এসডিজি অর্জনে শক্তিশালী নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়ে ওয়েবিনার কাল

প্রকাশিত: ৩:৩৩ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০২৬

এসডিজি অর্জনে শক্তিশালী নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়ে ওয়েবিনার কাল

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২২ মে ২০২৬ : বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও সর্বজনীন করার ওপর গুরুত্বারোপ করে আগামীকাল ২৩ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি বিশেষ ওয়েবিনার।

গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই ওয়েবিনারের বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে— “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শক্তিশালী নিবন্ধন ব্যবস্থা: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত”।

Manual8 Ad Code

আগামীকাল শনিবার (২৩ মে ২০২৬) সকাল ১১টায় ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিতব্য এ আয়োজনকে ঘিরে ইতোমধ্যে নীতি-নির্ধারক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

আয়োজকরা মনে করছেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর আলোচনা ও সুপারিশ প্রণয়নে ওয়েবিনারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেন গুরুত্বপূর্ণ

প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের জানিয়েছেন, একটি দেশের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঠিক তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের জন্য শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অত্যন্ত জরুরি।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, “জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে নির্ভরযোগ্য নাগরিক তথ্যভাণ্ডার। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে একটি দেশের জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, রোগব্যাধির প্রবণতা এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমে অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক মানুষ, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিবন্ধন ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। অন্যদিকে মৃত্যু নিবন্ধনের হার আরও কম। আইনগত জটিলতা, জনসচেতনতার অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হচ্ছে না।”

এবিএম জুবায়েরের মতে, সঠিক ও হালনাগাদ নিবন্ধন তথ্য ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়। ফলে স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা, পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাগরিক নিবন্ধন ও ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস (CRVS) ব্যবস্থাকে উন্নয়নের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্য ১৬.৯ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য আইনগত পরিচয় নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, যার ভিত্তি হচ্ছে জন্ম নিবন্ধন। একই সঙ্গে কার্যকর মৃত্যু নিবন্ধন স্বাস্থ্যনীতি ও জনসংখ্যা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হলেও মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করে না। ফলে দেশে প্রকৃত মৃত্যুহার, রোগভিত্তিক মৃত্যুর কারণ, দুর্ঘটনা কিংবা মহামারিজনিত মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

Manual3 Ad Code

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় শক্তিশালী মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার অভাব বিশ্বব্যাপী একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে। বাংলাদেশেও সেই সময়ে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ও কারণ বিশ্লেষণে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ফলে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তিশালী নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

Manual6 Ad Code

ওয়েবিনারে যাঁরা থাকছেন

প্রজ্ঞা’র কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন জানিয়েছেন, ওয়েবিনারে দেশের জনস্বাস্থ্য, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচক হিসেবে অংশ নেবেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

মো. নজরুল ইসলাম, কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস;
মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস, বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই);
পার্থ শঙ্কর সাহা, সহকারী বার্তা সম্পাদক, প্রথম আলো;
এবিএম জুবায়ের, নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা।

এছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি নিবন্ধন ব্যবস্থার সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে মতামত তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।

নীতি-সংলাপ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ

আয়োজকরা বলছেন, ওয়েবিনারের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে একটি কার্যকর নীতি-সংলাপ তৈরি করা। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। আবার অনেকে প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও দাপ্তরিক হয়রানির কারণে নিবন্ধনে আগ্রহ হারান। এ অবস্থায় নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া বিদ্যালয়ে ভর্তি, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এখনো বহু মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিবন্ধন ব্যবস্থাকে অন্যান্য সরকারি সেবার সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়বে।

এসডিজি অর্জনে নিবন্ধন ব্যবস্থার ভূমিকা

উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর নিবন্ধন ব্যবস্থা শুধু নাগরিক পরিচয় নিশ্চিত করে না; এটি একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোকেও শক্তিশালী করে। শিশু বিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচার রোধ, টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় জন্ম নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে রোগব্যাধির প্রকৃতি, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ, জরুরি পরিকল্পনা এবং মহামারি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ২০৩০ সালের এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তার মধ্যে তথ্যঘাটতি একটি বড় সমস্যা। নির্ভরযোগ্য নাগরিক তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।

অংশগ্রহণের আহ্বান

প্রজ্ঞার কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন জানিয়েছেন, ওয়েবিনারে গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিকসহ সবার অংশগ্রহণ উন্মুক্ত। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, একটি কার্যকর নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণও সমানভাবে প্রয়োজন। তাই ওয়েবিনারে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের আয়োজনকে আরও ফলপ্রসূ করবে।”

ওয়েবিনারে অংশগ্রহণের জন্য জুম লিংক ইতোমধ্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। আগ্রহীরা আগামীকাল শনিবার সকাল ১১টায় নিচের তথ্য ব্যবহার করে যুক্ত হতে পারবেন:

জুম লিংক: https://us06web.zoom.us/j/87390279359?pwd=syamItnD9SyJWi61Tuj8AYDMaL7lIE.1

মিটিং আইডি: 873 9027 9359
পাসওয়ার্ড: 444838

আয়োজকরা আশা করছেন, এ ওয়েবিনার থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ ও আলোচনাগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ