জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে, সংকটে পড়বে সাধারণ মানুষ: সিপিডি

প্রকাশিত: ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ৫, ২০২৬

জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে, সংকটে পড়বে সাধারণ মানুষ: সিপিডি

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৫ জুন ২০২৬ : জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

Manual1 Ad Code

সংস্থাটি বলেছে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। নতুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

Manual8 Ad Code

বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত “২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

Manual6 Ad Code

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বিভিন্ন সুপারিশও উপস্থাপন করে।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Manual5 Ad Code

অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন অনিশ্চয়তার কারণে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সামষ্টিক অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচকে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও অর্থনীতির ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

তিনি বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি হিসাবে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশ হলেও জ্বালানি মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।”

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় মূল্যস্ফীতির প্রধান চালক

সিপিডির মতে, জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের আয় ও মজুরি বাড়ছে না। ফলে প্রকৃত আয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বাড়ছে পণ্যের দাম

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছে সিপিডি।

সংস্থাটি তাদের সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য তুলে ধরে জানায়, কৃষক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছাতে সরবরাহ শৃঙ্খলে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত থাকায় খুচরা বাজারে পণ্যের দাম ৭০ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহচালিত। এটি চাহিদাজনিত নয়। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৌশলগত খাদ্য মজুদ বাড়ানো, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা কমানো জরুরি।”

তিনি বলেন, কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন এবং ভোক্তা যে দামে তা কিনেন—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক অবস্থান

সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুতের মূল্য কিছুটা সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তা ও শিল্প উভয় খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে ইতিবাচক অগ্রগতি

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি জানায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের উন্নতি হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।

তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহে ঘন ঘন ওঠানামার পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কার্যকর গবেষণা ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, “রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কেন প্রবাহে এত বেশি ওঠানামা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।”

রপ্তানি ও বিনিয়োগে চাপ অব্যাহত

সিপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের রপ্তানি খাত এখনো বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ রপ্তানিকারকদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

এ ছাড়া দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবণতাও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণ ব্যয় এবং ব্যবসা পরিচালনার নানা জটিলতা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

সিপিডি বলেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এজন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নীতি-স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।

বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

সিপিডির মতে, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন না করলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি তার কার্যকর ব্যবহার এবং সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন প্রয়োজন।

শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ

সংবাদ সম্মেলনে শ্রম অধিকার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক বাজারে শ্রম অধিকার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, “বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন বাজার থেকে এ বিষয়ে নেতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সময়মতো মজুরি পরিশোধ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকর স্বীকৃতি প্রদানের মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।”

তিনি আরও প্রস্তাব করেন, শিল্প খাতের জন্য গঠিত প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণের শর্ত যুক্ত করা যেতে পারে।

বাজেটের জন্য সিপিডির সুপারিশ

আগামী জাতীয় বাজেট সামনে রেখে সিপিডি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া;
খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি;
বাজারে তদারকি ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা;
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ;
দেশীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা;
শ্রম অধিকার ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন;
বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।

সিপিডির মতে, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি, কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সুরক্ষার ওপর জোর না দিলে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ