ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয়—সচেতনতা জরুরি

প্রকাশিত: ১:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২৫

ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয়—সচেতনতা জরুরি

Manual5 Ad Code

সোনিয়া আকতার |

ঢাকা ও আশপাশের শহরগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর অধিকাংশ আবাসনই ৫ থেকে ৭ তলার অ্যাপার্টমেন্ট—যেখানে ভূমিকম্পের সময় জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে প্রথম ১০ থেকে ২০ সেকেন্ডে নেওয়া সিদ্ধান্ত। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেখা যায়—আতঙ্কে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যাওয়া বা বারান্দায় বের হওয়ার প্রবণতাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটায়।

সিঁড়ি: সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ স্থান

বিশ্বব্যাপী ভবনধস সংক্রান্ত গবেষণাগুলো বলছে, ভূমিকম্পের সময় নিচের তলা ধসে পড়লে তার চাপ প্রথমেই পড়ে সিঁড়ির অংশে। এতে সিঁড়িতে থাকা মানুষ ধসের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হয় বা প্রাণ হারায়। একই সঙ্গে ভিড়, অন্ধকার ও ধাক্কাধাক্কি আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।
শুধু সিঁড়িই নয়, বারান্দা ও লিফটও বড় ঝুঁকির জায়গা। বারান্দার রেলিং বহু দিক থেকে চাপ পেয়ে সহজেই ভেঙে নিচে পড়ে যেতে পারে। আর কম্পনের সময় লিফট জ্যাম হয়ে যাওয়া বা মাঝপথে আটকে পড়া প্রাণঘাতী হতে পারে।

Manual2 Ad Code

নিরাপদ থাকার কৌশল: Drop – Cover – Hold On

বহু দেশের ভূমিকম্প–নিরাপত্তা প্রোটোকলে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে Drop – Cover – Hold On নির্দেশনা।

ভূমিকম্প শুরু হলে—

১. বেডরুমে

মজবুত খাটের নিচে আশ্রয় নিন। ধ্বংসাবশেষ পড়লেও খাটের নিচে ‘লাইফ ট্রায়াঙ্গেল’ তৈরি হয়, যা তুলনামূলক নিরাপদ।

২. ড্রয়িং বা ডাইনিংয়ে

মজবুত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন। কাঁচ, জানালা, বড় ফ্রেম বা আলমারির কাছে যাবেন না।

৩. কিছুই না থাকলে

দেয়ালের কোনো কোণে বসে মাথা–ঘাড় ঢেকে রাখুন—যাকে বলা হয় সেফ কর্নার পজিশন।

৪. বাথরুমে

এটি অনেক সময় ভবনের সবচেয়ে শক্ত অংশ। সম্ভব হলে মাথায় বালতি বা হেলমেট ব্যবহার করুন।

৫. মাথা রক্ষায়

হেলমেট, ব্যাগ, ঝুড়ি, বালতি—যা পাওয়া যায় তাই মাথার ওপর ধরে রাখুন। ভূমিকম্পে পড়া যেকোনো বস্তু প্রথমেই মাথায় লাগে—মাথা বাঁচানো মানেই জীবনের সম্ভাবনা বাড়ানো।

১ম ও ২য় তলায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত

Manual3 Ad Code

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১ম ও ২য় তলায় থাকলে খুব দ্রুত নিরাপদে ভবন থেকে বের হওয়ার সুযোগ থাকে।
কম্পন শুরু হলে—

সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে রাখুন (জ্যাম হয়ে যেতে পারে),

প্রথম ১৫–২০ সেকেন্ডের মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন,

ভবন থেকে অন্তত ১০০ ফুট দূরে অবস্থান নিন,

বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার বা বড় গাছের নিচে দাঁড়াবেন না;

৪র্থ তলা বা তার ওপরে থাকলে দৌড়ে নামতে গেলে সিঁড়িতেই বিপদের মুখে পড়ার ঝুঁকি বিপুল—এমন পরিস্থিতিতে আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

ধ্বংসস্তূপে আটকে গেলে করণীয়

Manual2 Ad Code

আন্তর্জাতিক রেসকিউ প্রটোকল অনুযায়ী—

চিৎকার করবেন না—ধুলো ফুসফুসে প্রবেশ করে সমস্যা বাড়াতে পারে,

হুইসেল ব্যবহার করুন, না থাকলে পাইপ বা দেয়ালে তিনবার করে টোকার শব্দ দিন—এটি আন্তর্জাতিক SOS সংকেত;

ফোনের টর্চ অন রাখুন, কিন্তু কথাবার্তা কম বলুন—ব্যাটারি বাঁচাতে হবে,

মুখে কাপড় বা রুমাল চেপে রাখুন।

প্রস্তুতি: জীবন রক্ষার প্রথম ধাপ

ঝুঁকি কমাতে ঘরেই কিছু সহজ প্রস্তুতি নেওয়া যায়—

বিছানার পাশে জুতা, টর্চ, হুইসেল ও হেলমেট রাখুন;

Manual4 Ad Code

ভারী আসবাব দেয়ালে স্ক্রু দিয়ে স্থির করে রাখুন,

গ্যাস সিলিন্ডার চেইন বা স্ট্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখুন,

দরজা যেন অটো-লক না হয়,

জরুরি নম্বর পরিবারের সবাইকে জানিয়ে রাখুন।

শেষ কথা

প্রকৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষ ভঙ্গুর, কিন্তু সচেতনতা অসীম শক্তির উৎস। ভূমিকম্পের মতো অনিশ্চিত দুর্যোগে জীবন–বাঁচানোর সিদ্ধান্তের সময় থাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। সেই কয়েক সেকেন্ডেই পূর্বপ্রস্তুত জ্ঞান ও শান্ত থাকা পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে।

সচেতনতা গড়ে তুলুন, প্রস্তুতি নিন—নিজের, পরিবারের ও সমাজের নিরাপত্তার জন্য।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ