অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৫, ২০২৬

অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ : খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আনিসুর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দেশ ও মানুষের কল্যাণে আজীবন কাজ করা এই চিন্তাবিদের অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে রাষ্ট্র, শিক্ষাঙ্গন ও উন্নয়নকর্মী মহল।

অধ্যাপক আনিসুর রহমান গত বছরের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক শোকবার্তায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি গভীরভাবে চিন্তাশীল এই অর্থনীতিবিদের অবদান আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। উন্নয়নকে মানুষের অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করার যে দর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা আজও আমাদের পথ দেখায়।”

Manual4 Ad Code

অধ্যাপক আনিসুর রহমানের ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ তাঁর শিক্ষকের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমরা তাঁকে শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন চিন্তাশীল মানুষ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে পেয়েছিলাম। প্রথম দিনের ক্লাসেই তিনি বলেছিলেন—‘তোমাদের কোনো টেক্সট বই নেই। তোমরা মাইক্রো ইকোনমিকস শিখবে কৃষকদের কাছ থেকে।’ এই কথার মধ্যেই তাঁর দর্শন লুকিয়ে ছিল।”

জীবন ও শিক্ষা

১৯৩৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করা অধ্যাপক আনিসুর রহমানের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করেন এবং দীর্ঘদিন একাডেমিক ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

Manual2 Ad Code

রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণাপত্র প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সংগঠক। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামের সঙ্গে তিনি সদস্য হিসেবে যুক্ত হন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অবদান রাখেন।

Manual5 Ad Code

আন্তর্জাতিক পরিসরে অবদান

নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘পথে যা পেয়েছি’–তে অধ্যাপক আনিসুর রহমান উল্লেখ করেন, ১৯৭৭ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর আমন্ত্রণে তিনি জেনেভায় যোগ দেন। সেখানে তিনি গ্রামীণ উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক একটি বিশ্বব্যাপী কর্মসূচি প্রণয়ন ও পরিচালনা করেন, যা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

১৯৯১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি অংশীদারি গবেষণা ও আত্মনির্ভর উন্নয়নের দর্শন ও পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। উন্নয়ন চিন্তায় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভাবনা ও রচনাবলি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়নকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বহুমাত্রিক প্রতিভা

Manual7 Ad Code

অর্থনীতি ও উন্নয়ন দর্শনের পাশাপাশি অধ্যাপক আনিসুর রহমান ছিলেন একজন সুপরিচিত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও গবেষক। সংগীত ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজকে দেখার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী মানবিক চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

গ্রন্থ ও রচনা

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন জিজ্ঞাসা, যে আগুন জ্বলেছিল: মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, My Story of 1971, অপহৃত বাংলাদেশ এবং আত্মজীবনী পথে যা পেয়েছি। এসব লেখায় উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও সমাজের গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে অধ্যাপক আনিসুর রহমানকে স্মরণ করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেছেন, উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক সূচকে না দেখে মানুষের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার যে দর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা আজও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ