সিলেট ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২৫
‘স্বাধীনতা’ শব্দ যত ছোট, তা অর্জনের মূল্য তার বিপরীতে ঠিক ততটাই বড়। জীবনব্যাপী সাধনা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের লড়াই চলছে স্বাধীনতার জন্য। ব্রিটিশ অধীনতা থেকে মুক্তির লড়াইয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সেই অবিস্মরণীয় বাণী, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়!’ স্বাধীনতার জন্য কত রক্ত, জীবন দিয়েছে মানুষ দেশে দেশে, কত মানুষ স্বাধীনতার জন্য কারাভোগ করেছেন বছরের পর বছর। এরপর স্বাধীন দেশ আর রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা পুরনো হলেও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ইতিহাস খুব পুরনো নয়। রাজতন্ত্রের নিগড় থেকে মুক্তি পেয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা, পরাধীনতার কবল থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা এই দুই সংগ্রামের পথেই আধুনিক রাষ্ট্রের আকাঙ্খা ও ভিত্তি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। এত ছোট ভূখণ্ডে জনগণের আকাঙ্খা নিয়ে এত আন্দোলনের নজির পৃথিবীর কোনো দেশে আছে কি না জানা নেই। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন গোটা ভারতবর্ষকে জাগিয়ে তুলেছিল। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জীবনধারার পার্থক্য সত্ত্বেও, ভারতবর্ষের সব অঞ্চলের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতার আকাঙ্খায়। এই সংগ্রামে সামনের কাতারে ছিল বাংলা এবং পাঞ্জাব। যে কারণে ব্রিটিশদের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যেতে হয়েছিল। আর ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে শুধু ভারত ভাগ হয়নি, ভাগ হয়েছিল বাংলা এবং পাঞ্জাব।
ভারত স্বাধীন হলো, কিন্তু পাকিস্তানের অধীনে বাংলা স্বাধীনতার সুফল পেল না। বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে পূর্ব বাংলা প্রায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত হলো। আক্রমণ এলো ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির ওপর। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বয়স যত বাড়ছিল পূর্ব বাংলার ওপর শোষণ ততই বেড়ে চলেছিল। তাই ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফার আন্দোলন, ১১ দফার আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনের পথ বেয়ে বাংলাদেশ এলো স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। ’৭১ সালের মার্চ মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম মাস। এ মাসের ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওড়ানো হলো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ঘোষণা হলো স্বাধীনতার ইশতেহার, ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভা এবং শেখ মুজিবের ভাষণ, ১৯ মার্চ গাজীপুরে বীর জনতার প্রতিরোধ, ২৩ মার্চ সারা বাংলায় স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানো, ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাজার হাজার মানুষ হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হত্যাকাণ্ড, শ্রমিক বস্তিগুলোতে গণহত্যা ও নৃশংসতা এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা এক ধারাবাহিক ইতিহাসের কালপঞ্জি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে ২৮ মার্চ রংপুরে হাজার হাজার মানুষের ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও ও শত শত মানুষের জীবনদান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য রক্তের নদী বেয়ে আসতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, দেশ স্বাধীন হলেও সব মানুষ কি স্বাধীনতার সুফল পেয়েছে? ৫ জন কোটিপতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন ১ লাখ ২২ হাজার কোটিপতি, ৯ বিলিয়ন ডলার জিডিপির বাংলাদেশের জিডিপি এখন ৪৫০ বিলিয়ন ডলার, ১১০ ডলার মাথাপিছু আয় থেকে যাত্রা শুরু করে এখন মাথাপিছু আয় ২৮২৪ ডলার, ০.৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির দেশ এখন ৬০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে। এসব দেশের ইতিবাচক অগ্রগতি কিন্তু দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছিল তার ৮৭ শতাংশ ছিল কৃষক-শ্রমিক, সেই শ্রমিক-কৃষকের জীবনটা এখন কেমন? যে গণতন্ত্রের জন্য এত রক্ত ঝরানো হলো, সেই গণতন্ত্রের চেহারা কেমন দাঁড়িয়েছে? বৈষম্য ক্ষুব্ধ করেছিল বলেই তো মানুষ সাম্যের জন্য লড়াই করেছিল। ধর্মীয়, জাতিগত, সংস্কৃতিগত নিপীড়ন রুখে দাঁড়াতেই মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সেই নিপীড়নমুক্ত মর্যাদা নিয়ে বাঁচার মতো দেশ কি তৈরি হয়েছে? নারী, আদিবাসী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে কি? প্রশ্ন অনেক হলেও উত্তর কিন্তু একটাই না। স্বাধীনতার সংগ্রাম সাম্যের মোহনায় মিলতে এখনো অনেক পথ রয়েছে বাকি।
এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, গণতন্ত্রের চর্চা এবং জবাবদিহি না থাকলে সব সরকারই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাধীনতার পর সেই কাজটাই করেছে ক্ষমতাসীন দলগুলো। কিন্তু গত পনের বছরের আওয়ামী লীগের শাসনামলে যে তা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না, যা দলীয়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের ফলে ভয়াবহ দুর্নীতি এবং দমন-পীড়নের সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। যোগ্যরা বিতাড়িত অথবা মাথা নিচু করে থেকেছে আর দলীয় ব্যক্তিরা দুর্বিনীত হয়ে উঠেছিল। লুটপাট হয়েছে সীমাহীন। ফলে সব রকম সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে। পুলিশ এবং প্রশাসন তো বটেই, বিচার বিভাগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বলা হয় বিচার বিভাগ স্বাধীন, কিন্তু মানুষ দেখেছে বিচার বিভাগ আওয়ামী লীগের অধীনস্ত। আওয়ামী লীগ যেভাবে চেয়েছে, বিচারকাজ সেভাবেই চলেছে। কাউকে জামিন দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করত। দেশে প্রশাসন বলতে মানুষ বুঝেছে দলীয় শাসন চালাবার সরকারি প্রতিষ্ঠান। সেটা সব সরকারের আমলেই কমবেশি ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ শাসনমলে আমলাদের মনোভাবের নিম্নমুখী পরিবর্তন ঘটেছিল। আগে আমলাদের বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা যখন যে সরকার থাকত তখন সেই সরকারের অনুগত থেকে কাজ করতেন এবং নানা ধরনের ব্যক্তিগত সুবিধা নিতেন। কিন্তু গত ১৫ বছরে যেন আমলারা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। ফলে প্রশাসনিক লাঠিয়াল হিসেবে তারা যেমন নিপীড়ন করেছেন তেমনি দুর্নীতি করেছেন অবাধে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো দলের নয়, জনগণের সেবা করাই তাদের কাজ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় লুটপাট অনিবার্য বিষয়, এটা সবাই মানে। তাই আর্থিক শৃঙ্খলা তৈরি করে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু গত ১৫ বছরে আর্থিক খাতে লুটপাট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। কোনো দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি না থাকার ফলে এই খাত প্রায় ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গেছে। এ খাতকে ধ্বংস করার জন্য যত ধরনের কাজ করা প্রয়োজন, তার সবই করা হয়েছে আওয়ামী লীগের আমলে। দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে অর্থ পাচারের মাধ্যমে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি বিশ্বের সব দেশের আর্থিক অবৈধ লেনদেন নিয়ে গবেষণা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এই পরিমাণটা কত একটু ভেবে দেখলে মানুষ বিস্মিত হয়ে যায়। তুলনা করে দেখুন, পদ্মা সেতু নির্মাণে এগার বছরে ব্যয় হয়েছে ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলার।
আর একটি উদাহরণ, আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণচুক্তি সম্পাদন করে। সাত কিস্তিতে আইএমএফ এই ঋণ দেবে। একদিকে বছরে ৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে অন্যদিকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার শর্তসাপেক্ষ ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে নির্বিচারে লুটপাট চলার কারণে এ খাত আজ বিপর্যস্ত, ভঙ্গুর। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার ফলে ব্যাংক খাত দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে রুগ্ণ বানিয়ে ফেলা হয়েছে, ঋণ নিয়ে শোধ না দেওয়ার প্রবণতা স্থায়ী হয়েছিল। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে প্রকৃত হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকার কম নয়। যে দেশের কৃষক ২০ হাজার টাকা ঋণখেলাপি হলে তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, কিস্তি শোধ দিতে না পারলে ঘরের চাল খুলে নেওয়া হয়, সেই দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি পাঁচতারা হোটেলে মন্ত্রীদের সঙ্গে নৈশভোজ করে। মানুষ এসব আর দেখতে চায় না।
কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলা করতেই হবে তা হলো, মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অর্থ মানুষকে চূড়ান্তভাবে অপমান করা। নিজের ভোটটাও দিতে না পারার কষ্টের সঙ্গে ভুয়া ভোটে বিজয়ীদের দম্ভ মানুষকে চূড়ান্ত অপমান করেছে। যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাদের মুখে গণতন্ত্রের বুলি থাকলেও অন্তরে থাকে ক্ষমতা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার বাসনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি উঠেছে বারবার। দেশের প্রথম নির্বাচন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল আর এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছিল ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার ন্যক্কারজনক চিত্র। আর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে প্রহসনমূলক নির্বাচন তো তৈরি করেছে নিকৃষ্ট নজির। ফলে জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। আওয়ামী লীগ শুধু টাকা, পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করেনি, প্রশাসন পুলিশ এমনকি নির্বাচন কমিশনকেও কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের প্রহসন করেছে। তাই আওয়ামী শাসনে যত বিক্ষুব্ধ হোক না কেন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে এই ভরসা আর ছিল না জনগণের। ফলে অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের প্রতিই অনাস্থার জায়গাটিকে আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা এখন প্রধান কাজ। সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন তাই এখনো একটা চ্যালেঞ্জ। গণতন্ত্রের মূল তাৎপর্য, জনগণের শাসন আর শাসকদের জবাবদিহি। এটা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া জনগণের স্বাধীনতা অর্জিত হবে না। স্বাধীনতা এলেও যদি বৈষম্য থাকে তাহলে জনগণের স্বাধীনতার পরিবর্তে টাকাওয়ালাদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় এর অন্যতম দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর দেশের বয়স বেড়েছে আর বৈষম্য বেড়েছে জীবনের সব দিকেই। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যেমন চোখে দেখা যায় তেমনি শিক্ষা, চিকিৎসা, নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর, ধর্মীয় ও জাতিসত্তার বৈষম্য প্রকটভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। বৈষম্যের কারণ শোষণ আর শোষণের রূপটা পুঁজিবাদী। ফলে সাম্যের স্বপ্ন আজ স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্নের সঙ্গে একাকার হয়ে পুঁজিবাদবিরোধী লড়াইয়ের পথেই মানুষকে আহ্বান করছে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি