শেখ সাদীর যুগ থেকে আমরা বের হতে পারিনাই এখনো

প্রকাশিত: ৩:০৬ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০২৬

শেখ সাদীর যুগ থেকে আমরা বের হতে পারিনাই এখনো

Manual6 Ad Code

তাসলিমা রুমকি রুমঝুম | খুলনা, ১৮ মে ২০২৬ : মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে, প্রযুক্তি বদলেছে, জীবনের গতি বেড়েছে—কিন্তু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্ন আজও থেকে গেছে। শত শত বছর আগে শেখ সাদী মানুষকে মানবিকতা, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের শিক্ষা দিয়েছিলেন। অথচ আজও সমাজের বড় একটি অংশ মানুষকে মূল্যায়ন করে তার পোশাক, অর্থ, বাড়ি কিংবা গাড়ি দিয়ে। একজন মানুষ কেমন, তার মন কতটা উদার, তার সংগ্রাম কত গভীর—এসবের চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্য যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমাদের সমাজে এখনো সম্পর্কের আগে হিসাব মেলানো হয়। কে কতটা প্রতিষ্ঠিত, কার সামাজিক অবস্থান কী, কার সঙ্গে মিশলে নিজের মর্যাদা বাড়বে—এসব চিন্তা মানুষের আচরণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। অথচ প্রকৃত সম্পর্ক কখনোই অর্থ কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে তৈরি হয় না। প্রকৃত সম্পর্ক তৈরি হয় শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ও খোঁজ নেওয়ার মানসিকতা থেকে।

আজকের সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখা। আমরা অনেকেই ধরে নিই, যার কাছে অর্থ আছে সে-ই সম্মানের যোগ্য। যার সামাজিক অবস্থান উঁচু, তার কথাই বেশি মূল্যবান। এই মানসিকতা শুধু বৈষম্য তৈরি করে না, এটি নীরবে অসংখ্য মানুষকে অপমানও করে। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও পরিস্থিতি আলাদা। সবাই একইভাবে জীবন সামাল দিতে পারে না। তাই কাউকে না বুঝে, তার বাস্তবতা না জেনে, শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে বিচার করা অনুচিত।

বর্তমান সমাজে আরেকটি প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়—‘সবজান্তা’ মনোভাব। অনেকেই অন্যের জীবনের বিষয়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। কারও ব্যস্ততা, নীরবতা কিংবা সীমাবদ্ধতার পেছনের কারণ না জেনেই নানা মন্তব্য করেন। অথচ মানুষের মনের ভেতরের লড়াই সবসময় চোখে দেখা যায় না। একজন মানুষ হয়তো প্রতিদিন কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করছে, কিন্তু বাইরে থেকে তা বোঝা সম্ভব নয়। তাই অনুমানের উপর ভিত্তি করে কাউকে বিচার করা মানে তার আত্মমর্যাদাকে আঘাত করা।

সমাজে মর্যাদাবোধ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। একজন মানুষকে অপমান করা খুব সহজ, কিন্তু তার সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন। আমাদের মনে রাখা উচিত—প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব এক পৃথিবী আছে, যেখানে সে নিজেই রাজা। তাই কারও অবস্থানকে ছোট করে দেখা কিংবা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর প্রবণতা মানবিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

Manual4 Ad Code

তবে এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আশার জায়গা আছে। এখনো কিছু মানুষ আছেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে খোঁজ নেন, ব্যস্ততার মাঝেও বার্তা পাঠান, কিংবা জানেন কেউ হয়তো কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারবে না, তবুও তাকে মনে রাখেন। এই মানুষগুলোই প্রকৃত সম্পদ। কারণ তারা সম্পর্ককে সামাজিক প্রদর্শনী নয়, হৃদয়ের জায়গা থেকে মূল্য দেন।

Manual8 Ad Code

আজকের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতামূলক সমাজে মানুষ ধীরে ধীরে একাকী হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধুত্ব থাকলেও প্রকৃত আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে। এমন সময়ে একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের দাঁড়ানো, খোঁজ নেওয়া কিংবা শুধু কিছু সময় দিয়ে হাসি ভাগ করে নেওয়াও অনেক বড় ওষুধের মতো কাজ করে। মানসিক ক্লান্তি, সামাজিক চাপ ও জীবনের সংগ্রামের মাঝে এই মানবিক সম্পর্কগুলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

আমাদের সমাজকে সত্যিকারের আধুনিক হতে হলে শুধু প্রযুক্তিতে নয়, চিন্তায়ও আধুনিক হতে হবে। মানুষকে তার পোশাক, অর্থ বা বাহ্যিক অবস্থান দিয়ে নয়; তার মানবিকতা, সততা ও আচরণ দিয়ে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। অন্যের জীবনের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সম্মান দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

শেখ সাদীর যুগ থেকে বের হতে না পারার যে আক্ষেপ আমরা করি, তার পরিবর্তন শুরু হতে পারে আমাদের নিজেদের থেকেই। যদি আমরা মানুষকে ছোট না করি, অনুমান দিয়ে বিচার না করি এবং নিঃস্বার্থ সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি—তবে হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থে মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে।

Manual7 Ad Code

মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। আর এই পরিচয়ই হওয়া উচিত আমাদের মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।

Manual1 Ad Code

ছবিঃ ২০২১ সালের ১৭ মে প্রিয় বান্ধবীর সাথে কিছু সময় কাটানোর, হাহা হিহি করলাম, ওষুধের মতো কাজ করেছে। সকাল থেকে হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি কিন্তু আমি আজ ক্লান্ত নই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ