সিলেট ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২৬
অনুসন্ধিৎসু | ঢাকা, ০১ এপ্রিল ২০২৬ : লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু নাম কিংবদন্তির মতো উচ্চারিত হয়। আর্নেস্টো চে গেভারা সেই তালিকার শীর্ষে থাকলেও, চে–র সংগ্রাম, মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুর প্রতিশোধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি নাম—কমরেড মণিকা এর্টল (Monika Ertl)। তিনি ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত এক বলিভিয়ান সমাজতন্ত্রী গেরিলা যোদ্ধা, যিনি চে গেভারার হত্যার সঙ্গে জড়িত বলিভিয়ার কর্নেল রোবের্তো কুইনতানিল্লা পেরেইরাকে হত্যা করে ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মণিকা এর্টল জন্মগ্রহণ করেন জার্মানিতে, কিন্তু তার জীবনের বড় অংশ কেটেছে বলিভিয়ায়। তার পিতা হান্স এর্টল ছিলেন জার্মানির নাৎসি মতবাদের সঙ্গে যুক্ত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি শাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। যুদ্ধ শেষে নাৎসি সংশ্লিষ্ট অনেকের মতো তিনিও ইউরোপ ছেড়ে লাতিন আমেরিকায় পালিয়ে যান এবং বলিভিয়ায় বসবাস শুরু করেন।
কিন্তু মণিকা তার পিতার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। নাৎসিবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও আদর্শিক মোড়।
চে গেভারা ও বলিভিয়ার গেরিলা সংগ্রাম
১৯৬০-এর দশকে লাতিন আমেরিকায় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন আর্নেস্টো “চে” গেভারা। কিউবার বিপ্লবের সফলতার পর তিনি বলিভিয়ায় গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বিপ্লব সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।
১৯৬৭ সালে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ–র সহায়তায়, চে গেভারাকে বন্দী করে। পরে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঐ সময় বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর যে কর্মকর্তারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের মধ্যে কর্নেল রোবের্তো কুইনতানিল্লা পেরেইরার নাম উল্লেখযোগ্য। চে গেভারাকে হত্যা করার পর তার হাত কেটে নেওয়া হয়—যা ইতিহাসের এক নৃশংস ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
এই ঘটনার পর লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সংগঠনগুলো চে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বলিভিয়ার ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ELN)-এর সঙ্গে যুক্ত হন মণিকা এর্টল। তিনি ধীরে ধীরে একজন সক্রিয় গেরিলা কর্মী হয়ে ওঠেন।
প্রতিশোধের পরিকল্পনা
চে হত্যার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্নেল রোবের্তো কুইনতানিল্লা ছিলেন অন্যতম টার্গেট। বলিভিয়ার সরকার আশঙ্কা করছিল যে বিপ্লবীরা তাকে হত্যা করতে পারে, তাই তাকে জার্মানির হামবুর্গে বলিভিয়ার কনসাল/রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়।
কিন্তু বিপ্লবী সংগঠন ELN তাকে ছাড় দেয়নি। পরিকল্পনা করা হয় তাকে ইউরোপেই হত্যা করা হবে। এই দায়িত্ব দেওয়া হয় মণিকা এর্টলকে।
১ এপ্রিল ১৯৭১ : হত্যাকাণ্ড
১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল জার্মানির হামবুর্গ শহরে বলিভিয়ার কনস্যুলেট অফিসে প্রবেশ করেন মণিকা এর্টল। তিনি নিজেকে একজন সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন। সুযোগ বুঝে তিনি কর্নেল রোবের্তো কুইনতানিল্লাকে কাছ থেকে পরপর কয়েকটি গুলি করেন। ঘটনাস্থলেই কুইনতানিল্লা নিহত হন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর মণিকা নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে জানা যায়, তিনি এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে চে গেভারার হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি বিপ্লবী মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন—
“চে হত্যার প্রতিশোধগ্রহণকারী” হিসেবে।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
হামবুর্গ হত্যাকাণ্ডের পর মণিকা আবার বলিভিয়ায় ফিরে গিয়ে গোপনে গেরিলা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১২ মে বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার আগে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তার মৃতদেহ আর কখনো উদ্ধার করা যায়নি।
ইতিহাসে মণিকা এর্টলের অবস্থান
মণিকা এর্টল লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ইতিহাসে একটি বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কেউ তাকে সন্ত্রাসী বলে, কেউ বিপ্লবী। কিন্তু ইতিহাসে তিনি পরিচিত একজন আদর্শনিষ্ঠ গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে, যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন—যা তার কাছে ছিল ন্যায়বিচার বা প্রতিশোধ।
তার জীবন আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে:
পরিবার বা জন্মগত আদর্শ নয়, মানুষ নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস নিজেই তৈরি করতে পারে
লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ছিল
চে গেভারার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, এটি একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীকী ঘটনা
মণিকা এর্টল সেই ইতিহাসের প্রতিশোধ ও প্রতিবাদের প্রতীক
উপসংহার
কমরেড মণিকা এর্টল ছিলেন এমন এক নারী, যিনি নাৎসি পরিবারের সন্তান হয়েও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি অস্ত্র হাতে সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, আবার শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনও হারিয়েছেন।
লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ইতিহাসে তিনি এক রহস্যময়, সাহসী ও বিতর্কিত চরিত্র—
কিন্তু নিঃসন্দেহে তিনি ইতিহাসের অংশ।
চে গেভারার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘটনাই তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
মণিকা এর্টল—একজন নারী, এক বিপ্লবী, এক প্রতিশোধের ইতিহাস।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রক্তের দাগে লেখা,
এক নাম জ্বলে উঠে অগ্নিশিখা রেখা—
মণিকা, কমরেড, গেরিলা এক নারী,
ঝড়ের মতো এলেন, রেখে গেলেন ভারী।
বলিভিয়ার পাহাড়, জঙ্গলের গভীরে,
যেখানে বিদ্রোহ জন্ম নেয় ধীরে ধীরে,
সেখানে একদিন জেগে উঠল আগুন,
শোষণের বিরুদ্ধে উঠল প্রতিশোধের ধ্বনিগুণ।
চে গেভারার রক্ত শুকায়নি তখনও,
বন্দুকের নলের ধোঁয়া ভাসে গহনও,
লা হিগুয়েরার মাটি কাঁদে স্তব্ধ শোকে,
স্বাধীনতার স্বপ্ন ঝুলে মৃত্যুর ফাঁকে।
হায়, সে দিনটি—নিষ্ঠুরতার কাল,
মানবতার বুকে আঘাত করে জ্বাল,
বন্দী চে’কে হত্যা, কেটে নেয় হাত,
সাম্রাজ্যবাদের ছুরি করে রক্তাক্ত প্রভাত।
কুইনতানিল্লা—নামে যার পরিচয়,
ক্ষমতার উল্লাসে নির্মম এক ভয়,
নির্দেশ দিয়েছিল হত্যার নিষ্ঠুর খেলায়,
মানুষ হারিয়ে গেল রাষ্ট্রের ছদ্মবেশী ছায়ায়।
এই অন্যায়ের জবাব কি মুছে যায় কভু?
রক্ত কি চুপ থাকে ইতিহাসের রবু?
না, কোথাও জমে ওঠে প্রতিশোধের আগুন,
মানুষের অন্তরে জ্বলে ওঠে দহন।
সেই আগুন বুকে ধারণ করে একা,
মণিকা এগোলেন প্রতিজ্ঞা বুকে রাখা,
পিতার নাৎসী ছায়া পায়ে দলে ফেলে,
মানবতার পতাকা তুলে নিলেন হাতে মেলে।
হিটলারের অন্ধকার উত্তরাধিকার,
তিনি ভাঙলেন নিজ হাতে, করলেন অস্বীকার,
বেছে নিলেন পথ—সংগ্রামের, মুক্তির,
চে’র আদর্শে গড়া লড়াইয়ের নীতি-সূত্র।
কিউবার ঢেউ এসে লাগে হৃদয়তটে,
বিপ্লবের গান বাজে অন্তরের নোটে,
ELN-এর পতাকা তুলে নেন দৃঢ় হাতে,
নতুন ইতিহাস লেখেন রণক্ষেত্রের রাতে।
তার চোখে জ্বলত এক গভীর প্রতিজ্ঞা—
“রক্তের ঋণ শোধ হবে, থামবে না সংগ্রাম-যজ্ঞ,”
চে’র হত্যার জবাব চাই, সময় এসেছে আজ,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াক প্রতিটি সমাজ।
হামবুর্গ শহরে তখন এক নিঃশব্দ খেলা,
কূটনীতির আড়ালে লুকিয়ে ভয় মেলা,
রাষ্ট্রদূতের মুখে লেগে থাকে মিথ্যা হাসি,
অতীতের অপরাধ ঢাকে সভ্যতার খাঁচি।
কিন্তু ইতিহাস ভুলে না, চুপ করে না কাল,
নীরবতার ভেতরেও ওঠে বজ্রের জ্বাল,
মণিকা এলেন, ছদ্মবেশে অগ্নি হয়ে,
বুকের ভেতর প্রতিশোধের আগুন লয়ে।
তিনটি গুলি—তিনটি বজ্রধ্বনি,
নির্ভীক হাতে লেখা হলো নতুন বাণী,
কুইনতানিল্লার পতন সেই ক্ষণে,
চে’র রক্ত যেন কথা বলে প্রতিধ্বনিতে।
না ছিল ভয়, না ছিল পিছু হটার পথ,
ন্যায়ের দাবিতে তিনি অটল, অদম্য শক্ত,
সেই দিনটি ইতিহাসে অমোচনীয় চিহ্ন,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সাক্ষ্য সুস্পষ্ট।
কিন্তু সংগ্রামের পথ সহজ কবে হয়?
বিপ্লবীর জীবন সর্বদা বিপদের সয়,
ফিরে এলেন তিনি আবার স্বদেশের মাটিতে,
যেখানে মৃত্যু ওঁত পেতে থাকে প্রতিটি ঘাটিতে।
১৯৭৩—অন্ধকার এক দিন,
রাষ্ট্রের হাতে বন্দী, নীরব হয় সঙ্গীন,
নির্যাতনের ছায়া নামে নির্মম রূপে,
মানবতার মুখ ঢাকে বর্বরতার চাপে।
শেষ পর্যন্ত নিভে যায় সেই প্রদীপ,
কিন্তু আলো ছড়িয়ে থাকে অনন্ত দীপ,
লাশও হারায়, মাটিতে মিশে যায় দেহ,
তবু ইতিহাসে অমর থাকে তাঁর গৌরব গেহ।
মণিকা—তুমি কেবল নাম নও,
তুমি প্রতিরোধ, তুমি রক্তের দাবির দাও,
তুমি সেই প্রশ্ন, যা আজও জাগে—
ন্যায় কি হারায় শক্তির ফাঁদে?
তোমার জীবন এক বিদ্রোহের গান,
তোমার মৃত্যু এক অমোঘ আহ্বান,
শোষিতের পাশে দাঁড়ানোর ডাক,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার হাক।
লাতিন আমেরিকার পাহাড়-নদী ডাকে,
তোমার পদচিহ্ন এখনো তাদের বুকে,
চে’র সাথে তোমার নাম জড়ায় অমল,
সংগ্রামের পথে দুজনেই অনল।
লাল সালাম তোমায়, অগ্নিকন্যা,
ইতিহাসে তুমি অনন্য, চিরজ্যোতিষ্ময় ধন্যা,
রক্তের ঋণ শোধের সেই অঙ্গীকার,
মানবমুক্তির পথে আজও দীপ্যমান তার।
যতদিন অন্যায় থাকবে পৃথিবীর বুকে,
ততদিন তোমার গল্প শোনা যাবে সুখে-দুঃখে,
বিপ্লবীর রক্ত বৃথা যায় না কভু,
মানুষের হৃদয়ে জ্বলে চির অমর রবি।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি