দেশজুড়ে সহিংসতা, শিশু ধর্ষণ-হত্যা ও অনিরাপত্তা নিয়ে বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২৬

দেশজুড়ে সহিংসতা, শিশু ধর্ষণ-হত্যা ও অনিরাপত্তা নিয়ে বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ

Manual1 Ad Code
নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ মে ২০২৬ : দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।

বৃহস্পতিবার (২১ মে ২০২৬) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষ ক্রমাগত ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। সহিংসতা, মব সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন ও আইনের অপপ্রয়োগ উদ্বেগজনকভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত মাত্র সাত দিনে চারজন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

বিশিষ্টজনরা বলেন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি দেশে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। হামের টিকার ঘাটতি এবং সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের কারণে শিশুমৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ছে। এ অবস্থাকে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে তারা বলেন, প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিবৃতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। সাতক্ষীরায় এক স্কুলশিক্ষক তথাকথিত “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”-এর অভিযোগে হয়রানি ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করে তারা বলেন, ধর্মের নামে ভিন্নমত দমন, ভয়ভীতি সৃষ্টি বা নিপীড়ন কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

তারা বলেন, “নীরবতা কখনো দায় মুছে দিতে পারে না, অস্বীকার কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। নিরাপত্তা, মর্যাদা, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বাংলাদেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।”

সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। বিশিষ্টজনরা জানতে চান—
ক্রমবর্ধমান নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর দায় কে নেবে? স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া কোথায়? দায়বদ্ধতা কি আবারও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির আড়ালে হারিয়ে যাবে?

তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যর্থতা, দমন-পীড়ন, শিশুমৃত্যু এবং জননিরাপত্তার অবনতির দায় সরকার এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে।

Manual4 Ad Code

দাবি সমূহ :

Manual7 Ad Code

বিবৃতিতে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

Manual5 Ad Code

নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা;
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা;
নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
মব সন্ত্রাস, হয়রানি ও আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা;
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া;
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ এবং টিকাসংকট নিরসন করা।

বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও রাশেদা কে চৌধুরী; সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংস্কৃতিজন রামেন্দু মজুমদার; মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ছায়ানটের সভাপতি ডা. আলী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন; নিজেরা করির নির্বাহী পরিচালক খুশী কবির; শিক্ষক নেতা ড. নূর মোহাম্মদ তালুকদার; বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজল দেবনাথ; অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ আল-মামুন চৌধুরী; গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী; সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহিদুল বারী; সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

Manual2 Ad Code

এ ছাড়া গবেষক, লেখক, সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান, সাংস্কৃতিক সংগঠক এ কে আজাদ, সুরকার সেলিম রেজা, খেলাঘরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জহির, মানবাধিকারকর্মী পারভেজ হাসেম, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতা মো. নুরুল আমিন, শিক্ষক নেতা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সবুজ, শিক্ষক সংগঠক রণজিৎ কুমার সাহা, কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবির এবং শ্রমিকনেতা আজিজুর রহমান আজিজও বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

নাগরিক সমাজের উদ্বেগ বাড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও সহিংসতার বিস্তার, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে নাগরিক সমাজের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ জরুরি বলে তারা মনে করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ