বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের তিন সাক্ষী

প্রকাশিত: ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২৫

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের তিন সাক্ষী

Manual2 Ad Code

দিলরুবা খাতুন | মেহেরপুর, ১৫ এপ্রিল ২০২৫ : বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে যে ১২জন আনসার সদস্য গার্ড অব অনার দিয়ে ইতিহাসের পাতায় উঠে আসেন। তাদের তিনজন এখনও বেঁছে আছেন।

Manual7 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগরের বাগোয়ান ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি মোমিন চৌধুরী বয়সের ভারে তার শরীরে রোগ শোকের বাসা। তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলেন- বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই মেহেরপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘সংগ্রাম কমিটি’ নামে স্বাধীন বাংলা প্রত্যাশী একটি সংগঠন গঠিত হয়। মেহেরপুরের বাগোয়ান ইউনিয়নের ভবরপাড়া গ্রামে এ সংগঠনটির তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। সীমান্তবর্তী এই এলাকার জনমত সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত ছিল এটা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে পূর্বাহ্নেই অবহিত করা হয়। বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের স্থান নির্বাচনের সময় অন্যান্য বিষয়ের সাথে সীমান্তবর্তী এ এলাকাটির এ বিশেষ অবস্থাটিও বিবেচনা করা হয়।

এ প্রেক্ষাপটে ১৫ই এপ্রিল সকালের দিকে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ভবরপাড়া ও বৈদ্যনাথতলা সরজমিন পরিদর্শন করেন। তিনি ভবরপাড়া সীমান্ত সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং ঘোষণা দেন যে বৈদ্যনাথতলায় নবগঠিত সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। তার এ ঘোষণার পরপরই এ এলাকায় সাজসাজ রব পড়ে যায়। ১৬ এপ্রিল থেকে পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সারাদিন ধরে মঞ্চ তৈরী এবং আনুষাঙ্গিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়। এ কাজে ভবরপাড়া ‘সংগ্রাম কমিটি’র কর্মী ও নেতৃবৃন্দ প্রধান ভূমিকা পালন করেন। মঞ্চে নেতৃবৃন্দের আসন তৈরীর জন্য ইপিআর ক্যাম্প থেকে চৌকি সরবরাহ করা হয়। মঞ্চে ওঠার সম্মুখ ভাগে একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়। তোরণের ওপরে কাপড় ও তুলা দিয়ে ইংরেজি শব্দ বাংলা বর্ণমালায় ‘ওয়েলকাম’ লিখেছিলেন ভবরপাড়া মিশনের সেবিকা ভগিনী ক্যাথরিনা ও ভগিনী তেরেজিনা।

পরের দিন ১৭ এপ্রিল। মেহেরপুর শহর প্রায় জনশূন্য। চারিদিকে থমথমে ভাব। সন্নিকটে আগত হানাদার বাহিনীর ভারী অস্ত্রের গর্জন মেহেরপুরের সর্বত্র প্রকম্পিত করে তুলেছে। তখন পর্যন্ত হানাদাররা মেহেরপুরে প্রবেশ করতে পারেনি। মেহেরপুর মহকুমার বাগোয়ান ইউনিয়নের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে এ সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা ভিড় জমাতে থাকেন। কয়েকশ বিদেশী সাংবাদিক বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে সমবেত হন। সকাল থেকেই ব্যাপক আয়োজন শুরু হয়। স্থানটিতে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। অন্যান্যদের মধ্যে স্থানীয় ১২ জন আনসার এ ঐতিহাসিক ঘটনার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত হন। তারা হলেন- সিরাজউদ্দিন, লিয়াকত আলী, সাহেব আলী, হামিদুল, হাফিজউদ্দিন, আজিমউদ্দিন শেখ, মহি মন্ডল, অস্থির মল্লিক, আরশাদ আলী, ইয়াদ আলী কমান্ডার, মো. হাসদেল আলী ও নজরুল ইসলাম।

গাঢ় ছায়াবৃত আম্রকাননের এক পাশে একটি সাধারণ মঞ্চ ও তোরণ। বাঁশের কাবারী দিয়ে অতি সাধারণ একটি বেষ্টনি তৈরী করা হয়েছে। বেলা তখন ১১টা। দীর্ঘ আলোচনার পর বহু প্রতীক্ষিত সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের সূচনা হলো। অনুষ্ঠান সূচী তৈরী করেছিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দিন ও ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই- ইলাহী চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামান, কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ মঞ্চে এসে দাঁড়ান।

Manual1 Ad Code

অনুষ্ঠান সূচী অনুসারে সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

আয়োজিত অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন আনন্দবাস মিয়া মনসুর একাডেমির সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ বাকের আলী, পবিত্র বাইবেল পাঠ করেন পিন্টু বিশ্বাস।

জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন আসাদুল হক, সাহাবুদ্দিন আহমদ সেন্টু, পিন্টু বিশ্বাস।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দিনের নেতৃত্বে পূর্বোল্লিখিত ১২জন আনসার সদস্য সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড-অব-অনার প্রদর্শন করে। এ সময় মঞ্চে তার ডান পাশে একটু পিছনে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী।

Manual3 Ad Code

শপথ গ্রহণের অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নবগঠিত সরকার ও অভ্যাগত অতিথিবৃন্দ ঐতিহাসিক এ আম্রকানন ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যান। প্রগাঢ় শ্যামলিমায় আচ্ছাদিত একটি বিশালায়তন আম্রকানন তার আঁচলতলে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের এক মহৎ অধ্যায়ের সজীব চিত্রের ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিকে বুকে ধরে নীরবে তার নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার অস্তিত্বে প্রোথিত মুজিবনগর এক বিমূর্ত বাস্তবতা হয়ে ব্যাপ্ত হয়ে গেল বাঙালীর সংগ্রামী চেতনা ও কর্মে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী দিনগুলোর প্রতিটি ক্ষণে মুজিবনগর হয়ে উঠলো অনিবার্য উচ্চারণ আর বাঙালীর অবিনাশী আশ্রয়।

Manual8 Ad Code

১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল দেশের প্রথম সরকারকে গার্ড অব অর্নার প্রদানকারী ১২ জন আনসার সদস্যের মধ্যে এখনও ৩ জন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে। এদের সকলেরই বাড়ি মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায়। ব্যাক্তি জীবন তেমন সুখ সাচ্ছন্দের না হলেও ওরা স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায় অংশ গ্রহণকারী হিসাবে বুকে গর্ব ধারণ করে আছেন। স্বাধীনতার অনেক বছর পর হলেও মূল্যায়িত হচ্ছেন, এই জন্য তারা তৃপ্ত। প্রতিদিন কাজের অবসরে বিকেলে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ চত্বরে ঘুরে বেড়ান। সেখানেই তাদের সাথে কথা হয়। এখন তাদের একটি ইচ্ছে রাষ্ট্রিয় খেতাব।

আনসার সদস্য আজিমুদ্দিন শেখ জানান, তিনি এখনও দিনমজুরের কাজ করেন। শরীরে পারেনা। তারপরও অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে জীবন চালাতে হয়। ঘরে বসে খেতে তার ভালো লাগেনা।

সিরাজ উদ্দিনের সাথে দেখা মুজিবনগর গোলাপ বাগানে। তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। বললেন এভাবেই কাজ করে খায়। শরীরে আর পারেনা। সম্মানী ভাতায় চলে যায় কোন রকম।

হামিদুল হক একজন বর্গা চাষি। সারাদিন চাষাবাদ করে যে ফসল উৎপাদন করেন, তা দিয়েই তার সংসার চলে। মৃত সহকর্মীদের জন্য তাদের দুঃখ হয় বলে জানান। ভূমিহীন হিসাবে ৯৬ সালে এদের প্রত্যেককে খাসজমি বন্দোবস্তর দলিল দেয় স্থানীয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু এখনও এদের অনেকেই সেই জমির দখল পায়নি। উল্টো দখলদাররা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

আনসার সদস্য সিরাজ উদ্দিন জানান, অন্যকে বন্দোবস্ত দেয়া জমি আবার তাদের বন্দোবস্ত দেয়ায় এই জটিলতা হয়েছে। এটা তাদের কাছে খুবই কষ্টের। তিনি বলেন, এ প্রশ্নে ডিসিরা কোন প্রতিকার দেননা। তাই যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও সরকারী নানা সাহায্য পেয়ে ভালো আছি। এখন সাহায্য নয়, রাষ্ট্রীয় একটা খেতাব চান তারা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ