কমরেড জালাল উদ্দীন: সংগ্রাম ও সততায় রাজনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক

প্রকাশিত: ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ৭, ২০২৬

কমরেড জালাল উদ্দীন: সংগ্রাম ও সততায় রাজনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক

Manual4 Ad Code

নজরুল ইসলাম হক্কানী |

বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক অঙ্গন এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার জগতে আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক ও গণমানুষের নেতা কমরেড জালাল উদ্দীনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন, বামপন্থী রাজনীতি এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের জন্য এক গভীর অপূরণীয় ক্ষতি।

মানুষের জীবনের সার্থকতা কেবল কত বছর বেঁচে ছিলেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি কী আদর্শ ধারণ করেছেন, মানুষের জন্য কতটুকু কাজ করেছেন এবং সমাজে কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, সেটিই প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড। সেই বিচারে কমরেড জালাল উদ্দীনের জীবন ছিল এক অনন্য সংগ্রামের ইতিহাস।

Manual3 Ad Code

প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে নয়, বরং মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষ এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন আদর্শের চেয়ে সুবিধাবাদ অনেক সময় প্রাধান্য পেয়েছে, তখনও তিনি তাঁর বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর্শন থেকে বিচ্যুত হননি। এই আদর্শিক দৃঢ়তাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

কমরেড জালাল উদ্দীন ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা রাজনীতিকে জনগণের কল্যাণের সঙ্গে একীভূত করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতেন, রাজনীতির প্রকৃত শক্তি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার মধ্যে নিহিত। তাই তিনি কখনো কেবল দলের নেতা হয়ে থাকেননি; হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের আপনজন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।

তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাংবাদিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণমাধ্যম সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। স্থানীয় সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তুলে ধরেছেন, সামাজিক সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে এসেছেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত নিষ্ঠা তাঁকে সহকর্মীদের কাছে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।

চুনারুঘাট ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থেকে এবং প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য হিসেবে তিনি স্থানীয় গণমাধ্যমের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বর্তমান সময়ে যখন সংবাদমাধ্যম নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন তাঁর মতো দায়িত্বশীল ও নীতিবান সাংবাদিকদের স্মৃতি আরও বেশি করে অনুভূত হবে।

Manual2 Ad Code

কমরেড জালাল উদ্দীনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মানবিকতা। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে জানতেন, মানুষের কথা শুনতে জানতেন এবং মানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের বলে মনে করতেন। এ কারণেই তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা বা সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন একজন অভিভাবক, একজন পরামর্শদাতা এবং একজন বিশ্বস্ত বন্ধু। তাঁর ব্যক্তিত্বের এই মানবিক দিক তাঁকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্রে পরিণত করেছিল।

আজ যখন তাঁর কর্মময় জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন দেখতে পাই একটি জীবন, যা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে আদর্শ, সততা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে একজন মানুষ সীমিত পরিসরেও অসাধারণ প্রভাব রেখে যেতে পারেন।

Manual4 Ad Code

তাঁর মৃত্যুতে ওয়ার্কার্স পার্টি একজন অভিজ্ঞ নেতাকে হারিয়েছে, সাংবাদিক সমাজ হারিয়েছে একজন প্রাগ্রসর সহযোদ্ধাকে।
#
অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী
রংপুর।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ