এসডিজি অর্জনে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি: প্রজ্ঞা’র ওয়েবিনারে বক্তারা

প্রকাশিত: ২:১৫ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬

এসডিজি অর্জনে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি: প্রজ্ঞা’র ওয়েবিনারে বক্তারা

Manual1 Ad Code
আইন সংশোধন ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৩ মে ২০২৬ : নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেছেন, বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বর্তমান হার উদ্বেগজনকভাবে কম। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদ্যমান আইন শক্তিশালী করা, বাস্তবায়ন কাঠামো কার্যকর করা এবং নিবন্ধনের দায় ব্যক্তির পরিবর্তে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করা প্রয়োজন।

শনিবার (২৩ মে ২০২৬) সকাল ১১টায় গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শক্তিশালী নিবন্ধন ব্যবস্থা: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত” শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

ওয়েবিনারে গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

বক্তারা বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৯ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য বৈধ পরিচয় নিশ্চিত করা অন্যতম অগ্রাধিকার। জন্ম নিবন্ধন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা গ্রহণেও জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, যা এসডিজি ১.৩ অর্জনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

Manual8 Ad Code

ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

বক্তারা বলেন, দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হলেও নিবন্ধনের দায়িত্ব এখনও পরিবারের ওপর বর্তায়। ফলে অনেক পরিবার সময়মতো নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারে না এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৃত্যু নিবন্ধন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাতৃমৃত্যু পর্যবেক্ষণ, শিশুমৃত্যুর হার নিরূপণ, অসংক্রামক রোগের প্রকৃতি ও বিস্তার শনাক্তকরণ এবং রোগ নজরদারিতে মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ও সঠিক মৃত্যু নিবন্ধন না থাকলে স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা, বাজেট বণ্টন এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস-এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “এসডিজি অর্জনে সহায়তা করতে নিবন্ধন আইন শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”

জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, “বর্তমানে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব মূলত ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম ও মৃত্যু সংঘটিত হওয়ার পরও সেখানে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেই। আইন সংশোধন করে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে আইনি দায়িত্বের আওতায় আনা হলে সর্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সঠিক জন্ম ও মৃত্যু তথ্য একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন এবং জনসংখ্যাভিত্তিক সেবা ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতা উন্নয়ন অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।”

ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে আরপি নিউজের সম্পাদক, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রধারীদের মধ্যে যাদের এখনও জন্ম নিবন্ধন হয়নি, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহজ ও দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “অনেক নাগরিক এনআইডি কার্ড পেলেও জন্ম নিবন্ধন করেননি। এটি ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবায় জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।”

Manual2 Ad Code

প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শঙ্কর সাহা বলেন, “দেশের অর্ধেক মানুষ এখনও নিবন্ধনের বাইরে থাকা এসডিজি অর্জনের পথে বড় অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। নিবন্ধন আইনের দুর্বলতা, বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের ভোগান্তির বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে সামনে আনতে হবে।”

বক্তারা আরও বলেন, জন্ম সনদ শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপকে সহজ করে। স্কুলে ভর্তি, বয়স যাচাই, সরকারি সহায়তা গ্রহণ, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সেবা গ্রহণে জন্ম নিবন্ধন অপরিহার্য। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে। ফলে শিক্ষা ও জেন্ডার সমতা বিষয়ক এসডিজি-৪ ও এসডিজি-৫ অর্জনেও জন্ম নিবন্ধনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

ওয়েবিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে নিবন্ধন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেইস উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাত, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

Manual1 Ad Code

প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা ও মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন সংগঠনের কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান।

Manual7 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ