মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও রাজনীতিবিদ সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও রাজনীতিবিদ সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : আজ মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পুরোধা, ছাত্রদের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের অন্যতম প্রণেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী।

দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির এই নিরলস সংগ্রামী নেতার জীবন ও অবদান স্মরণ করছেন সহকর্মী, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা।

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “১৯৬৯ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সামনের সারির এক সাহসী যোদ্ধা। তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং একটি অগ্রসরমান বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে। আজকের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর মতো দূরদর্শী ও ত্যাগী নেতার বড় প্রয়োজন ছিল। আমরা তাঁর কর্মময় ও সংগ্রামী জীবনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।”

সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক ছিলেন ’৬২, ’৬৪ ও ’৬৯-এর গণআন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কুশলী সংগঠক এবং শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক।

রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক ২০০৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

Manual4 Ad Code

তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ২৪ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায়। তাঁর পিতা মৌলভি সিদ্দিক আহমদ ছিলেন একজন শিক্ষক এবং মাতা আলিফা খাতুন। পারিবারিকভাবে তাঁর পৈত্রিক নিবাস ফেনী জেলার পরশুরাম থানার ধনিকুন্ডা গ্রামে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব এবং দেশের অন্যতম প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

সাইফউদ্দিন মানিক ছিলেন বিশ শতকের ষাটের দশকের প্রখ্যাত ছাত্রনেতা। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের এক অংশের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। তিনি ছিলেন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে গঠিত যৌথ গেরিলা বাহিনীর অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালে তিনি সিপিবির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৯৪ সালে তিনি ‘গণফোরাম’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে জাতি। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

কমরেড সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিককে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —

কমরেড সাইফউদ্দিন মানিক

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজও ফেব্রুয়ারির বাতাসে
লাল রক্তের গন্ধ আসে,
শহীদ মিনার, শ্রমিক মিছিল
এক নাম ডেকে যায় পাশে—
মানিক, তুমি আছো কোথায়?
নাকি আছো সবখানেই,
মিছিলে, স্লোগানে,
কারাগারের দেয়াল ভেঙে
মানুষের অধিকারে।

Manual8 Ad Code

জলপাইগুড়ির মাটিতে জন্ম,
ফেনীর ধূলিতে শেকড়,
শিক্ষকের ঘরে আলো জ্বলে
মানুষ গড়ার শেখড়।
শৈশব থেকেই খেলাধুলা
গান আর নাট্যপথে,
সংস্কৃতি আর সংগ্রাম মিশে
একই রক্তস্রোতে।

ঢাকা শহর, বিশ্ববিদ্যালয়,
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ,
কিন্তু বইয়ের অক্ষর ছাড়িয়ে
রাস্তাই ছিল তার পাঠ।
সংস্কৃতি সংসদ, ছায়ানট,
ব্রাদার্সের ঘাম,
সুর আর শ্লোগান মিলিয়ে
রাজনীতির নাম।

বাষট্টির কালো আইয়ুব,
শিক্ষা-কমিশনের বিষ,
ছাত্রসমাজ জ্বলে উঠলে
তুমিই প্রথম শিষ।
চৌষট্টি, ঊনসত্তর
গণমানুষের ঢেউ,
মানিক ছিলেন অগ্রভাগে
নির্ভীক এক নেউ।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন
হাত ধরেছিল যাঁর,
একাত্ম হল ছাত্র-জনতা
শ্রমিকের অধিকার।
এগারো দফার অগ্নিবীজ
যে হাতে রোপণ,
সে হাত জানত গণঅভ্যুত্থান
কেবল সময়ের ক্ষণ।

উনসত্তরের রাজপথে
কারফিউ ভাঙা সকাল,
স্বৈরশাসনের বুকে আঘাত
ছাত্র-জনতার ঢাল।
জেলের লোহার দরজা ভেঙে
স্বাধীনতার গান,
মানিক তখন কণ্ঠে কণ্ঠে
এক বিদ্রোহী প্রাণ।

Manual3 Ad Code

একাত্তরের রক্তিম মার্চে
যখন দেশ জ্বলে ওঠে,
ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন
এক পতাকার ছোঁটে।
যৌথ গেরিলা বাহিনীর
নীরব সংগঠক,
মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে
জয়ের পরিকল্পক।

স্বাধীনতার পরেও থামেনি
সংগ্রামের অভিযাত্রা,
শোষণমুক্ত সমাজ গড়াই
ছিল তাঁর একমাত্র মন্ত্র।
কমিউনিস্ট পার্টির পতাকায়
দৃঢ় বিশ্বাসী হাত,
সম্পাদক, সভাপতি হয়ে
চালিয়েছেন দিন-রাত।

গণফোরামের বীজ রোপণ
নব্বইয়ের অস্থির কালে,
গণতন্ত্র, ভোটাধিকার
ছিল তাঁরই ভালোবাসা জ্বালে।
ক্ষমতার নয়, মানুষের পাশে
থাকাই ছিল শপথ,
নীতির কাছে আপসহীন
সারাজীবনের পথ।

Manual7 Ad Code

আজ যখন ভোটাধিকার
ফের প্রশ্নের মুখে,
আইনের শাসন ক্ষতবিক্ষত
নানান ছলনার সুখে—
আজ বেশি করে মনে পড়ে
মানিকের সেই ডাক,
“সংগ্রাম ছাড়া মুক্তি নেই”—
এই ছিল তাঁর বাক।

তুমি নেই, তবু আছো মানিক,
ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়,
মজুরের মুঠিতে, ছাত্রের কণ্ঠে
প্রতিবাদের ভাষায়।
১৮ বছর নয়, শতাব্দী পেরোলেও
শেষ হবে না স্মরণ,
কারণ তুমি ব্যক্তি নও—
তুমি এক আন্দোলন।

আজ তোমার মৃত্যুদিনে
নই শুধু শোকের গান,
এই লেখা এক অঙ্গীকার—
চালাবো তোমার পথের মান।
লাল সূর্য উঠুক আবার
শোষণহীন বাংলাদেশে,
সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই মানিক
থাকো মানুষের বিশ্বাসে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ