শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ অপরিহার্য

প্রকাশিত: ১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬

শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ অপরিহার্য

Manual7 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণ একটি গভীর ও জটিল সামাজিক সমস্যা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যে দেখা যাচ্ছে—এই অপরাধের প্রকৃতি যেমন বহুমাত্রিক হচ্ছে, তেমনি এর বিস্তারও নতুন নতুন ক্ষেত্র, বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বিষয়টি আর কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন জননিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং টেকসই উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে “Strengthening Community and Institutional Response to Child Sexual Abuse and Exploitation” শীর্ষক প্রকল্পটি এই বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—শিশু সুরক্ষা কেবল কোনো একক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; বরং রাষ্ট্র, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, পরিবার এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব।

সমস্যার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট

শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণের পেছনে বেশ কিছু গভীর আর্থসামাজিক কারণ কাজ করে। এসব কারণ চিহ্নিত না করে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

১. দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

দারিদ্র্য শিশুদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অনেক পরিবার জীবিকার তাগিদে শিশুদের শ্রমে যুক্ত করে বা নিরাপত্তাহীন পরিবেশে পাঠায়। আর্থিক দুর্বলতা পরিবারকে কখনো কখনো আপস করতে বাধ্য করে, যা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়।

২. শিক্ষা ও সচেতনতার ঘাটতি

অনেক শিশু ও অভিভাবকই জানেন না কোন আচরণ যৌন নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত, কোথায় অভিযোগ করতে হয় বা কীভাবে সহায়তা পাওয়া যায়। যৌনতা বিষয়ক ট্যাবু ও নীরবতা সংস্কৃতি অপরাধকে আড়াল করে রাখে।

৩. সামাজিক ক্ষমতার বৈষম্য

প্রভাবশালী ব্যক্তি, নিয়োগকর্তা, শিক্ষক বা আত্মীয়ের হাতে নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে না। সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে।

৪. অনলাইন ঝুঁকি

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের উপস্থিতি বাড়লেও নিরাপত্তা জ্ঞান বাড়েনি। সাইবার গ্রুমিং, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া—এসব নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

৫. আইন প্রয়োগ ও বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্ব

অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী ও পরিবারকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা ভয় অভিযোগ প্রত্যাহারে বাধ্য করে।

রাষ্ট্র ও সরকারের করণীয়

শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সর্বাগ্রে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ জরুরি—

১. আইনগত কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও কার্যকর প্রয়োগ

Manual5 Ad Code

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং শিশু আইন বাস্তবায়নে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
শিশু-বান্ধব তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অনলাইন অপরাধ দমনে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো।

Manual8 Ad Code

২. জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন

শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, স্বরাষ্ট্র, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা থাকবে।

৩. বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি

শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে নিয়মিত বাজেট কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় শিশু সুরক্ষা সেল গঠন ও কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

৪. অনলাইন সুরক্ষা নীতিমালা

শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধ্যতামূলক ডিজিটাল লিটারেসি কারিকুলাম।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত প্রকল্প অবহিতকরণ সভার মতো উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক।
উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় করা।
বিদ্যালয়ে শিশু সুরক্ষা নীতি বাধ্যতামূলক করা।
চা-বাগান, শিল্পাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় বিশেষ নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত ও সমাজনেতাদের সম্পৃক্ততা সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Manual8 Ad Code

জনগণের করণীয়

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য।
১. নীরবতা ভাঙা: নির্যাতনের ঘটনা গোপন না রেখে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করা।
২. পারিবারিক শিক্ষা: শিশুদের ‘সেফ টাচ’ ও ‘আনসেফ টাচ’ সম্পর্কে শেখানো।
৩. ডিজিটাল তদারকি: শিশুদের অনলাইন কার্যক্রমে অভিভাবকীয় নজরদারি ও দিকনির্দেশনা।
৪. সামাজিক নজরদারি: সন্দেহজনক আচরণ সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা।

আর্থসামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কেবল দমনমূলক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত উন্নয়ন।

১. দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষা
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য ভাতা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাড়াতে হবে।

২. মানসম্মত শিক্ষা ও জীবনদক্ষতা
পাঠ্যক্রমে বয়সভিত্তিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শিশুদের আত্মরক্ষা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে জীবনদক্ষতা শিক্ষা প্রয়োজন।

৩. কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন
ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত।

৪. গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক নীতি
শিশু নির্যাতনের প্রকৃতি, ঝুঁকি ও প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারণ প্রমাণভিত্তিক হয়।

সুপারিশ

১. প্রতিটি জেলায় সমন্বিত শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠন।
২. বিদ্যালয়ভিত্তিক বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি ও অভিযোগ বক্স।
৩. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি।
৪. অনলাইন শিশু সুরক্ষায় বিশেষ হটলাইন ও রিপোর্টিং সিস্টেম চালু।
৫. বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের যৌথ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা।

উপসংহার

শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণ কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা। একটি শিশু যখন নিরাপত্তাহীনতায় বড় হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাই প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

শ্রীমঙ্গলের উদ্যোগ প্রমাণ করে—সচেতনতা ও সমন্বিত প্রয়াস থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে জাতীয় পরিসরে বিস্তৃত করা, যাতে প্রতিটি শিশু নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ভয়েরহীন পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।

Manual2 Ad Code

শিশু সুরক্ষা হোক রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার—এটাই সময়ের দাবি।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ