সাহস ও সততার প্রতীক: ড. নীলিমা আখতার

প্রকাশিত: ৬:৫৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৬, ২০২৫

সাহস ও সততার প্রতীক: ড. নীলিমা আখতার

Manual6 Ad Code

নওশাদ জামিল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী, নীতিবান ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ড. নীলিমা আখতারের জন্মদিন আজ। তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধা জানাতে লিখছি কিছু কথা— শুধু একজন শিক্ষকের প্রতি নয়, একজন আদর্শ, একজন আলোকবর্তিকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়াসে।

Manual1 Ad Code

কয়েক মাস আগে ফেসবুকে মতপ্রকাশের কারণে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই সিদ্ধান্ত আসে। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা একাডেমিক অভিযোগ ছিল না— ছিল শুধু একটি ফেসবুক পোস্ট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি এক দৃষ্টান্তবিরল ঘটনা, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করাই ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অথচ ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ অনুযায়ী শিক্ষকরা তাঁদের মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রাখেন, এমনকি রাজনীতিতেও অংশ নিতে পারেন। সেই আইন শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

ড. নীলিমা আখতার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় দুই দশক ধরে। ২০০৫ সালে তিনি নিজের যোগ্যতায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে নির্বাচিতদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থানে ছিলেন। তাঁর একাডেমিক যাত্রা ছিল অসাধারণ— ইংরেজি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্সে উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। আরও আগে, ১৯৯৫ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন এবং সারাদেশে সর্বোচ্চ নম্বর পান।

Manual5 Ad Code

তাঁর শিক্ষাজীবনের উজ্জ্বলতা এখানেই থেমে থাকেনি। বঙ্গবন্ধু ওভারসিজ স্কলারশিপে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং কিছুদিন সেখানে শিক্ষকতাও করেন। চাইলে তিনি বিদেশেই স্থায়ী হতে পারতেন, কিন্তু দেশের টানে ফিরে এসেছেন। এর আগে কমনওয়েলথ স্কলারশিপে ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক থেকে দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

Manual7 Ad Code

তাঁর একাডেমিক মেধা, সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই— তা তাঁর সমালোচকরাও স্বীকার করেন। কিন্তু যেটি তাঁকে আজ বিতর্কের কেন্দ্রে এনেছে, সেটি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস নয়; বরং সত্য উচ্চারণের সাহস।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, “মৌলবাদী শক্তি তরুণদের ব্যবহার করছে, তরুণদের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে।” সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা, যা আজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইতিহাসই একদিন বলবে— তিনি ভুল বলেননি।

সাহসিকতা তাঁর নতুন নয়। ১৯৯৫ সালে এসএসসিতে প্রথম হওয়ার পর ‘ভোরের কাগজ’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছিলেন, তাঁর প্রিয় ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনও তিনি ছিলেন এক কিশোরী, কিন্তু তাঁর চিন্তার ভিত ছিল দৃঢ় ও আলোকিত।

আজও তাঁর অবস্থান একই জায়গায়— তিনি এমন এক বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন, যেখানে মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে, যেখানে সত্য বলা অপরাধ নয়, যেখানে যুক্তি ও মানবিকতা রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

ড. নীলিমা আখতার কেবল একজন শিক্ষক নন; তিনি সময়ের এক প্রতীক— সততার, সাহসের এবং আদর্শের প্রতীক। এমন সময়ে, যখন সত্য বলা ঝুঁকিপূর্ণ, তখনও তিনি নির্ভয়ে কথা বলেন। তাঁর মতো মানুষরাই সমাজে আলোর দিশা দেখান।

আমি বিশ্বাস করি, একদিন তিনি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন। হয়তো তিনি উপাচার্য হবেন— রাজনীতির কারণে নয়, তাঁর যোগ্যতা, নৈতিকতা ও নীতির কারণে।

আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা তাঁর জন্য প্রার্থনা করি— যেন তিনি সত্য, ন্যায় ও সাহসের পথে আরও দৃঢ় থাকেন। তাঁর আলো যেন আরও বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

শুভ জন্মদিন, ড. নীলিমা আখতার। আপনি আমাদের প্রেরণা, আমাদের গর্ব।
#
লেখক :
নওশাদ জামিল
সাংবাদিক।

 

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ