও কম তেজোদীপ্ত ছিলেন না।

যশোরের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে তাঁদের আদি নিবাস ছিল। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল ছিলেন। বাবার কর্মজীবনের কারণে কলকাতায় লেখাপড়া করেছেন, কুমারী জীবনের সবটুকু সময় কাটিয়েছেন সেখানেই। পড়েছেন বেথুন স্কুলে, বেথুন কলেজে ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন বোন, তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়।

খেলাধুলায় ১৯৩৬ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত ছয় বছর সারা বাংলায় ইলা সেনের নাম ছিল প্রথম সারিতে। সাঁতারে ছিলেন পটু। অ্যাথলেটিক্স ছাড়াও বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টনসহ ক্রীড়া জগতের নানা ক্ষেত্রে তাঁর সুনাম ছিল অক্ষুণ্ণ।

১৯৪৩ সালে তিনি যখন বেথুন কলেজে বাংলা সাহিত্যে বিএ সম্মান ক্লাসের ছাত্রী, সেই সময়ই কলকাতায় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য হন। ১৯৪৩ সালে রাওবিল বা হিন্দু কোড বিলের পক্ষে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির আন্দোলন জোরদার করা হয়।

১৯৪৫ সালে রমেন মিত্রের সঙ্গে বিয়ের পর রামচন্দ্রপুরে স্বামীর সংসারে এলেন তিনি। মাত্র দুই বছরের মধ্যে দেশ ভাগ হয়ে গেল। তাঁর চিরদিনের পরিচিত পরিবেশ রয়ে গেল সীমান্তের ওপারে। তিনি থেকে গেলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।

১৯৪৯ সালের শেষ সময়ে শুরু হয়ে ১৯৫০ সালের প্রথমকাল অবধি নাচোলে তেভাগা আন্দোলন বা কৃষক বিদ্রোহ উত্তুঙ্গে উঠেছিল। এই কৃষকেরা ছিলেন সাঁওতাল। এঁদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ভারত উপমহাদেশের সাঁওতাল পরগনা জেলার অধিবাসী। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সাঁওতাল আদিবাসীরা মহাবিদ্রোহের হুংকার তুলেছিলেন। সেই বিদ্রোহীরা ও তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের সাঁওতাল অধিবাসীরা নিজ বাসভূমে শান্তিতে বাস করতে পারেননি-হয়েছিলেন শোষিত, নির্যাতিত, জীবিকাবঞ্চিত দরিদ্র, নিঃশেষিত। বাঁচার দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষায় উত্তরবঙ্গের এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলায় সাঁওতাল জনগোষ্ঠীরা বসতি গড়ে তুললেন। এঁরা ছিলেন বর্গাচাষি। শান্তির আশ্বাস তাঁরা নতুন বসতি স্থাপনেও পেলেন না। উত্তরবঙ্গজুড়ে তখন জোতদার-জমিদারদের প্রতাপ চলছিল, সব কৃষিজমির মালিক তাঁরাই ছিলেন। বর্গাদার চাষিদের ওপর জোতদার ভূস্বামীদের অত্যাচার ছিল নানা ধরনের। বর্গাচাষিদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় ছিল, যেকোনো সময় যদি জমি চাষের সুযোগ বাতিল করে দেয় জোতদার, তখন কীভাবে তাঁদের জীবন চলবে?

Manual4 Ad Code

তেভাগা আন্দোলনে নাচোল ছাড়াও অন্যান্য জেলায় কৃষক পরিবারের নারীরা অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও মহকুমার আটোয়ারী থানার রামপুর গ্রামের রাজবংশী কৃষাণি দীপেশ্বরীর বীরত্ব তেভাগা আন্দোলনের অন্যান্য কর্মী-আন্দোলনকারীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। দিনাজপুর ঠাকুরগাঁও এলাকারও বহু নারী কৃষক কর্মী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। সে এলাকার জয়মণির লড়াই-সংগ্রাম ইতিহাসে উল্লিখিত হয়েছে। জলপাইগুড়ির রাজবংশী বৃদ্ধা বুড়ো মা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। জমিতে ধান লাগানো, ধান কাটা, শুকানো-সব কাজই রাজবংশী কৃষাণিরা করতেন। পুলিশ যখন কৃষকদের ধান কাটা ও সব ধান বাড়িতে নেওয়ার সময় বাধা দিতে এসেছিল, তখন রাজবংশী কৃষাণিরা ভাবনা-চিন্তা করে ঠিক করেন যে, মেয়েরাই ধান কাটবে সামনের সারিতে। পুলিশ বাহিনী মেয়েদের দলে দলে ধান কাটতে দেখে বাধ্য হয়ে চলে যায়। যশোরের নড়াইল এলাকার গোয়াখোলা গ্রামের সরলাবালা পাল তেভাগা আন্দোলনে সংগঠিত নারীদের নিয়ে ঝাঁটাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং তাঁদের নিয়ে তিনি পুলিশ বাহিনীদের মাঠ থেকে হটিয়ে দেন সাহসের সঙ্গে।

Manual6 Ad Code

নাচোল তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদী নেত্রী ইলা মিত্র নাচোলে পুলিশি আক্রমণের সময় ছদ্মবেশে আত্মগোপনে যাওয়ার পথে ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি পুলিশের হাতে বন্দী হন এবং ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন থেকে প্যারোলে মুক্তি পান। ইলা মিত্র শহরের উচ্চশিক্ষিত এবং জমিদারবাড়ির বধূ হয়েও সাঁওতাল কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বিপ্লবী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং কৃষক-কৃষাণিদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। আন্দোলনের পথ-প্রক্রিয়ার বিভ্রান্তির ফলে তেভাগার দাবি সে সময় নাচোলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি ঠিকই, কিন্তু সেই আন্দোলনে দক্ষ বিপ্লবী সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাঁদের আত্মত্যাগ তুচ্ছ হয়ে যায়নি। শেখ আজাহার হোসেন, অনিমেষ লাহিড়ী, মাতলা মাজি, বৃন্দাবন সাহা, মংলা মাজি, টুটু হেম্ভ্রম, চিতোর মাঝি, সাগারাম মাঝি, শুক্র মাডাং, চুতার মাঝি, সুখ বিলাস বর্মণ, ভাগিরথ কর্মকার প্রমুখ সংগঠক- কর্মী ইলা মিত্র ও রমেন মিত্রের মতো ধনী জমিদার বা জোতদার পরিবারের শিক্ষিত নেতাদের বিপ্লবী আদর্শ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে শ্রেণী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এঁদের সকলের জীবনই নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের পর পুলিশি নির্যাতনে বিপন্ন হয়েছিল এবং তাঁদের আত্মত্যাগ মহীয়ান হয়ে আছে। এঁদের সংগ্রামী জীবনের কথাও লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন, এ কথা বিশ্বাস করি। ঘটনাপরম্পরায় ইলা মিত্র সব আত্মত্যাগী সাঁওতাল বিদ্রোহীর প্রতীকস্বরূপ বিবেচিত হয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যা, সামাজিক জীবনে জমিদার বা জোতদার পরিবারের বধূ, শিশুসন্তানের মা-ইলা মিত্র প্রতীক হিসেবে এবং একজন সাহসী নারী বিপ্লবী হিসেবে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রীরূপে ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছেন।

Manual7 Ad Code

ইলা মিত্র : নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী
মালেকা বেগম

প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৯
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ূম চৌধুরী

কৃতজ্ঞতা : কামরুল হাসান

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ