গঙ্গা চুক্তিতেই কি থেমে যাবে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০২৬

গঙ্গা চুক্তিতেই কি থেমে যাবে বাংলাদেশ

Manual3 Ad Code

খন্দকার শিহাবুর রহমান |

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ—এটি আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। তবে এই নদীগুলোর প্রায় সবকটির উৎপত্তিস্থলই প্রতিবেশী দেশগুলোতে। গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে।

উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে কেবল এই গঙ্গা নিয়েই পূর্ণাঙ্গ একটি চুক্তি রয়েছে। অথচ বাকি ৫৩টি নদীর ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।

Manual5 Ad Code

গঙ্গা নদী ভারতে গঙ্গা এবং বাংলাদেশে পদ্মা নামে প্রবাহিত। এই নদীর ওপর স্থাপিত ফারাক্কা বাঁধ মূলত কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য তৈরি করা হলেও তা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল ফারাক্কা নয়, বাংলাদেশের সীমান্তের চারপাশেই ভারত বিভিন্ন নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে। উত্তরে তিস্তায় গজলডোবা বাঁধ, ফেনী সীমান্তে ডুম্বুর বাঁধ এবং সিলেটে বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখ বাঁধ (প্রস্তাবিত)—এগুলো যেন একেকটি ‘জলবোমা’। ২০২৪ সালে ডুম্বুর বাঁধ ছেড়ে দেওয়া পানিতে ফেনীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, তা আমাদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর মতে, এই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। বিস্ময়কর তথ্য হলো, পৃথিবীর আর কোথাও মাত্র ১৬.৫ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ফারাক্কার মতো কোনো আন্তর্জাতিক বাঁধ নেই।

Manual2 Ad Code

নদী নিয়ে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান বরাবরই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা তারা খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। যদিও ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সঙ্গে ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ হয়েছিল, তবে সেটি ছিল এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। গঙ্গা চুক্তির সময়ও ভারত কোনো তৃতীয় পক্ষকে আসতে দেয়নি। নেপাল, ভুটান বা চীনকে যুক্ত করে বহুপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ভারত তাতে সায় দিচ্ছে না। বর্তমানে চীনের ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা এবং ভারতের পাল্টা অরুণাচল প্রদেশে বাঁধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ব্রহ্মপুত্র থেকে বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ পানির যোগান আসে; ফলে এখানে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে বাধ্য।

Manual3 Ad Code

২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা থমকে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও বাকি ৫৩টি নদী নিয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ভারতের অনীহার একটি বড় কারণ হতে পারে তারা পানি বণ্টনের কোনো ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বা মানদণ্ড তৈরি করতে চায় না। কারণ একটি নদীর জন্য ন্যায্য অধিকার স্বীকৃত হলে বাংলাদেশ বাকি নদীগুলোর জন্যও একই দাবি তুলবে। এছাড়া নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার (ডিফেন্ডার্স প্যারাডাইস) ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

২০২৪ সালে ডুম্বুর বাঁধ ছেড়ে দেওয়া পানিতে ফেনীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, তা আমাদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর মতে, এই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।

ভারতের পক্ষ থেকে সবসময়ই পানির বিনিময়ে কিছু স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মনিরুজ্জামান মিয়া তার ‘হাইড্রোপলিটিক্স অব দ্য ফারাক্কা ব্যারেজ’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তিটির পেছনে তৎকালীন ভারত সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বিনিময়ে ট্রানজিট সুবিধা, চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক ছাড়ের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলাদেশ সেসব সুবিধা ভারতকে দিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে গঙ্গার পানির যে ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার কথা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
চুক্তিহীনতার ফলে বাংলাদেশের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অপূরণীয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ-প্রকল্প ও পাকশি পেপার মিলের মতো বড় বড় উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষেরা পানিবাহিত রোগে ভুগছে। পানির অভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে—এই বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকটের দায় কে নেবে?

তবে আশার আলো দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক আইন। গত ২০ জুন ২০২৪-এ বাংলাদেশ প্রথম দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে ‘ইউএনইসিই ওয়াটার কনভেনশন’-এ যুক্ত হয়েছে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার আদায়ে এই আন্তর্জাতিক কনভেনশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এতে যুক্ত না থাকলেও বাংলাদেশ এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মহলে ন্যায্যতার দাবি জোরালো করতে পারবে।
পরিশেষে বলতে চাই, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে অন্যান্য নদীর পানির অধিকার আদায়ে বাংলাদেশকে কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। চীনের তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো প্রকল্পগুলো ভারতের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একইসাথে ভারতের সঙ্গে ‘রিভার লিংকিং প্রজেক্ট’ এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের মতো কারিগরি বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি ‘জাতীয় নদী মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

বন্ধুত্বের সম্পর্ক কেবল মুখে নয়, বরং পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই প্রমাণিত হওয়া উচিত। ২০২৬ সালের গঙ্গা চুক্তির নবায়ন যেন কেবল একটি চুক্তি না হয়ে ৫৪টি নদীর অধিকার আদায়ের সূচনাবিন্দু হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Manual8 Ad Code

#

খন্দকার শিহাবুর রহমান
শিক্ষার্থী
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ