নিরপেক্ষতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও জবাবদিহিতার প্রত্যাশা: ইশতেহার বিষয়ে সিলেটে পরামর্শ সভা

প্রকাশিত: ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২৫

নিরপেক্ষতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও জবাবদিহিতার প্রত্যাশা: ইশতেহার বিষয়ে সিলেটে পরামর্শ সভা

Manual2 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | সিলেট | ২৫ অক্টোবর ২০২৫ : সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নাগরিক প্রত্যাশা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ, ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘নাগরিক ইশতেহার’ প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে স্থানীয় অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশ আহ্বান করতে আটটি অঞ্চলে আয়োজন করা হচ্ছে আঞ্চলিক পরামর্শ সভা, যার প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয় সিলেটে।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর ২০২৫) সিলেট নগরীতে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তরুণ উদ্যোক্তারা।

সভা পরিচালনা করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের নেটওয়ার্ক ফোকাল পয়েন্ট মিজ তারান্নুম জিনান, যিনি নাগরিক ইশতেহার তৈরির প্রেক্ষাপট এবং উদ্যোগটির উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।

“চামচা পুঁজিবাদ” থেকে মুক্ত প্রশাসনের আহ্বান

বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি উত্তরণকালীন সময়ে রয়েছে—এ সময় নাগরিকদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট ও সক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। তিনি জানান, এই পরামর্শ সভাগুলো আটটি অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হবে, যাতে স্থানীয় জনগণের মতামত ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়।

তিনি আরও বলেন, “গত সরকারের সময়ে প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটি ত্রিমুখী যোগসাজশ তৈরি হয়েছিল, যার ফলে একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে যারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চায় না। এই প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে Kleptocracy বলা হলেও, এর বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে—‘চামচা পুঁজিবাদ’। স্বচ্ছতা এলে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, আর প্রতিযোগিতায় তারা টিকে থাকতে পারে না।”

নাগরিক প্রত্যাশায় শীর্ষে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও সুশাসন

সভায় মেন্টিমিটার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করা হয়—
“নির্বাচিত সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?”
উত্তরে উঠে আসে—জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, সুশাসন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গুণগত শিক্ষা, নিরাপত্তা ও দেশপ্রেম।

পরবর্তী মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, অতীতে রাজনীতিবিদরা জনগণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভবিষ্যৎ সংসদ সদস্যদের উচিত জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং রাজনৈতিক চর্চায় ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

Manual8 Ad Code

বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিতের দাবি

অংশগ্রহণকারীরা জোর দেন বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার ওপর এবং গণমাধ্যমের জন্য একটি চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সাধারণ বক্তব্যের পরিবর্তে ইশতেহারে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের আহ্বান

দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিশেষত সিলেটের প্রেক্ষাপটে অংশগ্রহণকারীরা নতুন সরকারের কাছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে স্থানীয় প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।
কৃষিখাতে অনবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও “জাস্ট ট্রানজিশন” কাঠামোর আওতায় আনার পরামর্শও উঠে আসে।

প্রযুক্তি, যুব ও নাগরিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বারোপ

সভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি বিষয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে নাগরিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে তরুণ ও নারী সমাজের নিরাপত্তা, নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।

Manual2 Ad Code

যুব ও প্রযুক্তি বিষয়ক আলোচনায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অপব্যবহার রোধে রাজনৈতিক ইশতেহারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।

কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবিক জীবনের নিশ্চয়তা

Manual4 Ad Code

অসুবিধাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ব্যাটারি চালিত রিকশা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না রাখা উদ্বেগজনক।
তারা পথশিশুদের অন্তর্ভুক্তি, আঞ্চলিক বিনিয়োগের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সর্বজনীন ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানান, যাতে প্রত্যেক নাগরিক মানবিক জীবনের অধিকার ভোগ করতে পারেন।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনায় শিক্ষিত বেকারত্ব নিরসন, প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় পর্বের প্রতিক্রিয়া: জবাবদিহিতা, নিরাপত্তার দাবিও উঠে আসে

সভা শেষে পুনরায় মেন্টিমিটার প্ল্যাটফর্মে একই প্রশ্ন করা হলে অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখা যায়।
দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিক্রিয়ায় অসাম্প্রদায়িকতা, জবাবদিহিতা, নিরাপত্তার দাবি—এই বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।

Manual3 Ad Code

“গণতন্ত্র রক্ষায় চিরস্থায়ী সতর্কতা অপরিহার্য”

সভা সমাপ্তি বক্তব্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঘটনাবলি স্মরণ করে বলেন, “আমরা অনেককে হারিয়েছি, তবে নতুন এক প্রজন্মকেও চিনেছি।”

তিনি নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, “Eternal vigilance is the price of democracy” — অর্থাৎ গণতন্ত্র রক্ষার জন্য চিরস্থায়ী সতর্কতা অপরিহার্য।

উপসংহার

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের এ আঞ্চলিক পরামর্শ সভা দেশের নাগরিক ইশতেহার প্রণয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সভায় আলোচিত বিষয়গুলো—দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক সরকার, নিরাপত্তা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ ও মানবিক অর্থনীতি—দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক এজেন্ডায় নাগরিকদের প্রত্যাশার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ