পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক মহামতি কার্ল মার্কস

প্রকাশিত: ৩:২৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৪, ২০২৬

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক মহামতি কার্ল মার্কস

Manual5 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

“ইতিহাস নিজেই নিজের পুনরাবৃত্তি করে। প্রথমে মর্মান্তিক ঘটনার দ্বারা আর দ্বিতীয় একটা রসিকতার দ্বারা। আমাদের এটা কখনোই বলা উচিত নয় যে, একটা মানুষের এক ঘণ্টার মূল্য অন্য আরেকজন মানুষের এক ঘণ্টার মূল্যের সমতুল্য। বরং আমাদের এটা বলা উচিত যে, ওই এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে একটা মানুষ ঠিক ততটাই দামি যতটা অন্য বাকি মানুষরাও।”
-কার্ল মার্কস

মানুষের ইতিহাস বিকাশের নিয়ম আবিষ্কারক, শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের তাত্ত্বিক বিশ্লেষক, মানবজাতির সুমহান প্রতিভা, বিশ্বের ইতিহাসে প্রভাব বিস্তারকারী নেতৃত্ব, অসংখ্য গ্রন্থের লেখক, সাংবাদিক, কবি, বিজ্ঞানসম্মত পথের প্রবক্তা মহান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী মহামতি কমরেড কার্ল মার্কসের ২০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ (৫ মে)। দুনিয়া কাঁপানো মহান এই চিন্তাবিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন!।

১৮১৮ সালের ৫ মে জন্ম নেয়া দুনিয়া কাঁপানো মতবাদের বৈজ্ঞানিক প্রবক্তা এই মানুষটি ১৮৮৩ সালে মাত্র ৬৫ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছিলেন।

‘১৪ মার্চ বেলা পৌনে তিনটায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাঁকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। এঙ্গেলস লিখলেন, ‘আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তাঁর আরাম কেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য।’ এই মানুষটির মৃত্যু ইতিহাস বিজ্ঞানের অপূরণীয় ক্ষতি বলে এভাবেই এঙ্গেলস বর্ণনা করেছিলেন। কেন? তার উত্তরে এঙ্গেলস উক্ত বক্তৃতায় বলেছিলেন- ‘ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সহজ সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথমে চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ। সুতরাং প্রাণধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেইহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হলো সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যানধারণা, শিল্পকলা, এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উলটো দিক থেকে নয়।’

কার্ল মার্কসের মৃত্যুর ৩দিন পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালের ১৭ মার্চ লন্ডনের হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে তাঁর সমগ্র জীবনের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বক্তৃতায় উপরোক্ত কথাগুলো বলেছিলেন।

বিগত প্রায় ১৭৮ বছর ধরে সমগ্র পৃথিবীতে মানব চিন্তন প্রক্রিয়াকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছেন যিনি, তিনি হলেন কার্ল মার্কস। অধুনা জার্মানিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এই বছর সমগ্র দুনিয়ার শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামরত সমস্ত মানুষ কার্ল মার্কসের দুইশত আটতম জন্মদিবস পালন করছেন।

মার্কসের জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

১৮১৮ সালের ৫ মে প্রুশিয়ার ট্রিয়ের শহরে কার্ল মার্কস জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ইহুদি। তিনি ছিলেন আইনজীবী।

ট্রিয়ের শহরে শিক্ষালাভের পর মার্কস প্রথমে ‘বন’ পরে ‘বার্লিন’ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৮৪১ সালে মার্কসের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে ‘এপিকিউরাসের’ দর্শন সম্বন্ধে তিনি একটি ‘থিসিস’ রচনা করেন। এই সময়ে মার্কস হেগেলের মতবাদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন এবং ‘বামপন্থী হেগেলীয়’ গ্রুপের সদস্য ছিলেন।

Manual8 Ad Code

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে মার্কস ‘বন’-এ এলেন অধ্যাপক হওয়ার আশায়। কিন্তু সরকার যেমন আগে ফয়েরবাখ ও ব্রুনোকে অধ্যাপনার অনুমতি দেয়নি, তেমনই মার্কসকেও দিলো না। বস্তুবাদের প্রবক্তা ফয়েরবাখের “Principles of Philosophy of the Future” প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কসসহ ‘বামপন্থী হেগেলীয়রা’ ফয়েরবাখের মতবাদের সমর্থক হন। সেই সময় কোলনে যে পত্রিকাটি (Rheinische Zeitung) প্রকাশিত হতো, মার্কস তাতে লিখতে লাগলেন। ১৮৪২-এ মার্কস সে পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হলেন। মার্কসের সম্পাদনায় এই পত্রিকার বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ঝোঁক ক্রমশ পরিস্ফুট হতে থাকলে, সরকার এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তখন মার্কস সম্পাদকের দায়িত্ব ত্যাগ করেন।

১৮৪৩ সালে মার্কস জেনিকে বিবাহ করেন। ১৮৪৩ সালের শরৎকালে তিনি প্যারিসে যান একটি পত্রিকা প্রকাশের জন্য। একজন ‘‘বামপন্থী হেগেলীয়’’ আর্নল্ড রির্ডজের সাহায্যে এখান থেকে মার্কস যে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন, তার মাত্র একটি সংখ্যাই বেরোয়। কারণ সেগুলি জার্মানিতে গোপনে প্রচার করা অসম্ভব হয়ে ওঠে এবং রির্ডজের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য দেখা দেয়।

১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস প্যারিসে আসেন এবং তখন থেকেই মার্কসের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁরা দুজনে প্যারিসে তদানীন্তন বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সমাজতন্ত্রবাদের নামে যে সব ভুয়ো মতবাদ তখন প্রচলিত ছিল, তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হন। তাঁরা দুজনে তখনই সর্বহারার বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের তত্ত্ব ও কৌশল রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।

প্রুশিয়ার সরকারের চাপে ১৮৪৫ সালে মার্কসকে বিপজ্জনক বিপ্লবী এই অজুহাতে প্যারিস থেকে নির্বাসিত করা হয়। তিনি ব্রাসেলসে যান। ১৮৪৭ সালে মার্কস ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লিগ’ নামে একটি গোপন দলে যোগদান করেন। ১৮৪৭ সালেই ঐ সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস হয় লন্ডনে। সেই কংগ্রেসে মার্কস ও এঙ্গেলসের বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। এই কংগ্রেসের অনুরোধে তাঁরা ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ রচনা করেন, যা ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। তাঁদের এই সৃষ্টি এক নতুন চিন্তা, এক নতুন পথের নিশানা সকলের সামনে তুলে ধরে। অসীম প্রতিভাবান এই দুই পুরুষের কাছ থেকে মানুষ পেল : জগত সম্পর্কে এক নতুন ধারণা, বস্তুবাদ সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা, সমাজজীবনে বস্তুবাদের প্রয়োগ তত্ত্ব, বিকাশের বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব তত্ত্ব, শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্ব এবং সর্বহারার সাম্যবাদী সমাজের স্রষ্টারূপে ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক ভূমিকা।

১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিপ্লবের সূচনাতেই মার্কসকে বেলজিয়াম থেকে নির্বাসিত করা হলো। তিনি প্যারিসে এলেন, তারপর জার্মানির কোলনে গেলেন। সেখানে ‘নিউ জাইটুং’ পত্রিকা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো। মার্কসের নতুন তত্ত্বের সত্যতা নির্ধারিত হলো – ১৮৪৮-৪৯ সালে ইউরোপের বৈপ্লবিক ঘটনাবলীর দ্বারা। প্রতিবিপ্লবীরা শঙ্কিত হলো। তারা প্রথমে মার্কসকে আদালতে হাজির করাল। কিন্তু আদালত মুক্তি দিলে, ১৮৪৯-এর ১৬ই মে জার্মানি থেকে তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হলো। প্রথমে মার্কস প্যারিসে গেলেন, সেখানে থেকেও নির্বাসিত হলেন। তারপর গেলেন লন্ডনে। তখন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত লন্ডনেই তিনি ছিলেন।

মার্কসের রাজনৈতিক নির্বাসিত জীবন খুবই কষ্টকর ছিল। মার্কস এবং তাঁর পরিবারবর্গকে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতে হতো। এঙ্গেলস যদি এই সময়ে মার্কসকে নিয়মিত নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য না করতেন, তাহলে মার্কস শুধু ‘ক্যাপিটাল’ রচনা শেষ করতে পারতেন না, তাই নয়, তাঁকে অভাব-অনটনের মধ্যে ভেঙে পড়তে হতো। মার্কস এই সময়ে তাঁর বস্তুবাদী তত্ত্বের আরও বিকাশ সাধন করেন এবং অনেকগুলো অমূল্য রচনায় ও অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। যার ফলে তৈরি হয় : A Contribution to the Critique of Political Economy (১৮৫৯) এবং ক্যাপিটাল, ১ম খন্ড (১৮৬৭)।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ দশকে ইউরোপে গণতান্ত্রিক আন্দোলন মাথা তোলে। মার্কস আন্দোলনের কাজে নিজেকে নিয়োগ করেন। ১৮৬৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর লন্ডনে International Working men’s Association গঠিত হয়। এটিই হলো প্রথম আন্তর্জাতিক। মার্কসই ছিলেন এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের বহু ঘোষণা, প্রস্তাব, ম্যানিফেস্টো প্রভৃতি মার্কসেরই রচনা। এই সময়ে মার্কস যেমন বিভিন্ন দেশের শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামগুলোকে একই ধরনের কৌশলের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার প্রাণপণ চেষ্টা করেন, তেমনই ভুল ও অবৈজ্ঞানিক মতবাদগুলোর বিরুদ্ধেও নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালান। ‘প্যারি কমিউনে’র পতনের পর (১৮৭১) মার্কস তাঁর বিখ্যাত রচনা The Civil War in France প্রকাশ করেন। ১৮৭২ সালে হেগ কংগ্রেসের পর প্রথম আন্তর্জাতিক ‘জেনারেল কাউন্সিল’ নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত হয়। মার্কসের নেতৃত্বে এই প্রথম আন্তর্জাতিক এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্তর্জাতিক পৃথিবীর সকল দেশের শ্রমিক আন্দোলনে আরও অগ্রগতির পথ রচনা করে। এই আন্তর্জাতিক এমন একটি যুগের সূচনা করে, যে যুগে গণ-সমাজতন্ত্রবাদী দল প্রতিষ্ঠার পথে বিভিন্ন দেশের শ্রমিকশ্রেণি অনেকদূর এগিয়ে যায়। প্রথম আন্তর্জাতিকের এই অবদান অবিস্মরণীয়।

‘আন্তর্জাতিক’-এর জন্য কঠোর পরিশ্রম এবং তত্ত্বগত গবেষণার কাজে অধিকতর কঠোর পরিশ্রমের ফলে মার্কসের স্বাস্থ্য এই সময়ে ভেঙে পড়ে। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও ক্যাপিটালের পরবর্তী খন্ডগুলো সমাপ্ত করার জন্য তিনি এই সময় বিভিন্ন দেশের প্রভূত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো পড়বার জন্য অনেকগুলো ভাষা শিক্ষা করেন। কিন্তু তাঁর জীর্ণ স্বাস্থ্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্যাপিটাল সমাপ্ত করতে দেয় না।

১৮৮১ সালের ২রা ডিসেম্বর তাঁর স্ত্রী মারা যান। আর ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তাঁকে তাঁর প্রিয় আরাম-কেদারায় চিরনিদ্রায় শায়িত দেখা যায়।

প্রকৃত সমাজবিজ্ঞানী

মানব সমাজের বিকাশধারাকে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার কাজ প্রথম করলেন কার্ল মার্কস। ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের সঙ্গে একযোগে তিনি সমাজের বিকাশধারার চর্চাকে বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করলেন। সমাজ সম্পর্কিত রূঢ় নির্মম সত্যগুলোকে আড়াল থেকে প্রকাশ্যে আনলেন কার্ল মার্কস, সেইদিক দিয়ে তিনি ছিলেন প্রথম প্রকৃত অর্থে সমাজবিজ্ঞানী। কমরেড লেনিনের কথায়, ‘‘মানব সমাজের অগ্রণী ভাবনায় যেসব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল মার্কস তারই জবাব দিয়েছেন।’’

তিনটি উৎসকে ভিত্তি করে মতবাদ প্রতিষ্ঠা করলেন
অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে দর্শনের ক্ষেত্রে যে বিপুল অগ্রগতি ঘটেছিল মার্কস ও এঙ্গেলস তাকে আত্মস্থ করেছিলেন। জার্মান চিরায়ত দর্শন বিশেষ করে হেগেলীয় তত্ত্ব ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদ মতবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উৎসের ভূমিকা পালন করেছে। জার্মান দর্শন প্রধানত হেগেলের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের কথা এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন। দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব হলো বিকাশের গভীরতম, পূর্ণতম, একদেশদর্শিতা বর্জিত তত্ত্ব। তবে জার্মান দর্শনে এই দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব মাথা নিচে বা পা ওপরে করে দাঁড়িয়েছিল। দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসার ঐতিহাসিক ভূমিকা মার্কসই পালন করেছিলেন।

মার্কসের পূর্বে অর্থশাস্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল তৎকালীন সর্বাধিক অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশ ইংল্যান্ডে। অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকাডো মূল্যের শ্রম তত্ত্ব প্রকাশ করেন। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের সব থেকে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এই যে তারা পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। মানুষের মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয়টি তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল।

সামন্ততন্ত্রের পতনের পর মুক্ত দুনিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মেহনতী মানুষের ওপর পীড়ন ও শোষণের নতুন ব্যবস্থাই হলো পুঁজিবাদ। সমাজতান্ত্রিক মতবাদ নানাভাবে উপস্থিত হতে শুরু করে। শোষণহীন ও মুক্ত সমাজই হলো সমাজতন্ত্র। কিন্তু এই সমস্তই ছিল ইউটোপীয় সমাজবাদ। পুঁজিবাদী সমাজের সমালোচনা করেছে তার অবসান ঘটিয়ে এক উন্নততর সমাজ ব্যবস্থার কল্পনা করলেও কি উপায়ে তা প্রতিষ্ঠিত হবে সেই পথ দেখাতে পারেনি এই ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব।

মার্কসীয় মতবাদের তিনটি অঙ্গ

দর্শন, অর্থনীতি ও শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব- এই তিনটি অঙ্গ নিয়ে মার্কসবাদ।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে বস্তুবাদই একমাত্র সঙ্গতিপরায়ণ দর্শন হিসাবে দেখা দিয়েছে। বস্তুবাদ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্ত সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভন্ডামির তা চরম শত্রু। মার্কসীয় দর্শন শুধুমাত্র বস্তুবাদই নয়, দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের সাথে তাকে যুক্ত করেছেন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হলো মার্কসীয় দর্শন। আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কারের দ্বারা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সমর্থিত হয়েছে।

মার্কসীয় অর্থনীতির মধ্য দিয়ে কি করে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করে দেখানো হলো। পুঁজির কাছে শ্রমিকদের পরাধীনতা বাড়িয়ে তোলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। তার ফলেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্মিলিত শ্রমের শক্তি গড়ে ওঠে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদনের নৈরাজ্য, সঙ্কট, বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা এবং জনসাধারণের ব্যাপক অংশের মধ্যে জীবনধারণের অনিশ্চয়তা অবশ্যম্ভাবী। সামাজিক উৎপাদন ও ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী মালিকানা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দ্বন্দ্ব।

মার্কসীয় মতবাদকে শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব বলেও অনেক সময়ে অভিহিত করা হয়। সমস্ত নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ রয়েছে। শোষকশ্রেণির স্বার্থ এবং শোষিতশ্রেণির স্বার্থ। শোষিতশ্রেণির সংগ্রামই একমাত্র শোষকশ্রেণির প্রতিরোধকে চূর্ণ করতে পারে। পুরাতনের উচ্ছেদ ও নতুনের সৃষ্টি শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়েই সম্ভব। প্রলেতারিয়েতের জয়লাভ ঘটাবে শ্রেণিসংগ্রাম।

প্রভাব বিস্তারকারী দক্ষ ও বিপ্লবী নেতা

দুনিয়াটাকে পরিবর্তিত করার লক্ষ্য নিয়ে মার্কস তার মতবাদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হয়েছিলেন। তাই বিপ্লবী তত্ত্বের সাথে সাথে বিপ্লবী সংগ্রাম সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। কমিউনিস্ট লিগ, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এই সমস্ত সংগঠন গড়ে তোলা ও তা পরিচালনায় তিনি ছিলেন কর্ণধার। শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করা ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের লক্ষ্য।

বর্তমান সময়ে মার্কসবাদের প্রাসঙ্গিকতা

আমরা এই সময়ে কার্ল মার্কসের জন্মের দ্বিশতআটতম বর্ষ, ক্যাপিটাল প্রথম খন্ডের ১৭৭ বছর এবং নভেম্বর বিপ্লবের একশত নয়তম বর্ষ উদযাপন করছি।

এগুলোর ঐতিহাসিক প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাথায় রাখতে হবে সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পরিবর্তন ঘটে গেছে। কার্ল মার্কসের সময়কালে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদ ছিল শিল্পপুঁজি নির্ভর। ফরাসি বিপ্লবে সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদ যখন ক্ষমতায় আসে তখন শিল্পপুঁজি ছিল প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে লগ্নিপুঁজির একচেটিয়া যুগ প্রতিষ্ঠা পায়। পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের মৌলিক পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা করেছিলেন লেনিন। তিনি দেখিয়েছিলেন, সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জন্য কেন যুদ্ধ অনিবার্য। তিনি এটাও দেখিয়েছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের দুর্বলতম অংশে আঘাত করে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ রাশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করা সম্ভব। আর একবিংশ শতাব্দীতে এখন আমরা যে পুঁজিবাদকে দেখতে পাচ্ছি তাকে উগ্র উদারবাদী অর্থনীতি বলতে পারি যেখানে পুঁজি শুধু উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে নয়, সরাসরি লুটের মাধ্যমে মুনাফা করছে। পুঁজিপতি, শাসকদল ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে আঁতাত গড়ে এই লুটপাট চলছে যাকে আমরা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা সোজা কথায় ধান্দার পুঁজিবাদ বলছি। এটাই বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলা প্রবণতা।

আমরা যারা মার্কসবাদী তারা জানি অর্থনীতিই সমাজের মূল কাঠামো তৈরি করে এবং সেই কাঠামোর ওপরে নির্ভর করেই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি নানা উপরিকাঠামো গড়ে ওঠে। যদিও উপরিকাঠামোও কাঠামোর ওপরে প্রভাব ফেলে। একথা স্পষ্ট করে বলা যায় যে, দুনিয়াজোড়া এই লুটের অর্থনীতির কাঠামোর ওপরেই উপরিকাঠামোয় রাজনীতিতে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশে দেশে চরম দক্ষিণপন্থা ও স্বৈরতন্ত্রের উত্থান দেখা যাচ্ছে। এদের উত্থানকে অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই চরম দক্ষিণপন্থীরা মানুষের সমর্থন পেতে জনমোহিনী স্লোগান ব্যবহার করছে। পোস্ট ট্রুথ যুগে অসত্যের নির্মাণ করা হচ্ছে এই লক্ষ্যে। অসত্য নির্মাণ এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে বহু মানুষ কিছু পাওয়ার আশা করছেন, আবার স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতা করলে সেই সুযোগ হারানোরও ভয় করছেন। বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প

সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন সার্বভৌম দেশ ভেনিজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে প্রেসিডেন্ট কমরেড নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভুয়া মামলা দায়ের করে বিচারের নামে মার্কিন প্রশাসন প্রহসন করছে। একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে হামলা চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নেয়ার ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। কী ধরনের বৈশ্বিক অব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছি এটা তারই একটা ইঙ্গিত। আর এ প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যগুলো পাড়ার মস্তান-সন্ত্রাসীদের মতো! কোনো স্বাধীন দেশ ও নির্বাচিত সরকারের প্রতি তার সম্মান নেই! এমনকি নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতিও কোনো সম্মান নেই!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ নানা জটিলতায় রয়েছে। কয়েক কোটি মানুষের স্বাস্থ্য বীমা নেই, অনাহারি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং বহু লোককে ফুডকার্ড ব্যবহার করে খেতে হয়। সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে ১ শতাংশ মানুষের হাতে, বৈষম্য বাড়ছে। বিপুল সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সে দেশের জনগণের একটি বড় অংশের কাজ চিকিৎসা ও বাসস্থানের সমস্যা আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যক্রম এসব ভোগান্তিকে আরো জোরদার করছে! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কতিপয় পুঁজিপতি গোষ্ঠী যারা রাষ্ট্রের পুরো জনগণের এক ভাগ, যারা তেল কোম্পানি, ব্যাংকিং ও সামরিক খাতের সঙ্গে জড়িত তারা পুরো দেশের ৯০ ভাগ অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সুবিধার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়, কিন্তু বাকি ৯৯ শতাংশের জন্য কোনো দায়দায়িত্ব নেই। তেল ও সামরিক খাতের সঙ্গে যুক্ত এ ১ শতাংশের স্বার্থরক্ষার জন্যই ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ।

ভেনিজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত তৈরি হয় গত শতকের নব্বই দশকের শেষের দিকে। হুগো শাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিরোধটা শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত ভেনিজুয়েলায় বাংলাদেশের মতো পালাক্রমে দুটো দল ক্ষমতায় আসত, উভয়ই মার্কিন প্রশাসনের অনুগত ছিল। ফলে ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল। ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ বিক্রি করে দেশের মানুষের কাজে আসেনি, বরং সে দেশে একটা ধনিক শ্রেণী ফুলেফেঁপে ওঠে। এ ধনিক শ্রেণীই হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রধান অবলম্বন।

বহুজাতিক তেল কোম্পানি ও ভেনিজুয়েলার ধনিক শ্রেণী উভয়ই বেকায়দায় পড়ে যখন হুগো শাভেজ তেল সম্পদের ওপর জাতীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন। তখন নানা গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয় শাভেজের বিরুদ্ধে জমায়েত করার জন্য। ২০০২ সালে তারা চেষ্টা করে শাভেজকে উৎখাত করার। তখন সামরিক ক্যু করে একটা পুতুল সরকার বসানোর চেষ্টা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গেই তাদের স্বীকৃতি দেয়, যদিও তা টেকসই হয়নি। কারণ হুগো শাভেজকে আটক করার পর কারাকাস থেকে শুরু করে সারা দেশেই ব্যাপক গণপ্রতিরোধ তৈরি হয়। ফলে দালাল গোষ্ঠী পালিয়ে যায়, মার্কিন প্রকল্প ব্যর্থ হয়। হুগো শাভেজ মুক্ত হন এবং আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন।

পরবর্তী সময়ে হুগো শাভেজ বলিভিয়া ও কিউবাকে নিয়ে লাতিন আমেরিকার একটা বিকল্প শক্তিশালী জোট করার চেষ্টা করেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ থেকে মুক্ত হওয়ার একটা পথ তৈরি করে বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তেল সম্পদের অর্থ শিক্ষা-চিকিৎসাসহ সর্বজনের স্বার্থে ব্যয়সহ শাভেজ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন প্রচেষ্টার ফলে ভেনিজুয়েলায় দারিদ্র্য-বেকারত্ব-অসুস্থতা কমে যায়, সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে, দেশটির গরিব মানুষেরা একটা সম্মানজনক জীবনের দিশা পায়।

কিন্তু হুগো শাভেজ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করায় এ যাত্রায় বড় এক ছন্দপতন হয়। তারপর সেই বলিভারিয়ান বিপ্লবের ধারাকে অব্যাহত রাখেন নিকোলাস মাদুরো। বিভিন্ন সময় মার্কিন মদদ নিয়ে ধনিক শ্রেণী মাদুরোকে উৎখাত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়! আশপাশের দেশের মাধ্যমে সামরিক হুমকিও বৃদ্ধি করে, তবু ব্যর্থ হয়। অন্য সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন দেশে আগ্রাসন চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রে হামলা, গণহত্যা ও দেশের প্রধানকে গুপ্তহত্যার নজির যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একেবারে নতুন নয়।

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রই পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতা, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের জন্য হামলা গণহত্যা দখলদারত্ব এগুলোর ওপরই তারা ভর করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইরাককে ছিন্নভিন্ন করা হয়। বারাক ওবামার শাসনামলে লিবিয়াকে ছিন্নভিন্ন করা হয়। তারও আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা ছিলেন, তারাও এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার নানা দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে। ভিয়েতনামে ১০ লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াতেও তাই। এছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) প্রকাশ্য মদদে বহু খুনি, মাদক ব্যবসায়ী ও স্বৈরশাসকদের বিভিন্ন দেশের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চিলির কথা বলা যায়। চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কমরেড সালভাদর আলেন্দেকে মার্কিন মদদে সামরিক বাহিনী ক্যু করে উৎখাত করে। আলেন্দে যুদ্ধ করতে করতে নিহত হন। এরপর জেনারেল অগাস্টো পিনোশে নামের এক কুখ্যাত স্বৈরশাসক ১০ বছর ক্ষমতা দখল করে রাখে। খুন, গুম, নির্যাতনের ভয়ংকর কাল সৃষ্টি হয়।

গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকরা যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল হিসেবে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক-বেসামরিক ও আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র বহু বছর ধরে চলছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত হচ্ছে।

নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রহীনতা বলে যেসব প্রচার চালানো হচ্ছে এগুলো পুরোটাই প্রহসন। বরং এযাবৎকালে পৃথিবীর সব কুখ্যাত স্বৈরাচার যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়েই সেসব দেশের জনগণের সম্পদ লুট এবং দমন-পীড়ন স্বৈরশাসনের ভয়াবহ পর্ব তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী বলয়ের বাইরে গিয়ে যারাই স্বাধীনভাবে নিজস্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি তৈরি করার প্রচেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই তখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নানা অজুহাত দেখিয়ে আক্রমণ করেছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারের আমলে দেখা গেছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় এটা চরম আকার ধারণ করেছে এবং বর্তমানে কোনো রাখঢাক ছাড়াই এটা করা হচ্ছে।

নিকোলাস মাদুরোকে মাদক পাচারের অভিযোগে আটক করা হলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা ভিত্তি নেই। অথচ সম্প্রতি হন্ডুরাসের মাদকসম্রাট খ্যাত ও দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে মার্কিন কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, যাতে সেখানকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি বামপন্থীদের মোকাবেলা করা যায়। একুয়েডরেও মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনিজুয়েলার মাচাদোর মতো যে বিষাক্ত পুতুলগুলো তারা তৈরি করছে, সবই করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। তথাকথিত শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও বলেছেন যে ভেনিজুয়েলায় যে সুযোগ-সুবিধা আছে তা থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রচুর আয় করতে পারবে। তিনি ক্ষমতায় এলে সব সুযোগ-সুবিধা মার্কিন কোম্পানির হাতে তুলে দেবেন! মারিয়া কোরিনা মাচাদো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত এমন এক ব্যক্তি যিনি তার নিজের দেশে মার্কিন বাহিনীকে আক্রমণ করতে বলছেন ও আক্রমণ করার কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন!

Manual8 Ad Code

মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে এসব চালানো কখনই সম্ভব হতো না যদি বিশ্বে আইনের শাসন ও ন্যায়-নীতি বহাল থাকত। সারা বিশ্বে মাদক ব্যবসায়ীদের বিশ্বজোট ও আগ্রাসন এবং গণহত্যার বিচার করতে হলে সবার আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদেরই বিচার করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার হওয়া দরকার যুদ্ধাপরাধ, সহিংসতা বৃদ্ধি, অপহরণ ও বিভিন্ন দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন উল্টো বিচার করছে মাদুরোর এবং এর ভেতর দিয়ে পুরো বিশ্বে একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো জাতিসংঘ একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যেখানে তাদের উচিত ছিল তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার, কিন্তু তারা ব্যর্থ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটা মেরুদণ্ডহীন সংঘ, যুক্তরাষ্ট্রের তল্পিবাহকে পরিণত হয়েছে। আশার বিষয় হলো সারা বিশ্বে এর প্রতিবাদে অসংখ্য মানুষ নেমে এসেছেন রাস্তায়। এটাই বর্তমান বিশ্বের ভরসার মূল জায়গা। এটা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এখানেও সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের নীলনকশা ও ফাঁদ পাতা আছে। এ লড়াইটা বৈশ্বিক। ফলে বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি তথা শ্রমিক শ্রেণির মতাদর্শের রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃত্বে সবাইকে চোখ-কান খোলা রেখে এ লড়াইয়ে শামিল হতে হবে।

বামপন্থীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রিটিশ সংসদীয় নির্বাচনে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি বাম মঞ্চ গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্সের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাইপ্রাসে বামপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাম মোর্চার প্রার্থীর সমর্থনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রিসে সাইরিজা, স্পেনে পোডেমসের মতো শক্তিগুলোর সমর্থন বৃদ্ধি বামপন্থার প্রতি সমর্থন বৃদ্ধিকেই ইঙ্গিত করছে। লাতিন আমেরিকার নিকারাগুয়া থেকে ভেনেজুয়েলা সহ অন্য দেশে বামপন্থীরা জয়ী হয়েছেন। যদিও সেখানে বামপন্থীরা আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই।
তারপরও মার্কসীয় মতাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কেননা বিপ্লব জরুরি এবং সেটা হতে হবে মার্কসীয়-লেনিনীয় মৌলিকতার উপর ভিত্তি করে আর দেশীয় ইতিহাস, সমাজ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে। পৃথিবীতে আজ সবগুলো সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে এই সূত্রায়ন প্রযোজ্য। মার্কসের দুইশত আটতম জন্মবার্ষিকীতে সেই কাজটিকেই এগিয়ে নেওয়াই হবে প্রত্যেক মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর কর্তব্য।

“মহামতি মার্কস”

পৃথিবীর কালো ভোরে যখন শোষণের ধোঁয়া,
মানুষ মানুষখেকো ছিল, লোভ ছিল সর্বময় ছোঁয়া,
ক্ষুধার কাঁটা বুকে নিয়ে কাঁদত নগর গ্রাম,
তখন এলেন এক মহামতি—কার্ল মার্কস নাম।

ট্রিয়ের শহর জন্মভূমি, রাইনের তীরে ঘর,
শিশু চোখে দেখলেন তিনি সমাজ কত পর,
আইন, ইতিহাস, দর্শনের পাঠে দীপ্ত মন,
জিজ্ঞাসাতে জ্বলে উঠল যুক্তির প্রদীপণ।

বইয়ের পাতা জেগে উঠল প্রশ্নের আগুনে,
মানুষ কেন বাঁধা থাকে অন্যের জুলুমে?
শ্রমিক কেন রক্ত ঢালে কারখানার দ্বার,
মালিক কেন মুঠোয় ধরে সোনার পাহাড়ভার?

কেড়ে নেয় যে মানুষেরই মানুষের অধিকার,
সেই ব্যবস্থার ভিতর কত গোপন অন্ধকার!
যে সভ্যতা উঁচু মিনার তোলে আকাশ ছুঁই,
ভিতরে তার হাহাকার আর মৃতস্বপ্ন রুই।

হেগেলের দ্বন্দ্ব শিখে বুঝলেন গতি-রীতি,
ফয়েরবাখে পেলেন পরে বস্তুবাদের স্মৃতি,
তবু শুধু চিন্তা নয়, চাই বাস্তবের মান,
চাই যে ইতিহাস বুঝিবার বিজ্ঞানসম জ্ঞান।

তাই তিনি বললেন দৃপ্ত—মানুষ আগে খায়,
খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় ছাড়া বাঁচার পথ কি পায়?
তারপর তবে শিল্প-সাহিত্য, নীতি, ধর্মভাব,
অর্থনৈতিক ভিতের উপর উঠে সমাজভাব।

এই যে কথা সহজ অথচ যুগে যুগে গোপন,
এই সত্যে কেঁপে উঠল শোষকশ্রেণির সোপান,
রাজনীতির মুখোশ খসে দেখালেন তিনি,
স্বার্থের তলে বাঁধা থাকে কত আইনধ্বনি।

রাইনিশে সেই সংবাদপত্র লিখল জাগ্রত বাণী,
ক্ষমতাধর ভয় পেয়ে গেল, কাঁপল তাদের টানি,
সম্পাদক সে মার্কস যখন সত্যের পথে দৃঢ়,
বন্ধ করে দিলো তারা কণ্ঠের সবক’টি সুর।

নির্বাসনের পথ ধরিলেন প্যারিস নগরপানে,
সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা এঙ্গেলস মহান প্রাণে,
দুইটি নদী মিলল এসে এক সমুদ্রস্রোত,
মানবমুক্তির মানচিত্রে জ্বলে উঠল জ্যোত্।

বন্ধুত্বের এমন দৃষ্টান্ত বিরল পৃথিবীতে,
দুঃখে সুখে পাশাপাশি পথের দগ্ধ নীতিতে,
একজনের হাতে রুটি, অন্যজনের কলম,
দুইজন মিলে লিখলেন পরে যুগান্তকারী বচন।

ব্রাসেলসের রাতের ঘরে, লন্ডনের কুয়াশায়,
গোপন সভার আলোর নীচে শপথ উঠল ভাষায়,
“দুনিয়ার মজদুর এক হও”—দিগন্তবিদারী ডাক,
কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো বজ্রের মতো ফাঁক।

শ্রেণির সাথে শ্রেণির দ্বন্দ্ব ইতিহাসের সুর,
শোষকশ্রেণি যত উঁচু হোক, ক্ষয় তার ভরপুর,
যে হাতে চাকা ঘোরে দিনে, রাত জেগে কয়লা টানে,
ভবিষ্যতের সূর্য ওঠে সেই হাতেরই টানে।

আঠারো শত, ঊনিশ শত, বিপ্লবেরই ঢেউ,
ইউরোপ জুড়ে রাজপথ কাঁপে, জনতার ভয় কই আর কেউ?
কোলন নগর ডাকল তাঁকে, সংবাদপত্র হাতে,
মার্কস লিখলেন অগ্নিবাণী সংগ্রামী প্রভাতে।

আবার এল নির্বাসন, আবার দেশান্তর,
শাসক চায় না সত্যবাক্য থাকুক কভু ঘর,
শেষে গিয়ে থামলেন তিনি লন্ডনেরই ধূসর,
দারিদ্র্যের শীতল ঘরে জ্বলল চিন্তা-অম্বর।

ক্ষুধার কষ্ট, শিশুরমৃত্যু, রোগের কালো দিন,
তবু তিনি মাথা নোয়ান নি, হন নি দাসাধীন,
বইয়ের ভাঁজে খুঁজে ফিরেন পুঁজির গোপন রূপ,
কেমন করে শ্রমের ঘামে সোনার নদী কূপ।

উদ্বৃত্ত মূল্য—শব্দটি শুধু অর্থনীতি নয়,
এতে লুকায় লক্ষ শ্রমিকের কান্না, রক্ত, ক্ষয়,
যে মজুরি দেয়, তার চেয়ে কত নেয় লুকায়ে,
মালিকতন্ত্র হাসে বসে হিসেবখাতার ছায়ে।

ক্যাপিটাল সেই মহাগ্রন্থ শুধু কাগজ নয়,
কারখানার ধোঁয়া-ঢাকা শতাব্দীর পরিচয়,
যেখানে লেখা—পুঁজি বাড়ে মৃতশ্রমের পিঠে,
জীবন্ত শ্রম শৃঙ্খল বেঁধে হাঁটে তারই নীড়ে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সভা লন্ডনে গড়িল,
বিভিন্ন দেশের লড়াইগুলো এক পতাকায় মিলিল,
মার্কস ছিলেন প্রাণপুরুষ, লিখতেন আহ্বানপত্র,
একতারই মন্ত্র দিলেন বিশ্বশ্রমিকতন্ত্র।

প্যারিস কমিউনের লাল ধ্বনি উঠল আকাশ চিরে,
শ্রমিক শ্রেণির প্রথম রাষ্ট্র গড়ল জাগ্রত অগ্নি-নীরে,
যদিও ক্ষণিক, তবু তাতে ভবিষ্যতের ছাপ,
জনতারই হাতে শাসন—এই ছিল তার মাপ।

মার্কস দেখালেন রাষ্ট্রও তবে নিরপেক্ষ নয় কভু,
শ্রেণিশক্তির যন্ত্র সে যে, ক্ষমতারই প্রভু,
যে শ্রেণি ধরে উৎপাদন, সে চায় মুক্তি জয়,
শোষণমুক্ত সমাজ ছাড়া শান্তির পথ না হয়।

তিনি শুধু গ্রন্থকার নন, ছিলেন রণনেতা,
তত্ত্ব যদি পথ না দেখায় তবে সে কিসের কথা?
তিনি বললেন—জগতকে শুধু ব্যাখ্যা করো না,
পরিবর্তনের সংগ্রামে নামো নির্ভীক সনা।

আজও দেখি কর্পোরেটের ইস্পাত-দেয়াল ঘিরে,
বাজার নামে লুটের মেলা চলে শহর-নীরে,
অল্প হাতে সম্পদ জমে, বহু হাতে শূন্য,
ডিজিটাল যুগেও শ্রমিক কেন থাকে বঞ্চিত?

অ্যালগরিদমের কারখানাতে অদৃশ্য শ্রমদাস,
স্ক্রিনের পিছে ক্লান্ত মানুষ গোনে বেঁচে থাকার শ্বাস,
ডেলিভারি রাইডার ছুটে ঝড়-বৃষ্টির মাঝে,
মুনাফাখোর অ্যাপ বসে রয় হিসেব কষার সাজে।

Manual2 Ad Code

কৃষক এখন ঋণের বোঝায় মাঠে নুয়ে পড়ে,
মজুর এখন ঠিকাদারের প্রতারণার ঘরে,
নারীশ্রমিক দ্বিগুণ খাটে ঘরেও বাইরে সার,
মার্কস যেন আজও বলেন—ভাঙো অন্যায় দ্বার।

জাতি, বর্ণ, শ্রেণির নামে বিভেদের বিষ ঢালে,
শাসক চায় মানুষ মানুষে লাগুক আগুন জ্বালে,
মার্কস শেখান মূলের কাছে ফিরো চিন্তার রথে,
কে খায় ফল আর কে পড়ে রয় শেকলে দিনরাতে।

যেখানে ক্ষুধা, সেখানেই তাঁর কথার পুনর্জন্ম,
যেখানে বেকার যুবক কাঁদে, সেখানেই তাঁর ধর্ম,
যেখানে নারী মজুরি পায় অর্ধেক শ্রমের দাম,
সেখানেই মার্কস জেগে ওঠেন উচ্চারিতে নাম।

তিনি বলেন—সংগঠিত হও, ভয়কে দাও বিদায়,
যে হাতে গড়ে সভ্যতার ঘর, সে হাত পিছায় কায়?
মাটি যারা চাষে, যারা গড়ে সেতু, জাহাজ, রেল,
তাদের ছাড়া থেমে যাবে এই বিশ্বচক্র খেল।

পৃথিবীর সব প্রান্ত হতে উঠুক নতুন গান,
মানুষ যেন মানুষেরই হয় আপন প্রাণ,
শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়ের শপথে,
সমতারই সূর্য উঠুক প্রতিটি জনপথে।

মার্কস মানে প্রশ্ন জাগা, যুক্তির দীপ্ত শিখা,
মার্কস মানে অন্ধকারে পথের প্রদীপ লেখা,
মার্কস মানে অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াবার ডাক,
মার্কস মানে মেহনতির হাতে ভবিষ্যতের শ্লোগান।

চৌদ্দ মার্চের নিস্তব্ধ বেলা থেমে গেল শ্বাস,
এঙ্গেলস দেখলেন আরামকেদারায় নিদ্রার আভাস,
ঘুমিয়ে আছেন শান্তভাবে, জেগে রইল বাণী,
মৃত্যুর পরে আরো বেশি জাগল তাঁরই টানি।

কবরখানার মাটি ডিঙিয়ে চিন্তা গেল দূর,
রাশিয়া, চীন, কিউবা পেরিয়ে আফ্রিকারও সুর,
লাতিন ভূমি, এশিয়া জুড়ে বিদ্রোহেরই ঢেউ,
শত ভুলেও শিখন রইল—মানুষ হারায় নে কেউ।

Manual7 Ad Code

ইতিহাসের পাঠশালাতে নামটি অম্লান আজ,
শোষিতজনের মিছিল জুড়ে তাঁরই রক্তসাজ,
যতদিন ক্ষুধা, যতদিন লুট, যতদিন অবমান,
ততদিন কার্ল মার্কস হবেন সংগ্রামেরই গান।

এসো তবে জন্মদিনে নত করি মনশির,
বন্দনা নয়, শপথ নেব জাগাব ন্যায়ের নীর,
মানুষ যেন মানুষ থাকে, পণ্য না হয় আর,
এই প্রত্যয়ে আগামীর পথে চলুক অগ্নিধার।

কারখানা থেকে খেতের ধারে, বন্দরে, কলকারখানায়,
স্কুলে, পথে, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিকেরই গানে গায়,
মার্কস তুমি ইতিহাস নও শুধু অতীত স্মারক,
তুমি এখনো জেগে থাকা মানবমুক্তির তারক।

তাই বলি আজ উচ্চকণ্ঠে, পৃথিবী শোন হে সব,
শ্রমের চেয়ে বড়ো নয় আর কোনো সোনার রব,
মানুষেরই জয় হোক শেষে, হোক না ন্যায়ের রথ,
মহামতি কার্ল মার্কস তুমি চলমান শপথ।
—(মহামতি মার্কস,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

সর্বশেষ কার্ল মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ একটি উক্তির কথা উল্লেখ করে শেষ করছি, “দার্শনিকরা জগতটাকে শুধু বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করে গেলেন, মূল কাজ হচ্ছে বদলে ফেলা। ” – কার্ল মার্কস
#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯