অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করছি নাকি?

প্রকাশিত: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০২৫

অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করছি নাকি?

Manual2 Ad Code

ফাতিহা আয়াত |

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন ইস্যুতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সম্মেলনে সাতবার বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করিনি; প্রতিবারই বাংলাদেশের হয়ে কথা বলেছি—বাংলাদেশের টেকসই অভিযোজন (Sustainable Adaptation) এবং জলবায়ু প্রশমন (Climate Mitigation) নীতিকে সামনে রেখে।

এই যাত্রা সহজ ছিল না। যৌথ নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের প্রতিনিধি দলের কঠোর মনোভাবের মুখে কখনো কখনো প্রকাশ্যে অপমানিতও হতে হয়েছে। কিন্তু দেশের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে আমি কখনো পিছু হটিনি। বাংলাদেশ, আমার জন্মভূমি, আমার অনুপ্রেরণা—এই দেশটাকে নিয়ে গর্ব করাই আমার শক্তি।

Manual1 Ad Code

দেশে ফিরে বাস্তবতার মুখোমুখি

Manual7 Ad Code

গতবছর দেশে ফেরার পর থেকে এটি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের মৌসুম। ভেবেছিলাম, এবার দেশের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, নীতি-নির্ধারক এবং মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আরও শক্তভাবে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করতে পারব। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে হতাশ করেছে।

Manual4 Ad Code

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ম‍্যামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। তাঁকে জানিয়েছি—কিয়োটো প্রোটোকল, বালি এন্ডোর্সমেন্ট, কোপেনহেগেন অ্যাকর্ড, প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট ও গ্লাসগো প্যাক্টে আমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে Green Climate Fund–এর প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল থেকে বাংলাদেশের জন্য দ্রুত অর্থ ছাড় করাতে আমি আন্তর্জাতিক পরিসরে কণ্ঠ তুলতে চাই।

Manual2 Ad Code

এছাড়া UN Sustainable Development Solutions Network–এর কাছে বাংলাদেশের নদীভাঙন, নাব্যতা হ্রাস, মৌসুমি প্লাবন, ভূমিধস, অতিরিক্ত পলিপ্রবাহ ও উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা কমানোর বিষয়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা চাওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছি।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল নিরুৎসাহজনক। একের পর এক মেসেজে পাওয়া সংক্ষিপ্ত জবাব—“Noted”, “Wish I had that 10 minutes”—আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, যোগ্যতা, উদ্যম ও আন্তরিকতা থাকলেও অনেক সময় দেশের জন্য কাজ করা কতটা কঠিন। এমনকি আমি জানালাম, সরকারি কোনো অর্থ নয়, নিজ খরচেই যাব-আসব, তবু আমার কথা শোনা হলো না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইয়ুথ ভয়েসের গুরুত্ব

আজকের বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে ইয়ুথ ভয়েস বা তরুণদের কণ্ঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারা ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও অসংখ্য তরুণ-তরুণী আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাদের যথাযথভাবে স্বীকৃতি ও সহযোগিতা দিচ্ছি?

আমাদের দেশে অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব, পরিচয় ও রাজনীতিক সংযোগই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করতে চায়, তারা বারবার উপেক্ষিত হয়।

একটা প্রশ্ন থেকেই যায়

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কি তবে অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করছি?
বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করতে চেয়ে যদি এমন অনাগ্রহ, এমন উদাসীনতা পাই, তবে ভবিষ্যতের প্রজন্মকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করব?

শেষ কথা

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনের লড়াইয়ে একদিন বিশ্বের সামনে আদর্শ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও সঠিক নেতৃত্বের। প্রতিটি তরুণের কণ্ঠকে মূল্য দিতে হবে, প্রতিটি আন্তরিক উদ্যোগকে সম্মান জানাতে হবে।

আমরা যদি নিজেদের উদাসীনতা দূর করতে না পারি, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রকৃত সম্ভাবনা কখনোই বিকশিত হবে না।

লেখক:
ফাতিহা আয়াত
(Faatiha Aayat)
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বক্তা ও অ্যাক্টিভিস্ট

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ