টেকসই অর্থনীতি গড়তে হলে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন জরুরি

প্রকাশিত: ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২৫

টেকসই অর্থনীতি গড়তে হলে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন জরুরি

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ৩০ আগস্ট ২০২৫ : বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আছে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প আর কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অবহেলা।

এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো ক্ষমতা ও সম্পদের ওপর অল্প কয়েকজন প্রভাবশালীর দখল। তাদের এই অলিগার্কি ভাঙা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অন্যথায় দেশ আবারও অচলাবস্থা ও অভ্যুত্থানের দুষ্টচক্রে আটকে পড়বে।

Manual5 Ad Code

গতকাল (২৯ আগস্ট ২০২৫) শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে শুরু হয়েছে দুইদিনব্যাপী ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৫’।

এতে দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে এমন মতামত দেন।

উদ্বোধনী সেশনের মূল বক্তা ছিলেন লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুশতাক খান।

তিনি বলেন, ‘কোনো অর্থনৈতিক নীতি কেবল সুন্দর কাগজে-কলমে সাজালেই হবে না, তা যদি বাস্তব ক্ষমতার বণ্টনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা টিকবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের বিভাজনের পর পুরনো অভিজাত শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থান ঘটে, যা আশির দশক থেকে তৈরি পোশাক খাত ও ক্ষুদ্র শিল্পকে এগিয়ে নেয়।
সে সময় কর্মসংস্থান তৈরি হয়, রপ্তানি বাড়ে, আর সাধারণ মানুষও উন্নয়নের সুফল পায়। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে আবারও অর্থনীতি চলে গেছে অল্প কিছু ধনী ও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে।’

ড. মুশতাকের মতে, এই অলিগার্কনির্ভর উন্নয়ন কিছুসংখ্যককে ধনী করেছে, কিন্তু চাকরি সৃষ্টি বা ন্যায়সংগত উন্নয়ন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি, ভুয়া প্রকল্প, ব্যাংক লুট আর অব্যবস্থাপনা এখন অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুলেছে। এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো যারা গত এক দশকে কোটি কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা।

Manual8 Ad Code

অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, অনেকেই জুলাই ২০২৪-এর গণ-আন্দোলনকে বিপ্লব বলে মনে করে, কিন্তু সেটি আসলে গণ-অভ্যুত্থান ছিল। কারণ বিপ্লবে ক্ষমতা স্থানান্তর হয়, নতুন শ্রেণি উঠে আসে। অথচ বাংলাদেশে ক্ষমতার মূল কাঠামো একই রকম রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে মূলধন সঞ্চয় হয়েছে মূলত লুটপাট ও দুর্নীতির মাধ্যমে। তিনি একে বলেছেন ‘প্রিমিটিভ অ্যাকুমুলেশন’, যা টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি করা, যারা প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবে।

Manual3 Ad Code

আরেক অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট শুধু সাম্প্রতিক নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকেই তৈরি হয়েছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগে গাফিলতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ধীরে ধীরে একটি ‘ডিলসভিত্তিক অর্থনীতি’ গড়ে ওঠে। অর্থাৎ নিয়ম-কানুনের বদলে কে কাকে চেনে বা কার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক আছে, তার ওপর নির্ভর করেই ব্যবসা-বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি সংসদে ঢুকে পড়েছেন, রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসার স্বার্থ জড়িয়ে গেছে। এতে রাষ্ট্র দখলের প্রবণতা আরো গভীর হয়েছে।

ড. সেলিম আরো বলেন, রাজনৈতিক বৈধতা হারানোর পর সরকার বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়ে উন্নয়নের বৈধতা দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ার কারণে অনেক প্রকল্পই ব্যর্থ বা অর্ধেক-অসমাপ্ত থেকে গেছে। এগুলো এখন অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমেছে, ফলে মানবসম্পদ উন্নয়ন পিছিয়ে পড়েছে।

বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মাতিন বলেন, সামাজিক খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জবাবদিহির অভাব। শুধু ওপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া জবাবদিহি নয়, দরকার মানুষকেন্দ্রিক ও কমিউনিটিভিত্তিক কাঠামো। এমনকি দুর্বল আইনি ব্যবস্থার মধ্যেও স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণ থাকলে কার্যকর জবাবদিহি গড়ে তোলা সম্ভব।

Manual4 Ad Code

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, এখনকার সংকটের মূল কারণ হলো অল্প কিছু প্রভাবশালীর হাতে সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। এর ফলে প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়েছে, উৎপাদনশীলতা কমেছে। তাঁর মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে হবে, তবে শর্ত থাকতে হবে সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ, কম সুদের হার এবং লজিস্টিক খরচ কমানো জরুরি।

বক্তাদের মতে, সঠিক সংস্কার, জবাবদিহি ও নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থান ছাড়া অর্থনীতিকে টেকসই পথে আনা যাবে না। অন্যথায় দেশ আবারও অভ্যুত্থান ও অচলাবস্থার দুষ্টচক্রে আটকে পড়বে।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ